Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

আফগানিস্থানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ

আফগানিস্থানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ

আফগানিস্থানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ

আফগানিস্থানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ

আফগানিস্থানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ


মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঘানি,

মহামান্য মুখ্য কার্যনির্বাহী ড. আব্দুল্লা,

উওলেসি জিরগার মাননীয় অধ্যক্ষ এবং মেশরাওন জিরগার মাননীয় চেয়ারম্যান,

উভয় কক্ষের সম্মানীয় সদস্যগণ,

আট শতাব্দী আগে বালখ প্রদেশের স্বনামখ্যাত সন্তান, মানব ইতিহাসের এক মহান কবি, জালালুউদ্দিন রুমি লিখেছিলেন, “তোমার শব্দকে তুলে ধর, স্বরকে নয়| বৃষ্টিই ফুল নিয়ে আসে, ঝড় নয়|”
এটাই এই মহৎ ভূমি ও মহান জাতির প্রজ্ঞা|

এই ভূমিতে কাব্যের ও সুন্দরের, বীরত্বের ও সম্মানের, গর্ব ও মহত্বের, বন্ধুত্বের গভীর উষ্ণতার বন্ধনের এবং স্বাধীনতার জন্য শক্তিশালী প্রতিরোধ শক্তির কিংবদন্তীরা জন্ম গ্রহণ করেছেন|

এবং এই শতাব্দীতে আফগানিস্থানের মহৎ মানুষেরা বীরত্বের এক মহাকাব্যিক সংগ্রাম করেছেন এবং তাদের ভবিষ্যত বন্দুক ও হিংসার বদলে ভোট ও তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে রূপ দেওয়ার জন্য সংকল্প করেছেন|

পরম্পরাগত জিরগায় বিশ্বাসী একটি দেশ গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে|

আফগানিস্থানের অগনিত নামহীন মানুষ যারা তাঁদের জীবন এবং ভবিষ্যতকে বলিদান দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি এ এক শ্রদ্ধাঞ্জলি|

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই সাহেবের নেতৃত্বের প্রতি, যিনি হতাশার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলি থেকে প্রজ্ঞা ও সংকল্পের মধ্য দিয়ে জাতিকে আশাপূর্ণ ভবিষ্যতে নিয়ে যাওয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছেন|

রাষ্ট্রপতি ঘানি এবং মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক ড. আব্দুল্লার প্রতি, তাঁদের লক্ষ্য ও রাষ্ট্র নায়কোচিত নেতৃত্বের জন্য, যা শুধুমাত্র মহান দেশপ্রেমিকদের পক্ষেই সম্ভব|

সংসদের সদস্যদের প্রতি, আপনাদের জনগনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এই সভায় অংশগ্রহণ করতে সাহসিকতার সঙ্গে হিংসার মোকাবিলার জন্য|

মাননীয় সদস্যগণ,

আমি এখানে ভারতের একশ পঁচিশ কোটি বন্ধুর পক্ষ থেকে আপনাদের সাফল্যের তারিফ করতে, আপনাদের বন্ধুত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এবং আপনাদের ভবিষ্যতের সংহতির জন্য আছি|

এবং রাষ্ট্রপতি ঘানি এবং আফগানিস্থানের সংসদের সকল সদস্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমি গণতন্ত্রের এই আবাসকে আফগান জাতির প্রতি উৎসর্গীকৃত করতে পেরে বিনীত ও সম্মানিত|

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় মাপের নেতাদের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও ভারতরত্ন শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীজি’র জন্মদিন ছাড়া এজন্যে এর চেয়ে আর বিশেষ দিবস বাছাই করতে পারতাম না| এগারো বছর আগে তিনি কারজাই সাহেবের সঙ্গে মিলিতভাবে এই প্রকল্পের স্বপ্ন দেখেছিলেন|

এবং এই ভবনের একটি অংশের নাম অটল ব্লক রাখার জন্য বাছাই করাটা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে|

এই সংসদ ভবন আমাদের নেতৃত্বের দর্শন, আমাদের জনগনের শ্রম এবং আমাদের ভূমির পাথরের মধ্য দিয়ে আমাদের দুই দেশকে কাছে এনেছে|

এবং অটল ব্লক আমাদের আত্মার মলিন ঘটিয়েছে, কেননা পাস্তু ভাষায় অটল মানে বীর আর হিন্দিতে এর মানে দৃঢ় হওয়া| এটা আফগানিস্থান ও আমাদের বন্ধুত্বের চেতনাকে প্রকাশ করেছে|

