Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

ভোপালে আয়োজিত দশম বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ


বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সমাগত সকল হিন্দি প্রেমী ভাই ও বোনেরা,

৩৯টি দেশের প্রতিনিধিরা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, এই সম্মেলনকে তাই হিন্দির মহাকুম্ভ বলা যায়। এখন তো আপনারা সিংহস্থের (বৃহস্পতি যখন সিংহ রাশিতে থাকে, সেই পর্ব’কে সিংহস্থ পর্ব বলে) প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু, এই প্রস্তুতির আগেই আমরা ভোপালের মাটিতে হিন্দির মহাকুম্ভ দর্শনের সুযোগ পেলাম।

সুষমাজী ঠিকই বলেছেন, এই সম্মেলনে হিন্দি ভাষাকে প্রাধান্য দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনও ভাষা যখন সজীব থাকে, তার শক্তি টের পাওয়া যায় না। কিন্তু, যখন ভাষা লুপ্ত হয়ে যায় আর কয়েক শতাব্দী পর কারও হাতে পড়ে, যখন সংশ্লিষ্ট সবাই চিন্তায় পড়ে যান; এটা কোন্ ভাষা, কোন্ লিপিতে লেখা হতো, বিষয়টা কী? আজ পাথরে খোদাই করা কিছু পাওয়া গেলে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ সেই লিপি নিয়ে অন্বেষণ শুরু করে। তখনই আমরা টের পাই, একটি ভাষা লুপ্ত হয়ে গেলে কত বড় সংকট সৃষ্টি হয় তা আন্দাজ করতে পারি।

আমাদের পৃথিবীতে এখন আর ডায়নোসর নেই। তাই, ডায়নোসর নিয়ে বড় বড় সিনেমা তৈরি হয়, আমরা কল্পনা করি, ডায়নাসর কেমন ছিল, কী করতো? প্রাণীবিদরা ভাবনাচিন্তা করে কিছু কৃত্রিম ডায়নোসর নির্মাণ করেন, যাতে এগুলি কেমন ছিল, তা নবীন প্রজন্ম জানতে পারে। এর মানে, তা আগে কী ছিল তা জানার জন্য আজ আমাদের এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ছে।

আমাদের সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞানের ভান্ডার রয়েছে, কিন্তু খুব কম মানুষ সংস্কৃত জানেন বলে আমরা সেই জ্ঞান ভান্ডার যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি না। কারণ কী? আমরা জানতেও পারিনি, কিভাবে আমরা ধীরে ধীরে এই ভাষা থেকে, আমাদের মহান ঐতিহ্য থেকে আলাদা হতে হতে অন্যান্য বিষয়ে এতটাই লিপ্ত হয়ে পড়েছি যে ক্রমে আমাদের নিজেদের ভাষাটাই লুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে। …. আর সেজন্যই প্রত্যেক প্রজন্মের দায়িত্ব তার ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখা, ঐতিহ্যের সুচারু সংরক্ষণ, সম্ভব হলে সঞ্জীবিত করা এবং পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করা। বেদপাঠের এমন পরম্পরা ছিল যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেদপাঠকরা বেদজ্ঞানকে সঞ্চারিত করতেন। যখন লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না, কাগজ আবিষ্কার হয়নি, তখন জ্ঞানকে স্মৃতির মাধ্যমেই পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করা হতো। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শত শত বর্ষকাল এই পরম্পরা চালু ছিল। এই ইতিহাস দেখে, আমাদের সকলের উচিত আমাদের সমস্ত ভাষাকে রক্ষা করা। আজ যদি জানা যায় যে, কোনও পাখির প্রজাতি বিলুপ্ত হতে হতে আর মাত্র ১০০-১৫০টি বাকি রয়েছে, তা হলে বিশ্বের অনেক এজেন্সি সেই প্রজাতিকে বাঁচানোর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করবে। কোনও সামান্য গুল্ম বিলুপ্তপ্রায় জানলেও এ ধরনের অনেক এজেন্সি সেই গুল্মকে সংরক্ষণের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেবে। এসব থেকেই বোঝা যায়, বিলুপ্তপ্রায় কোনও কিছুর মূল্য কত অপরিসীম। ভাষার ক্ষেত্রেও একথা সত্য।

