পিএমইন্ডিয়া
ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিঃ ডেভিড ক্যামেরন ১২ ও ১৩ নভেম্বর লন্ডনে আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। দু’দেশের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং সম্পর্কের গভীরতা ও প্রসারতা নিয়ে তাঁদের মধ্যে ইতিবাচক মতবিনিময় হয়। দু’দেশের মধ্যে এই সম্পর্ক পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এক মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বলে তাঁরা সহমত হন। ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ এবং একটি বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার ফলে দু’দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করে তোলার ব্যাপারে দুই নেতাই বিশেষ আশাবাদী হয়ে ওঠেন। যে মৌলিক নীতিগুলির ওপর ভিত্তি করে ভারত-ব্রিটেন অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দুই নেতা সেগুলি চিহ্নিত করে সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যান। অংশীদারিত্বের এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আরও ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের শীর্ষ বৈঠক আয়োজনের সপক্ষেও তাঁরা মত প্রকাশ করেন। বিশেষত, নতুন প্রতিরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করে একযোগে কাজ করার আদর্শে দু’দেশের জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ডাক দেন তাঁরা।
দুই প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের জটিল পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেন এবং দু’দেশের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির উন্নয়নে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতার বাতাবরণ গড়ে তোলা অবশ্য জরুরি বলে মত প্রকাশ করেন। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহযোগিতার সম্পর্ককে এক নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে দুই নেতাই মনে করেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে ভারতকে এক স্থায়ী সদস্য হিসেবে পেতে ব্রিটেন আগ্রহী বলে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অর্থ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভারতের মতামত আরও জোরালোভাবে ব্যক্ত হওয়া উচিত। জি-২০-র প্রতি দুটি দেশই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে বলে আলোচনা বৈঠকে সহমত প্রকাশ করা হয়।
এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির ব্যাপারে ভারত ও ব্রিটেন সহযোগিতা করে যাবে বলেও বৈঠক শেষে জানানো হয়। নিন্দা করা হয় সন্ত্রাসবাদেরও। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির ওপর কড়া নজর রাখার এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী প্রচেষ্টার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার। নেপালে উদ্ভুত সমস্যার সাংবিধানিক নিষ্পত্তির ব্যাপারেও দুই নেতা আশাবাদী বলে জানানো হয়। ঐ দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে দুই নেতাই মনে করেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের প্রস্তাব অনুসরণ করে শ্রীলঙ্কা স্থায়ী শান্তি এবং নিরন্তর সমৃদ্ধির পথে জনসাধারণকে চালিত করবে বলেও দুই নেতা আশা ব্যক্ত করেন। মালদ্বীপে এক স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে দুই প্রধানমন্ত্রী সহমত প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে আফগানিস্তানে এক সার্বভৌম গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভারত ও ব্রিটেন সমস্তরকমের সহযোগিতা যুগিয়ে যাবে বলেও বৈঠকে মত প্রকাশ করা হয়। সিরিয়া এবং ইরাকের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে এবং সেখানে নৃশংস ঘটনার যারা শিকার হচ্ছেন তাদের রক্ষার উপায় উদ্ভাবনে দুই নেতা তাঁদের সহযোগিতার কথা ব্যক্ত করেন।
ইরানের ঐতিহাসিক পরমাণু কর্মসূচির প্রস্তাবকে ভারত ও ব্রিটেন স্বাগত জানিয়ে বলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের উচিত এই বিষয়টির সাফল্যজনক রূপায়ণের। ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলে উদ্ভুত সমস্যার স্থায়ী সমাধানেও উদ্যোগী হওয়া উচিত বলে দুই প্রধানমন্ত্রী মত প্রকাশ করেন।
২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন কর্মসূচিকে ‘বিশ্বের রূপান্তর – নিরন্তর উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০৩০ পর্যন্ত কর্মসূচি’র পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে দুই প্রধানমন্ত্রীই স্বাগত জানান। তাঁরা বলেন, এই বিশেষ কর্মসূচিটির মধ্যে দারিদ্র্য নির্মূলকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
এ বছর ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে সাইবার সহযোগিতা প্রসঙ্গে যে অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে তাতে দুই প্রধানমন্ত্রীই সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, এক উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ইন্টারনেট পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সপক্ষে সকলের একজোট হওয়া প্রয়োজন। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাইবার অপরাধকে দমন করার বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকারের তালিকাভুক্ত রাখা উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।
