পিএমইন্ডিয়া
[
162KB ]
নয়াদিল্লি, ১৩ মার্চ, ২০১৫ স্যার জগন্নাথজি, মরিশাস সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সমস্ত মহানুভব, সমস্ত বরিষ্ঠ নাগরিক, ভাই ও বোনেরা, স্যার জগন্নাথজি বলেছেন যে, ছোট ভারতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাই। এই ছোট ভারত শব্দটি শুনে আমার শরীর ও মনে একটি কম্পন অনুভূত হল, এক আপনত্বের অনুভূতি। একদিক দিয়ে দেখলে ১২ লক্ষ জনসংখ্যার দেশকে বুকে জড়িয়ে ধরতে এসেছে ১২০ কোটির দেশ। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকাশ। আমরা কল্পনা করতে পারি যে, এক – দেড়শো বছর আগে আমাদের পূর্বজরা এখানে শ্রমিকের কাজ করতে এসেছিলেন, সঙ্গে এনেছিলেন তুলসীদাসী রামায়ণ, হনুমান চালিশা এবং হিন্দি ভাষা। এই এক – দেড়শো বছরে যদি এই তিনটে জিনিস না থাকতো আর বাকি সবকিছু হতো, তা হলে আজ আপনারা কোথায় থাকতেন আর আমি কোথায়, আমরা তা আন্দাজ করতে পারি। এগুলি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, জীবন তৈরি করে দিয়েছে আর জুড়েও রেখেছে। ১৯৭৫ সালে, যখন নাগপুরে বিশ্ব হিন্দি সম্মেলন হয়েছিল, তখন শ্রী শিবসাগরজি সেখানে এসেছিলেন আর প্রস্তাব রেখেছিলেন, একটি বিশ্ব হিন্দি সচিবালয় গঠন করা উচিত। ১৯৭৫ সালে এই ভাবনাকে স্বীকার করা হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত হতে অনেক বছর কেটে যায়। আর আমি মানি যে, আজ বিশ্ব সচিবালয়ের একটি নতুন ভবনের শিলান্যাস হচ্ছে, পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হিন্দিপ্রেমীরা এতে খুবই খুশি হবেন, কিন্তু আমার বিশ্বাস স্যার শিবসাগরজি যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁর এই স্বপ্ন আজ সাকার হচ্ছে দেখে তিনি খুবই খুশি হবেন। যখন অটলজির সরকার ছিল, তখন ১৯৭৫ সালের ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে চেষ্টা হয়েছে। ডঃ মুরলী মনোহর যোশীজি এখানে এসেছিলেন। তারপর, মাঝে গাড়ি থেমে গিয়েছিল আর হয়তো এই কাজ আমার ভাগ্যেই লেখা ছিল। কিন্তু আমি চাইবো যে, এখন বেশি দেরী না হোক। আজ যার শিলান্যাস, এখনই ঠিক করে নিন যে অমুক তারিখে তার উদঘাটন হয়ে যাবে। মরিশাস হিন্দি সাহিত্যের বড় কদর করেছে। অনেক সার্ক দেশে হিন্দিভাষার প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। অনেক ভাষাভাষী মানুষ হিন্দি শিখেছে। পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দি শেখানো হয়। অনেক গ্রন্থ হিন্দিতে অনুবাদ হয়েছে। অনেক ভাষার বই অনুবাদ হয়েছে। কিন্তু মূর্ধন্য সাহিত্যিক দিনকরজি বলতেন যে, মরিশাস একা একটি এমন দেশ যার নিজস্ব হিন্দি সাহিত্য রয়েছে। আমার মতে, এটা খুব বড় ব্যাপার। কিছুদিন আগে, ২০১৫ সালের প্রবাসী ভারতীয় দিবস পালিত হল। এবার প্রবাসী ভারতীয় দিবসে প্রবাসী ভারতীয়দের লেখা সাহিত্যকৃতির প্রদর্শনী সাজানো হয়েছিল। আর আমি আজ এখানে গর্বের সঙ্গে বলছি যে ঐ প্রদর্শনীতে দেড়শোরও বেশি পুস্তক মরিশাসের ছিল। অর্থাৎ, এখানে হিন্দিভাষাকে এত ভালোবাসে মানুষ, এত