ভাষাকে সমৃদ্ধ করা প্রত্যেক প্রজন্মের দায়িত্ব। আমার মাতৃভাষা হিন্দি নয়, আমার মাতৃভাষা গুজরাটি। কিন্তু, আমি যদি হিন্দি বলতে না পারতাম, বুঝতে না পারতাম, তা হলে আমার কী হতো, আমি কেমন করে সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছতাম, কেমন করে মানুষের কথা বুঝতাম! আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এই ভাষার শক্তি কতো! আর দেখুন, আমি হিন্দি সাহিত্যের চর্চা করছি না, হিন্দি ভাষার চর্চা করছি। আমাদের দেশে হিন্দি ভাষার আন্দোলন কারা শুরু করেছেন, যাঁদের মাতৃভাষা হিন্দি ছিল না, সেইসব অধিকাংশ তেমন মনীষীই – নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, লোকমান্য তিলক, মহাত্মা গান্ধী, কাকাসাহেব কালেলকর এবং রাজা গোপালাচারীর মতো অহিন্দিভাষীরা হিন্দি ভাষার সংরক্ষণ ও প্রসারের জন্য যে দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের প্রেরণা জোগায়। আচার্য বিনোবা ভাবে, দাদা ধর্মাধিকারীর মতো গান্ধীবাদীরা এই ভাষা এবং লিপির শক্তি অনুধাবক করেছিলেন। এজন্যই বিনোবা ভাবের অনুগামীরা বলতেন, ভারতের সকল ভাষার নিজস্ব লিপিকে বাঁচিয়ে রাখা, সেগুলিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি প্রতিটি ভাষাকে নাগরী লিপিতে লেখার অভ্যাস রপ্ত করা উচিত। বিনোবা ভাবে এবং দাদা ধর্মধিকারীর এই ধারনার শরিক হয়ে দেশের মানুষ যদি তাঁদের কথামতো চলতেন, তা হলে ঐ সাহিত্যকর্মগুলি হয়তো আজ ভারতের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির হাতিয়ার হয়ে উঠতো।

ভাষা জড় পদার্থ হতে পারে না, জীবনে যেমন চেতনা থাকে, ভাষারও তেমনই চেতনা থাকে। সেই চেতনার অনুভূতি কোনও স্টেথোস্কোপে জানা যায় না, কোনও থার্মোমিটারে মাপা যায় না, ভাষার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি সেই চেতনার অনুভূতি মানুষের মনে এনে দেয়। ভাষা তাই পাথরের মতো জড় পদার্থ হতে পারে না, ভাষা বাতাসের গতির মতো যে পথে প্রবাহিত হয়, সেখানকার সৌরভকে সঙ্গে নিয়ে চলে, যুক্ত করতে থাকে। কোনও উদ্যান পথে প্রবাহিত হলে, তার সুগন্ধ আর কোনও নর্দমার কাছ দিয়ে প্রবাহিত হলে তার দুর্গন্ধ বহন করে, নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে থাকে। ভাষার এমনই শক্তি, যে প্রজন্মে, যে অঞ্চল হয়ে, যে পরিস্থিতিতে প্রবাহিত হয়, সব কিছু নিজের মধ্যে বিলীন করে নিয়ে নিজেকেই উপহার দেয়, পুলকিত হয়। এই শক্তির কারণেই ভাষাকে চৈতন্য বলা হয়, আর চেতনার অনুভূতি অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

কিছুদিন আগে যখন প্রবাসী ভারতীয় সম্মেলন হয়েছিল, আমাদের বিদেশ মন্ত্রক একটি ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেছিল। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী ভারতীয় লেখকদের লেখা বইগুলি একটি প্রদর্শনী আয়োজন করেছিল। আমি অবাক হয়েছিলাম, খুশি হয়েছিলাম, শুধু মরিশাসে বসবাসকারী দেড় হাজার ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখকের হিন্দিতে লেখা বইয়ের প্রদর্শনী দেখে। এর মানে, দূরদূরান্তের এতগুলি দেশে হিন্দি ভাষার প্রতি ভালোবাসা আমরা অনুভব করি। নিজেকে যুক্ত রাখার পথ কী হতে পারে! কেউ যদি দেশে এসে থাকতে না পারেন, তেমন পরিস্থিতি না থাকে, তা হলে নিদেনপক্ষে দু-চারটি বাক্য হিন্দিতে বলে, নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কথা ব্যক্ত করেন।