কমনওয়েলথ আন্দোলনকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে এবং তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দুই প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের অঙ্গীকারের কথা দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন। সেইসঙ্গে, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পরিবেশগত বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বের কথাও দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্যসূচিতে স্থান পায়। বন্যপ্রাণী নিয়ে বেআইনি কার্যকলাপ এবং অবৈধ বাণিজ্যিক প্রবণতা রোধ করতেও একজোট হওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। বন্যপ্রাণী নিয়ে বেআইনি কাজকর্মের ব্যাপারে লন্ডন ঘোষণাকে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
দু’দেশের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও প্রসারিত করে সম্পর্কের গভীরতা বাড়িয়ে তোলার ওপরও দুই নেতা বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এক শক্তিশালী, নিরন্তর এবং সুষম বিকাশের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করার অঙ্গীকারও গ্রহণ করা হয়। ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের শক্তিকে মেনে নিয়ে বলা হয় এই সম্পর্ককে আরও জোরদার করে তুলতে দুটি দেশই একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। আসন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক আলোচনা বৈঠকে ভারতের অর্থমন্ত্রী শ্রী অরুণ জেটলি এবং ব্রিটেনের চ্যানসেলর অফ দ্য এক্সচেকার মিঃ জর্জ ওসবোর্ন এই বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে দুই প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।
বিনিয়োগ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রেও ভারত ও ব্রিটেন একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। দু’দেশের তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল শিল্পক্ষেত্রে পারস্পরিক অবদানকে আরও নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রসারের সম্ভাবনার বিষয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়। এক্ষেত্রে পণ্য ও পরিষেবা – দু’দিক থেকেই একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
ভারতের বিভিন্ন পরিকাঠামো শিল্পে বিশেষত, রেলের প্রসার ও উন্নয়নে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লন্ডন এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে বলে দুই প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। লন্ডন নগরীকে কেন্দ্র করে আর্থিক লগ্নির যে ঘোষণা করেছে এইচ ডি এফ সি, ভারতী এয়ারটেল, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া এবং ইয়েস ব্যাঙ্ক তাকে স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী। এই ব্যবস্থাটি রূপায়িত হলে ভারতের বেসরকারি ক্ষেত্রে মূলধন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সুপ্রশস্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত-যুক্তরাজ্য আর্থিক অংশীদারিত্বের মূল ক্ষেত্রগুলির মধ্যে যে সহযোগিতার বাতাবরণ গড়ে উঠেছে তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী। যে সমস্ত পেশাদার কর্মী যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে আগ্রহী তাদের জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অনুমোদিত আর্থিক পরিষেবা প্রশিক্ষণ সূচির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই নেতাই।
দুই নেতা বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত যে বিরাট সাফল্য দেখিয়েছে তা ভারতের নিজস্ব উচ্চাশামূলক লক্ষ্যে পৌঁছনোর পক্ষেই শুধুমাত্র সহায়ক নয়, বরং, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছেও তা অনুপ্রেরণার এক উৎস হিসেবে কাজ করে যাবে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে চিন্তাভাবনার ব্যাপারে ভারত ও যুক্তরাজ্য দুটি দেশই নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে বলে দুই প্রধানমন্ত্রীই মনে করেন। ভারতে বাণিজ্যিক কাজকর্মকে সহজতর করে তোলার লক্ষ্যে ব্রিটেন ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সূত্রে আবদ্ধ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। এক্ষেত্রে সহযোগিতার বন্ধনকে আরও নিবিড় করে তোলার কথাও ঘোষণা করেন তাঁরা।
পুনর্গঠিত ভারত-যুক্তরাজ্য সি ই ও ফোরামের প্রথম বৈঠকটিকেও স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগসুবিধা এবং চ্যালেঞ্জগুলি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীদের পরামর্শ দেবে এই ফোরাম। বাণিজ্যিক পণ্যের স্বত্ত্বাধিকার, নকশা উদ্ভাবন এবং ট্রেড মার্কের ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে স্বীকার করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