লালন-পালন করা হয়, এই ভাষাকে হয়তো কখনও ভারতবর্ষের কোনও কোনও এলাকায়ও এত ভালোবাসা পাওয়া যায়নি হিন্দি ভাষার প্রতি, যতটা মরিশাসে হয়েছে। ভাষার নিজস্ব একটি শক্তি থাকে। ভাষা ভাবের অভিব্যক্তির একটি মাধ্যম। কেউ নিজের ভাষায় কোনও কথা বললে, তা মস্তিষ্ক থেকে বের হয় না, হৃদয় থেকে বের হয়। অন্য কোনও ভাষায় যখন কথা বলা হয়, তা আগে ভাবনা, মস্তিষ্কে অনুবাদ চলে এবং তারপর প্রকট হয়। সঠিক শব্দচয়ন করার জন্য মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অভিধান তন্ন তন্ন করে খোঁজে আর তারপর প্রকট হয়। কিন্তু, নিজের ভাষা ভাবের অভিব্যক্তির খুব বড় মাধ্যম। জয়শঙ্কর রায় বলেছিলেন যে, মরিশাসের হিন্দি …. এটা শ্রমিকদের ভক্তির জীবন্ত প্রমাণ! আর আমি মানি, মরিশাসে যে হিন্দি সাহিত্য লেখা হয়েছে, তা নিছকই কলম থেকে বেরোনো কালি দিয়ে লেখা হয়নি। মরিশাসে যে হিন্দি সাহিত্য লেখা হয়েছে, তা ঐ কলমে শ্রমিকদের স্বেদবিন্দু দিয়ে লেখা হয়েছে; তাঁদের সাহিত্যে সেই ঘামের গন্ধ রয়েছে। আর সেই গন্ধ আগামীদিনে সাহিত্যকে আরও নতুন মাত্রা জোগাবে। আর আমি যেমন বলেছি, ভাবের অভিব্যক্তি….. সমস্ত ভাষার ভাষান্তর সম্ভব হয় না। আর ভাবের ভাষান্তর তো অসম্ভব। আমাদের এখানে যেমন বলা হয়েছে, “রাধিকা তুনে বাঁসুরি চুরাই’। এখন এখানে যাঁরা হিন্দি জানানে, তাঁরা ভালোই বুঝতে পারছেন যে আমি কী বলছি? “রাধিকে তুই বাঁশি চুরি করেছিস” কিন্তু একথা খুব ভালো ইংরাজি’তে অনুবাদ করলে আমরা বলবো Radhika has stolen the flute. Go to Police Station an report’. ভাষা ভাবের অভিব্যক্তির খুব বড় মাধ্যম। ভাষা দিয়ে অভিব্যক্ত ভাব সামর্থ্যও দেয়। আর আমরা প্রধানমন্ত্রী শ্রী অনিরুদ্ধ জগন্নাথজি’কে চিনি। নামও বলি কিন্তু হয়তো সবাই জানি না যে জগন্নাথ থেকেই ইংরাজি অভিধানে একটি শব্দ ঢুকেছে – Juggernaut। অর্থাৎ এমন স্রোত, এমন শক্তির স্রোত যাকে থামানো সম্ভব না। এজন্য ইংরাজি’তে শব্দ এসেছে Juggernaut। এটা জগন্নাথ থেকে গিয়েছে। যখন পুরী’তে জগন্নাথজির রথযাত্রা বের হয় তার যে দৃশ্য সৃষ্টি হয়, তা থেকে এই শব্দ ওখানে পৌঁছেছে। আমি একবার রাশিয়ার সেই এলাকায় গিয়েছিলাম যেটি ভারতের সঙ্গে সংলগ্ন। সেখানকার মানুষ Tea শব্দ জানেন না কিন্তু ‘চায়’ জানেন। Door শব্দটি জানেন না কিন্তু ‘দ্বার’ জানেন। কখনও কখনও এমনও দেখা যায়। আর আমি চাইবো এই যে আমাদের বিশ্ব হিন্দি সচিবালয় তৈরি হচ্ছে, এখানে সর্বতোভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার হোক। পৃথিবীর যত ভাষায় হিন্দি নিজের জায়গা বানিয়েছে, কোনও না কোনও রূপে তা সে পেছনের দরজা দিয়ে হলেও, কিন্তু পৌঁছে গেছে, সেগুলিকেও খুঁজে বের করা উচিত যে আমরা কোন কোন রূপে পৌঁছেছি আর শব্দগুলি কেন স্বীকৃতি পেয়েছে। পৃথিবীর অনেক ভাষায় আমাদের ভাষার শব্দ পৌঁছেছে। এসব জেনে আমাদের গর্ব হয়। এটা নিজে থেকেই একটি রাষ্ট্রীয় অস্মিতার কারণ হয়ে পড়ে। বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা হিন্দিপ্রেমীদের জন্য