হিন্দি ভাষা কেমন করে সমৃদ্ধ হবে তা নিয়ে নিরন্তর আলাপ-আলোচনা ও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ভাষাবিদদের উদ্দেশে আমার একটি প্রস্তাব রয়েছে, আপনারা এ বিষয়ে ভেবে দেখবেন। আমরা কি হিন্দি ও তামিল ভাষার একটি যৌথ কর্মশালা করতে পারি, যাতে তামিল ভাষার শব্দাবলীকে কেমন করে হিন্দিতে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে আদান-প্রদান চলতে পারে। তেমনই বাংলা ও হিন্দির মধ্যে একটি কর্মশালা, জম্মু ও কাশ্মীরের ডোগরী ভাষার সঙ্গে হিন্দির কর্মশালা, এভাবে দেশের সমস্ত প্রধান – অপ্রধান ভাষার সঙ্গে হিন্দির কর্মশালার মাধ্যমে সেসব ভাষার শব্দভাণ্ডার থেকে নতুন নতুন শব্দ হিন্দিতে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে, দু-চারটি এমন অভিনব প্রবাদ-প্রবচন লোকোক্তি যদি পাওয়া যায়, যা হিন্দিতেও অনায়াসে মিলে যেতে পারে তা হলে উপকার হয়। এই প্রক্রিয়া নিরন্তর চালু থাকা উচিত।

ভাষা আমাদের কত গর্বিত করে! আমি তো সার্বজনিক পেশায় রয়েছি। কাজের সূত্রে কখনও তামিলনাডু গিয়ে যদি ‘ভনক্কম’ বলি, তা হলে গোটা তামিলনাডু’তে ‘ইলেক্ট্রিফাইং এফেক্ট’ হয়। ভাষার শক্তি এমনই। কোনও বাঙালির সঙ্গে দেখা হলে ‘ভালো আছো’ জিজ্ঞেস করলে তিনি খুশি হন। কোনও মারাঠির সঙ্গে দেখা হলে, তাঁকে ‘কসাকায়, কায় চলতা হ্যায়’ জিজ্ঞেস করলে, তিনি প্রসন্ন হন। প্রতিটি ভাষার একটি নিজস্ব শক্তি থাকে। আমাদের দেশের সমৃদ্ধির অন্যতম কারণ এই শক্তি, এই বৈচিত্র্য। মাতৃভাষা রূপে প্রতিটি রাজ্যের কাছে এমনই অমূল্য সম্পদ রয়েছে, সেগুলিকে আমরা কিভাবে যুক্ত করতে পারি! এই সংযুক্তিকরণে হিন্দি ভাষা কেমনভাবে সূত্রধরের কাজ করতে পারে, এই বিষয়গুলি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করলে আমাদের ভাষা আরও শক্তিশালী হবে। সেই চেষ্টাই আমাদের করা উচিত।

রাজনৈতিক জীবন বেছে নেওয়ার পর আমি প্রথমবার গুজরাটের বাইরে কাজ করার সুযোগ পাই। আপনারা জানেন, গুজরাটিরা কেমন হিন্দি বলেন! হিন্দিভাষীরা তা নিয়ে মজাও করেন। কিন্তু আমি যখন হিন্দি বলতাম সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, আপনি কোথা থেকে এতভালো হিন্দি শিখলেন? সাধারণ বিদ্যালয় যে রকম হিন্দি শেখানো হয়, আমি ততটাই শিখেছি। কিন্তু, স্টেশনে চা বিক্রি করতে করতে ভালোভাবে হিন্দি বলতে শিখেছি। সেখানে উত্তর প্রদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন, তাঁরা মুম্বাইয়ে দুধের ব্যবসা করতেন। আমাদের এবং পাশাপাশি কয়েকটি গ্রামে কৃষকদের কাছ থেকে তাঁরা দুগ্ধবতী মহিষ কিনতে আসতেন। সেই মহিষগুলি তাঁরা রেলের কামরায় উঠিয়ে মুম্বাই নিয়ে যেতেন। আবার যে মহিষগুলি দুধ দিতে দিতে এক সময় দুধ দেওয়া বন্ধ করতো, সেগুলিকে চুক্তি অনুসারে রেলের কামরায় উঠিয়ে আমাদের গ্রামে ফিরিয়ে দিয়ে যেতেন। আমি তাঁদেরকে চা বিক্রি করতাম। তাঁরা গুজরাটি জানতেন না, সেজন্য আমাকেই হিন্দি জানতে হল। এর মানে, চা আমাকে হিন্দি শিখিয়েছে।