রেল প্রকল্পগুলির পরিচালন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যে সাফল্য দেখিয়েছে তার বিশেষ প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। রেল প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সহায়তার লক্ষ্যে যে মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়ে দুই নেতাই পরিকাঠামো ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও সম্প্রসারিত করার আহ্বান জানান। সরকারি অনুমোদনে লন্ডনে প্রথম রুপি বন্ড চালু করার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তিকে উৎসাহ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন দুই নেতাই। এ ব্যাপারে গবেষণা, উন্নয়ন, পরীক্ষানিরীক্ষা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতা প্রসারের বিষয়ে তাঁরা মত বিনিময় করেন। দু’দেশের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি মউ স্বাক্ষরিত হবে বলেও দুই নেতা ঘোষণা করেন।
ডিসেম্বরে নাইরোবিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংগঠনের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের সাফল্য কামনা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। দোহা উন্নয়ন কর্মসূচিকে অনুসরণ করে সম্মেলনে আলাপ-আলোচনা হবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিকে স্বাগত জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, এই ধরনের উদ্যোগে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টিতে সহমত হয়েছে দুটি দেশই। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং শিল্প সহযোগিতাকে আরও নিবিড় করে তুলতে গৃহীত পদক্ষেপগুলির প্রশংসা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সফল বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবতারণা প্রসঙ্গে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক সমঝোতার বিষয়টিকে স্বাগত জানান। ভারতে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৮.৫৬ শতাংশ স্থান অধিকার করে রয়েছে ব্রিটেন। ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থা যুক্তরাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষকে। বিমাশিল্পে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে ভারতের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ায় সন্তোশ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। ভারতের বৃহত্তর জনসাধারণকে বিমা সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে বিমাশিল্পে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিমা ও পেনশন ক্ষেত্রে এই সীমা বাড়ানো হয়েছে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে বিমাশিল্পের ক্ষেত্রে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে এক নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।
ইন্দোর, পুণে এবং অমরাবতীতে নগরোন্নয়নের কাজে ভারত-ব্রিটেন সহযোগিতার কথা ঘোষণা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।‘স্মার্ট নগরী’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভারত যে উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক চিন্তাভাবনা করেছে তাতে কারিগরি সহায়তা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। সুস্থ নদী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে টেম্স ও গঙ্গার উন্নয়ন সম্পর্কিত এক নতুন কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
ভারতীয় তরুণ সমাজকে ২১ শতকের উপযোগী করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী তা সফল করে তুলতে ভারতকে সর্বতোভাবে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটেনের ১১টি সংস্থা ভারতের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অঙ্গীকার করেছে। শিল্পোদ্যোগীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে ভারতের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রককে সহায়তা দেবে ব্রিটেন।
২০১৬ বছরটি ভারত ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বছর হয়ে উঠবে বলে দুই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা প্রতিফলিত হবে তার মধ্যে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ ২১ শতকের উপযোগী এক কর্মকাঠামো গড়ে তোলায় সহায়ক হবে বলে দুই নেতা মনে করেন। বিদ্যালয় পর্যায়েও দু’দেশের মধ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো হবে। বিকশিত করে তোলা হবে সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ধারা এবং পারিবারিক তথা সামাজিক পরিবেশ ও ব্যবস্থাকে।
২০১৬-তে দিল্লিতে যে প্রযুক্তি সংক্রান্ত শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ব্রিটেন তাতে সহযোগিতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করবে বলে দুই নেতার বৈঠকে ঘোষণা করা হয়। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে বিনিময় কর্মসূচিকে আরও বেশি করে উৎসাহিত করা হবে বলে দুই প্রধানমন্ত্রীই জানিয়েছেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, নগরায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নতুন নতুন যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলা হবে। এছাড়াও, খাদ্য, জ্বালানি, পরিবেশগত ভারসাম্য, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যরক্ষার ক্ষেত্রে জলসম্পদ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা প্রসারিত হবে বলে দুই নেতা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষির ওপর তার বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সমগ্র বিশ্বেই এক চ্যালেঞ্জ বিশেষ। শস্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতা গড়ে তোলার সপক্ষে দুই নেতাই বক্তব্য রাখেন। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এগ্রিকালচারাল বোটানি সহ ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে যুক্ত করা হবে বলে বৈঠকে ঘোষণা করা হয়।