একটি জাতি ও গণতন্ত্রের পথে আপনাদের অগ্রগতির প্রতি এই সংসদ ভবন চত্বর একটি ক্ষুদ্র শ্রদ্ধার্ঘ্য| এবং এটা আমাদের মধ্যেকার আবেগ ও মূল্যবোধ, স্নেহ ও আকাঙ্ক্ষা—যা আমাদের বিশেষ বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে—তার স্থায়ী প্রতীক হয়ে থাকবে|

সম্মানীয় সদস্যগণ,

আমাদের বন্ধুত্ব ইতিহাসের মতই প্রাচীন|

বিশাল হিন্দুকুশের ওপর দিয়ে এবং খাইবার গিরিপথের মধ্য দিয়ে সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী ও শাসকবর্গরা জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধর্ম, বানিজ্য ও সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে আমাদের সংযুক্ত করেছেন|

ইতিহাসের পরিবর্তনশীল সীমারেখায় একসময় আমরা এক ছিলাম| একসময় আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ দেখেছি| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবসময়ই পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছি|

সময়োত্তীর্ণ বৌদ্ধ প্রতীক অয়ঙ্ক ও বামিয়ান এবং দিল্লির গরিমাময় স্মৃতিসৌধে, আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পে, ভাষা ও সাহিত্যে, খাবার-দাবার ও উৎসবে, আমরা সময়োত্তীর্ণ সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই|

মহাভারতের বিখ্যাত চরিত্র গান্ধারীকে পাওয়ার জন্য আমরা প্রাচীন আফগানিস্তানের কাছে ঋণী| মৌর্য সাম্রাজ্য অথবা শেরশাহ সুরি’র কৃতিত্বের মধ্যে আমরা সেই যোগাযোগ দেখতে পাই, যে যোগাযোগ আমরা এখন পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা করছি|

দিল্লিতে এক আফগান রাজার আকাঙ্ক্ষা কবি আহমেদ শাহ দুররানি’র ভাষায় ফুটে উঠেছে— দিল্লির রাজসিংহাসন আমি ভুলে যাই, যখন আমি আমার আফগান ভূমির পাহাড় চূড়ার কথা মনে করি|

কিন্তু, প্রত্যেক ভারতীয় ও আফগানবাসীর হৃদয়ে রয়েছে পরস্পরের জন্য অসীম ভালবাসা| আমরা পরস্পরের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও কবিতা, খাবার ও উৎসব ভালবাসি| এবং এখন আমরা পরস্পরের ক্রিকেটের প্রশংসা করি|

আমরা আনন্দিত যে, আফগান জাতীয় ক্রিকেট দল দিল্লির কাছে তাদের ঘরোয়া মাঠ খুঁজে পেয়েছে এবং আগামী বছরের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জন্য অনুশীলন করছে| এবং আমি আফগানিস্তানের অনুর্ধ-১৯ ক্রিকেট দল, যারা সম্প্রতি জিম্বাবোয়েকে তাদের প্রথম ঘরোয়া সিরিজেই হারিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে অভিনন্দন জানাই|

আমরা একইরকম গর্বিত যে, আফগানিস্তানের মানুষ ভারতকে তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য অথবা পারিবারিক বাসস্থানের স্বাভাবিক পছন্দ হিসাবে গণ্য করেন|

আমরা স্মরণ করি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আফগানিস্থানের মানুষের সহায়তা; সীমান্ত গান্ধী হিসেবে সম্মানিত খান আব্দুল গফ্ফর খানের অবদান; এবং সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পাদটীকা, যখন ঠিক একশ বছর আগে, মহারাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এবং মৌলানা বরকতউল্লাহ আফগানিস্তানের কাবুলে প্রথম নির্বাসিত ভারতীয় সরকার গঠন করেন|

রাজা আমানুল্লাহ একবার মহারাজাকে বলেছিলেন যে, যতদিন না ভারত স্বাধীন হচ্ছে, ততদিন আফগানিস্তানও সেই অর্থে স্বাধীন নয়|

সম্মানীত সদস্যগণ,

এটাই আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের মূল ভাব|

এবং আপনারা যখন নতুন শতাব্দীতে নতুন যাত্রা শুরু করেন, আমরা তখন গর্বের সাথে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং আপনাদের সঙ্গে একসাথে পা বাড়িয়েছি|

গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে বিদ্যালয়, ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র পেতে এবং শিশু কল্যাণমূলক সুবিধা ও মহিলাদের জন্য সুযোগ গড়ে তুলতে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা সহায়তা করেছে।

আমরা মিলিত প্রয়াসে নির্মিত সড়কগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলকে নিকটবর্তী করেছে;

যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ পরিবহন লাইন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি আফগান জনগনের বাড়ি-ঘরে আলো জ্বালিয়েছে;

তেমনি উপগ্রহ সংযোগ আফগান জনগণের কাছে এনে দিয়েছে শিক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এবং আমরা নিরাপত্তাবাহিনীগুলিকে আরো গতিশীল হতে সহায়তা করছি।

আমরা মিলিতভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করছি সেগুলি আফগানিস্তানে কৃষি ও খনি ব্যবস্থাকে পুনর্নির্মাণে সহায়তা করছে এবং কাবুলে অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পেতে সাহায্য করছে।

একটি দেশের কাছে মানবিক সম্পদের চেয়ে আর কোনো কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই আমরা আনন্দিত যে, আমাদের মেধাবৃত্তি স্কিম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলির মাধ্যমে আফগান যুবকরা আধুনিক শিক্ষা ও পেশাদারী দক্ষতার মাধ্যমে সক্ষম হতে পারছে, আফগান সরকারও সেসম্পদ দিয়ে দেশকে উন্নত করতে পারছে, এবং আফগান নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দেশকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষমতা পাচ্ছে|

খুব শীঘ্রই সালমা বাঁধ থেকে বিদ্যুৎ ও জল নির্গত হবে। স্তোর প্যালেস পুনরায় আপনাদের অমূল্য ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আফগান ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রতিবছর ১০০০-টি বৃত্তি দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের প্রকল্প অব্যাহত থাকবে। কৃষিবিজ্ঞান সম্পর্কিত আমাদের বিশেষ বৃত্তিমূলক প্রকল্পের প্রতি সদুত্তর পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত।

আজ, আমি আফগান নিরাপত্তাবাহিনীর শহিদদের সন্তানদের জন্য ৫০০-টি বৃত্তিদানের কথা ঘোষণা করছি।

যেহেতু আমরা আপনাদের দেশকে পুনর্নির্মাণ করতে আমাদের প্রয়াস নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি, আপনারাও আমাদের জনগণকে আপনাদের নিজেদের বলে গ্রহণ করে সুরক্ষা দিয়েছেন। আমরা প্রতিদিনই হুমকির মুখোমুখি হচ্ছি, কিন্তু আমরা আপনাদের মাঝখানে নিরাপদ বোধ করছি।

প্রতিটি আফগান নাগরিকের প্রতি আমি ভারতের দিক থেকে স্বর্গীয় কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অথবা প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় অতিথিকে সুরক্ষিত রেখেছেন|

এখানে গর্বের সঙ্গে কাজ করছেন যেসব ভারতীয় কূটনীতিবিদ, আধিকারিক, ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তার – তাদের প্রতি এবং, ভারতীয় শহিদদের পরিবারবর্গের প্রতি আমি ভারতীয়দের ও আফগানদের হয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

কেউ কেউ আছে, যারা চায় না আমরা এখানে থাকি। তাদের কেউ কেউ এখানে আমাদের উপস্থিতিতে চক্রান্তমূলক নক্সা দেখেছেন| রয়েছে অন্যান্যরা যারা আমাদের অংশীদারিত্বের শক্তির প্রতি অস্বস্তি বোধ করছে। এমনকী কেউ কেউ আবার আমাদের নিরুৎসাহিত করতে চেয়েছে।

কিন্তু, আমরা এখানে আছি, কারণ আপনারা আমাদের উপর আস্থা রাখেন। আপনারা কখনোই আমাদের প্রতিশ্রুতি এবং আমাদের বন্ধুত্বের শক্তির প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেননি। এবং আপনারা আমাদের বন্ধুত্বের সুফল দেখতে পেয়েছেন।

আপনারা যা দেখেছেন তার ভিত্তিতে আমাদের বিচার করেছেন; অন্যেরা কি বলেছে, এমনকি রহস্যময় ভারতীয় দূতাবাস সম্পর্কেও তারা যা বলেছে, তাতে ভরসা রাখেননি।

আপনারা জানেন যে ভারত এখানে অবদান রাখতে এসেছে, প্রতিযোগিতা করতে নয়; ভারত এসেছে ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করতে, সংঘর্ষের অগ্নিশিখা জালাতে নয়; ভারত এসেছে জীবন পুনর্নির্মাণ করতে, একটি দেশকে ধ্বংস করতে নয়।