খুব সহজেই ভাষা শেখা যায়। সামান্য চেষ্টা করুন, ত্রুটি থেকে যায়, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ত্রুটি থেকে যায়, কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারানো ঠিক নয়। শুরুতে লোকে হয়তো হাসবেন কিন্তু তারপরই ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের গুজরাটিদের স্বভাব হল – ঝগড়ার সময় আমরা গুজরাটিতে ঝগড়া করে মজা পাই না, গ্রামের লোকেদের মনে হয় গুজরাটিতে গালি দিলে ঠিকমতো গালি দেওয়া হল না, মজা পাওয়া যায় না। কাজেই যখনই ঝগড়া শুরু হয়, দু’পক্ষই হিন্দিতে শুরু করে দেন। দু’জনেরই মনে হয়, হিন্দি বললে প্রতিপক্ষ বুঝবে আমারও দম আছে।

সম্প্রতি আমাকে বেশ কয়েকবার বিদেশ যাত্রা করতে হয়েছে। আমি দেখেছি, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ভারতের গুরুত্ব বাড়ছে। বিশ্ববাসী আমাদের কথা বোঝার চেষ্টা করছেন, মেনে নিচ্ছেন। আমি মরিশাসে বিশ্ব হিন্দি সাহিত্যের কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে গিয়েছিলাম। তেমনই, মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানে একটি অভিধান প্রকাশ করার সুযোগ আমি পেয়েছি। ‘উজবেক টু হিন্দি, হিন্দি টু উজবেক’। চিনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দি পণ্ডিতদের একটি আলোচনাসভায় উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। মঙ্গোলিয়া’তে গিয়ে সেদেশে হিন্দি ভাষার প্রতি আকর্ষণ দেখে এসেছি। ঐ অনুষ্ঠানগুলিতে আমি হিন্দিতেই বক্তব্য রেখেছি। সমবেত শ্রোতাগণ যেখানে হাততালি দেওয়া উচিত, সেখানেই হাততালি দিয়েছেন, যখন হাসা উচিত তখনই হেসেছেন। তার মানে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে গেছে, সেখানকার মানুষ আমাদের আরও ভালো করে জানতে চান। একথা ভেবে গর্ব হয়। রাশিয়ায় গিয়েছিলাম, সেদেশেও হিন্দি নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন হিন্দিভাষী রাশিয়ান নাগরিককে আমার অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই সকল দেশগুলিতে আমাদের চলচ্চিত্র জগতের রথী-মহারথীরা সেসব দেশেও যথেষ্ট জনপ্রিয়। মধ্য এশিয়ার ছোট ছোট শিশুরাও হিন্দি সিনেমার গান গায়। এই কথাগুলো বলার তাৎপর্য হল এই যে, গোটা বিশ্বে হিন্দি ভাষার গুরুত্ব বাড়ছে। ভাষাবিদদের মতে, গোটা বিশ্বে প্রায় ছয় হাজার ভাষা রয়েছে। কিন্তু, যেভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এগুলির মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ ভাষা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ছোট ছোট আঞ্চলিক ভাষাগুলি আর থাকবে না। প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। এই সতর্কবাণী যদি আমরা বুঝতে না পারি, নিজেদের ভাষাকে পরিবর্তন এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে যুগপোযোগী না করে তুলতে পারি, তা হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভাষা অন্য কিছু হবে। আমরাও প্রত্নতত্ত্বের বিষয় হয়ে উঠবো। সেজন্য ভাষার দরজা-জানালা বন্ধ করা উচিত নয়। যখনই কোনও ভাষার চারপাশে নিয়ম-কানুনের দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে, সে ভাষা আর বাঁচেনি। ভাষার শক্তি এমনই হওয়া উচিত, যা চলার পথে সব কিছুকে আত্মস্থ করে নিতে পারে আর সেই প্রয়াস নিরন্তর চলতে থাকে।