আগামী দুটি শিক্ষাবর্ষে ভারতে ১০০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠানোর যে প্রস্তাব ব্রিটেন গ্রহণ করেছে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রীই। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ২৫ হাজার ব্রিটিশ ছাত্রকে ভারতে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস-এ ইন্টার্ন হিসেবে পাঠানো হবে ১ হাজার জন ব্রিটিশ ছাত্রকে। ভারত-ব্রিটেন তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণা কর্মসূচিকে স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী।
ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে প্রতিষেধক টীকা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রসারের কথা ঘোষণা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটেনের জীবপ্রযুক্তি এবং গবেষণা পরিষদের সহযোগিতাক্রমে এই কর্মসূচির কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অন্যান্য ক্ষেত্রেও জোরদার করে তোলা হবে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে। চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ উদ্ভাবন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছে নতুন নতুন চুক্তি। স্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টিতেও জোর দিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এই ধরনের বিনিয়োগকে উৎসাহদান করতে ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের উদ্যোগে একটি টাস্ক ফোর্স গঠনের যে সিদ্ধান্ত ভারত গ্রহণ করেছে তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। চণ্ডীগড়ে কিংস কলেজ হসপিটাল গড়ে তোলার ব্যাপারে কিংস কলেজ হসপিটাল এন এইচ এস ফাইন্ডেশন ট্রাস্ট এবং ইন্দো-ইউ কে হেল্থকেয়ার প্রাইভেট লিমিটেডের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তাকেও স্বাগত জানান দুই প্রধানমন্ত্রী। ভারতের আয়ুষ মন্ত্রক এবং ব্রিটেনের চিকিৎসা সম্পর্কিত একটি অগ্রণী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মউ চূড়ান্ত করার বিষয়টি নিয়েও দুই নেতা মত বিনিময় করেন।
ভারতের ৭০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ভারত-যুক্তরাজ্য সাংস্কৃতিক বর্ষ পালনের কথা ঘোষণা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। দু’দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গভীরতাকে সম্মান জানাতেই এই উৎসবের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। ব্রিটিশ লাইব্রেরি এবং ভারতের জাতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগে যে সমস্ত পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহ রয়েছে সেগুলি ডিজিটাল প্রথায় সংরক্ষণের বিষয়টিতে সহমত প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। পর্যটন ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রসারের কর্মসূচিগুলিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদী উভয়েই এই মর্মে সহমত প্রকাশ করেন যে যেভাবে সমগ্র বিশ্বে অপরাধের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে তাতে দু’দেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে দুটি দেশকেই তাদের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। অপরাধমূলক ঘটনার মোকাবিলায় আইনি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক উদ্যোগকে আরও জোরদার করে তোলার আহ্বান জানান তাঁরা। মূল্যবান শিল্পসামগ্রী ও পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহের অবৈধ বাণিজ্য ও চোরাচালান বন্ধেরও ডাক দেন তাঁরা।
পরিশেষে, উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে অকুন্ঠ ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আগামী বছর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে আসার আমন্ত্রণও জানান তিনি। দু’দেশের জনসাধারণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তার লক্ষ্যে ভারত-যুক্তরাজ্য অংশীদারিত্বের সম্পর্ক এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে বলে দুই নেতাই আশা ব্যক্ত করেন। এই দুটি দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে একযোগে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকারের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেন তাঁরা।
PG/SKD/DM/S
My statement to the media at the press briefing with PM @David_Cameron. @Number10gov https://t.co/yWkStlZR4w.
— Narendra Modi (@narendramodi) November 12, 2015