আজকের এই মূহুর্ত অত্যন্ত শুভ। আজ ১২ মার্চ, যখন মরিশাস নিজের রাষ্ট্রীয় দিবস পালন করছে। আমি মরিশাসের জন্য ১২৫ কোটি দেশবাসীর শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছি। আজ সেইদিন, ১২ মার্চ ১৯৩০ সালের এই দিনে মহাত্মা গান্ধী সাবরমতীর তট থেকে ডান্ডি অভিযান শুরু করেছিলেন। ডান্ডি অভিযান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি মোড়। সেই সাবরমতীর তট থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, যে সাবরমতীর জল খেয়ে বড় হওয়ার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল। আজ সেই ১২ মার্চ, এই শুভকাজের সুযোগ পেলাম। মহাত্মা গান্ধী মরিশাসে এসেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী মরিশাস’কে খুব ভালোবেসেছিলেন। ১০০ বছর আগে ….. মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যাঁর নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল, তিনি ডঃ মণিলাল ….. একশো বছর আগে তিনি এখান থেকে হিন্দি খবরের কাগজ শুরু করেছিলেন …… হিন্দুস্তানী। ঐ খবরের কাগজের বিশেষত্ব ছিল …… যে আজও যখন কিছু মানুষ ভাষা নিয়ে ঝগড়া করে, কিন্তু সেই ডঃ মণিলাল মহাত্মা গান্ধীর প্রেরণায় পথ বের করেছিলেন। সেই হিন্দুস্তানী খবরের কাগজ এমন ছিল, যার কিছু পৃষ্ঠা গুজরাটি ভাষায় ছাপা হতো, কিছু পৃষ্ঠা হিন্দিতে ছাপা হতো, আর কিছু ইংরাজিতে ছাপা হতো। আর এরকম ত্রি-ভাষা ফরমুলা নিয়ে সেই খবরের কাগজ একশো বছর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেই হিন্দুস্তানী খবরের কাগজ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। মহাত্মা গান্ধীর চিন্তাভাবনার প্রভাব তাতে প্রকাশিত হতো। আর দেশপ্রেম স্বদেশী ভাষার মাধ্যমে জেগে ওঠে। ভাষার বন্ধনকে বেঁধে রাখার মানুষ আমরা নই। আমরা তো সমস্ত ভাষাকে বুকে জড়িতে ধরতে চাই, কেন না সেটাই তো সমৃদ্ধির কারণ হয়। যদি ইংরাজি জগন্নাথ’কে বুকে জড়িয়ে না ধরতো তা হলে Juggernaut শব্দ জন্ম নিতো না। আর সেজন্য ভাষার সমৃদ্ধিও বাঁধলে বন্ধন হয় না। একটি উদ্যান থেকে যখন বাতাস বয়, তখন বাতাসই তার সৌরভ ছড়িয়ে দিতে থাকে। ভাষারও সেই শক্তি রয়েছে যে তা নিজের প্রবাহের সঙ্গে শত শত বছর ধরে নতুন চেতনা, নতুন জ্বালানি শক্তি, নতুন প্রাণ প্রসারিত করতে থাকে। সেই অর্থে আজ আমার জন্য বড় গর্বের বিষয় যে মরিশাসের মাটিতে বিশ্ব হিন্দি সচিবালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। ভাষাপ্রেমীদের জন্য, হিন্দিভাষা প্রেমীদের জন্য, ভারত প্রেমীদের জন্য, আরেক মহান ঐতিহ্য যে ভাষার মধ্যে নবপল্লবিত হয়ে আসছে, সেই মহান ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশ্বকে জুড়ে দেওয়ার যে প্রয়াস হচ্ছে, তাকে আমি অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই। আর এই উপলক্ষ্যে, আপনাদের মাঝে আসার সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাদেরকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই। অনেক অনেক ধন্যবাদ।