বহির্বিশ্বে ভাষার প্রভাব কেমন হয়, তার একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের দেশে যেমন নবরাত্রি বা দীপাবলীর সময় উৎসব হয়, ইজরায়েলে তেমনই ‘হানুক্কা’ নামক একটি উৎসব হয়। আমি সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ট্যুইটারে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে হিব্রু ভাষায় ‘হানুক্কা’র শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। তিন-চার ঘন্টার মধ্যেই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আমাকে হিন্দি ভাষায় ধন্যবাদ জানিয়ে হিব্রু’তে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

ইদানিং বিশ্বের যে কোনও নেতাই আমার সঙ্গে দেখা হলে একটি কথা অবশ্যই বলেন, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। তাঁদের ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে যেমনই শুনতে লাগুক না কেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগুলে, সবার উন্নয়ন হয়, তাঁরা যে আমার এই বার্তাটি হৃদয়ঙ্গম করেছেন, তা জেনে ভালো লাগে। ওবামার সঙ্গে দেখা হলে, তিনিও বলেন, পুতিনের সঙ্গে দেখা হলে, তিনিও বলেন। সেজন্য আমি নিজেদের কথা বলার সময় চেষ্টা করি, যাতে যা বলি বিশ্ব তা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে।

আর সেজন্যই আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করার, শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা থাকা উচিত। একটি ভাষা গোষ্ঠীর জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হয় তাঁদের ভাষা। আমরা যদি হিন্দি ভুলে যেতাম, রামচরিতমানসও ভুলে যেতাম, তা হলে শিকড়হীন বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমাদের কী অবস্থা হতো! আমাদের মহান সাহিত্যিকরা যেমন বিহারের ফণীশ্বরনাথ রেণু’কে না পড়লে কেউ জানতে পারবেন না, তিনি বিহারের দারিদ্র্যকে কী রূপে দেখতেন, সেই দারিদ্র্য সম্পর্কে তাঁর ভাবনা কেমন ছিল। প্রেমচন্দের সাহিত্য না পড়লে, আমরা উত্তর ভারতের গ্রাম জীবনের প্রত্যাশা কী ছিল তা জানতে পারি। আরও জানতে পারি যে, মূল্যবোধকে মর্যাদা দিতে আমাদের সাধারণ মানুষরাও তাঁদের ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করতেন না। জয়শঙ্কর প্রসাদ, মৈথিলী শরণ গুপ্তরা এই মাটিকে কত কিছুই দিয়ে গেছেন! নিভৃতে এক কোণে বসে মাটির প্রদীপের আলোয় সাহিত্য সাধনার ফলে তাঁদের অনেকেই অকালে নিজেদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা আমাদের জীবনে পাথেয় করার মতো অনেক কিছুই দিয়ে গেছেন। যদি ভাষা না বাঁচে, তা হলে তাঁদের এতো পরিশ্রম, ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে সৃষ্ট মণিরত্নের ভাণ্ডারও বাঁচবে না। সেজন্য ভাষার প্রতি ভালোবাসা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্যই হওয়া উচিত। কোনও রকম প্রাচীর তুলে দিয়ে ভাষাকে বন্দী করার চেষ্টা উচিত নয়।

আগামীদিনগুলিতে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলছে। আজকাল পিতা-পুত্র কিংবা পতি-পত্নীও পরস্পরকে হোয়াটসঅ্যাপ – এর মাধ্যমে মেসেজ পাঠান। ট্যুইটার করে জিজ্ঞেস করে বিকেলে কী খাওয়া হবে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ডিজিটাইজেশন কতদূর প্রবেশ করেছে! প্রযুক্তিবিদদের মতে, আগামীদিনগুলিতে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে তিনটি ভাষা নেতৃত্ব দেবে। সেগুলি হল – ইংরাজি, চিনা এবং হিন্দি। যাঁরাই প্রযুক্তির সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব বর্তায়, তাঁরা কিভাবে ভারতীয় ভাষাগুলিকেও ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে নিয়ে যান, প্রযুক্তির স্বার্থে হিন্দি এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষাগুলিতে কী কী পরিবর্তন আনা উচিত, কেমন সফ্টওয়্যার বানানো উচিত, কেমন অ্যাপস তৈরি করতে হবে! আপনারা দেখবেন, এটুকু করলেই এই ভাষাগুলিরও বড় বাজার তৈরি হবে। কেউ হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি যে, ভাষা কিভাবে বাজার তৈরি করতে পারে! কিন্তু আজ পরিবর্তিত প্রযুক্তির দুনিয়ায় ভাষা ও অর্থনীতির একটি বড় উপাদান। সম্প্রতি হিন্দির বিশিষ্ট কবি অশোক চক্রধর আমাকে গর্বের সঙ্গে বলেছেন যে, তাঁর কাব্যগুলি অধুনাতম প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউনিকোডে রূপান্তরিত করা হয়েছে। একথা শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। আমরা যত বেশি আমাদের সাহিত্যকে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-এ পৌঁছৈ দিতে পারবো, আমাদের ভাষাগুলির সঙ্গে ইন্টারনেটকে যুক্ত করতে পারবো, যতদ্রুত এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবো, ততদ্রুত আমাদের ভাষাগুলির প্রভূত শক্তি বৃদ্ধি হবে।

ভাষা অভিব্যক্তির প্রকাশ মাধ্যম। আমরা কী বার্তা দিতে চাই, আমাদের ভাবনাকে যথাযথ শব্দরূপ দিতে পারলেই সেই ভাবনাগুলি অবিনশ্বর হয়ে ওঠে। আর সে কারণেই ভাষা শাব্দিক রূপের আধারস্বরূপ। আমরা যত শব্দ বিশ্বের আরাধনা করবো, মানবতার পক্ষে তা কল্যাণকর হয়ে উঠবে।

আজ ৩৯টি দেশের প্রতিনিধিদের সমাগমে ভোপালের মাটিতে হিন্দির এই মহাকুম্ভ হিন্দিকে যে উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এর সাফল্যও অন্য ভারতীয় ভাষাগুলিকেও উৎসাহ জোগাবে। আমরা কিভাবে সবাইকে আপন করে নিতে পারি। আমাদের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা এক্সক্লুসিভ হওয়া উচিত নয়। আমাদের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ইনক্লুসিভ হওয়া উচিত, যাতে অন্যদেরকেও যুক্ত করা যায়। তবেই আমাদের ভাষা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। যতদিন এই মোবাইল ফোন ছিল না, যতদিন মোবাইল ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট, ডাইরেক্টরির ব্যবস্থা ছিল না, ততদিন আমরা কেউ ১০টি টেলিফোন নম্বর মনে রাখতে পারতাম, কেউ ৫০টি আবার কেউবা ২০০টি টেলিফোন নম্বর। আজ প্রযুক্তির প্রভাবে এমনকি নিজের ঘরের টেলিফোন নম্বর মনে রাখার প্রয়োজন পড়ে না। কোনও কিছু লুপ্ত হতে খুব বেশি সময় লাগে না। এত বড় প্রযুক্তির আবির্ভাবে এরকম অনেক কিছুকে লুপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে আমাদের সতর্কভাবে প্রযুক্তি চর্চা জারি রাখতে হবে। সেজন্য নতুন প্রজন্ম ও প্রযুক্তিকে কাছে টেনে নিতে হবে, তাদের থেকে শিখতে হবে, তাদেরকে বুঝতে হবে আর ভাষাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে, শক্তিশালী করে তুলে বিশ্ববাসীর সামনে প্রস্তুত করতে হবে।

আমি আরেকবার আন্তরিকভাবে এই সম্মেলনকে শুভেচ্ছা জানাই। আর সুষমাজী যেমন আশ্বস্ত করেছেন, আমরা এখান থেকে একটি নিশ্চিত পরিণাম নিয়ে বেরোবো এবং পরবর্তী বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনের আগে অনেক কিছু পরিবর্তন সাধন করতে পারবো। এই বিশ্বাস আমাদের প্রত্যেককে শক্তি জোগাবে।

এই একটি প্রত্যাশা নিয়ে আমি এই সম্মেলনকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই।

অনেক অনেক ধন্যবাদ।

PG/SB/SB/