আপনারা জানেন, আমরা যেভাবে করি, ভারতীয়রা এবং আফগানরা সবসময়ই পরস্পরের পাশে দাঁড়ায়, কখনোই একে অপরের বিরুদ্ধে নয়।

আপনারা ইতিহাসের এক বাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন। এবং আপনাদের ইতিহাস আমাদের বলছে যে আপনারা কখনোই আপনাদের এক প্রতিযোগিতামূলক নাট্যের কুশিলব হয়ে উঠতে দেবেন না; অথবা অপরের নক্সা অনুযায়ীও কাজ করবেন না।

কবি কুশল খান খাট্টাক যেভাবে জাতির সম্মান ও জাতির খ্যাতিকে প্রশংসার সঙ্গে তুলে ধরেছেন, আপনাদের কাজে জীবনও সেই রকম জাতির গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকা, জীবনই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পায়।

তাই, আপনাদের বিশ্বাস ও আশ্বাস ক্রমে আফগান সমৃদ্ধি অনুযায়ী আপনারা যাতে আপনাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারেন সেজন্য আফগানদের প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য ভারত তার কাজ করে যাবে।

বন্ধুত্ব থেকে যে দায়িত্ব আসে আমরা সেখানে থেকে কাজ করে যাব। কিন্তু, আমরা আমাদের অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এই কাজ করব।

আমরা জানি আফগানিস্তানের সাফল্যের জন্য তার প্রতিটি প্রতিবেশীর কাছ থেকে সহযোগিতা ও সহায়তা দরকার। এবং, এই অঞ্চলের আমরা সবাই ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও অন্যান্যরা-অবশ্যই আমাদের অভিন্ন গন্তব্যকে স্বীকৃতি জানিয়ে এবং আমাদের অভিন্ন প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হব।

আফগানিস্তান যখন শান্তির স্বর্গ হয়ে উঠবে এবং যে কেন্দ্রটি থেকে এঅঞ্চলে বাণিজ্য, শক্তি ও বিনিয়োগের প্রবাহ বইতে থাকবে, তখন আমরা সবাই মিলিতভাবে সমৃদ্ধ হব।

সেইজন্য আমরা ইরানের চাভাহারের মাধ্যমে এবং সেই সঙ্গে স্থল ও সমুদ্র পথে আপনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে আমরা কাজ করছি।

সেইজন্যই আমি আশা করি দক্ষিণ এশিয়া ও আফগানিস্তান এবং তারও পরে বিস্তৃত অঞ্চলে যোগসূত্রের সেতু হয়ে উঠবে পাকিস্তান।

আমি আশা করি, সেদিন খুব শীঘ্রই আসবে, যখন আমাদের এঅঞ্চলে মধ্য এশিয়া থেকে সমৃদ্ধির শক্তি হিসেবে শক্তি আসবে; যখন কাবুলিওয়ালারা পুনরায় সহজেই ভারতীয় হৃদয় জয় করতে পেরিয়ে আসবে পথ; যখন ভারতে আমরা আফগানিস্তানের অনুপম ফল আস্বাদন করব; যখন আফগানদেরও ভারত থেকে তাদের পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে আর চড়া মূল্য দিতে হবে না।

এটাই হল এই অঞ্চলের ইতিহাসের ধারা। এবং এটাকে অবশ্যই এর ভবিষ্যতের পথ হয়ে উঠতে হবে।

কিন্তু, সাহসিকতার সঙ্গে ও অক্লান্তভাবে দেশকে রক্ষা করার জন্য লড়াকু আফগানদের আফগানিস্তান একমাত্র তখনই সফল হবে যখন আর তার সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হবে না সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ; যখন সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়স্থল ও মুক্তোদ্যানগুলি বন্ধ হয়ে যাবে; এবং যখন তাদের পৃষ্ঠপোষকরা আর বাণিজ্য করতে পারবে না।

সন্ত্রাস ও হিংসা আফগানিস্তানের ভবিষ্যকে রূপদানের যন্ত্র হতে পারে না অথবা আফগানদের পছন্দকেও নিয়ন্ত্রন করা যাবে না এইভাবে।

আফগানিস্তানে যে আগুন জ্বলেছে তা কখনোই সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকতে পারে না।

আফগানরা তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে সদিচ্ছা রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করারও সাহস রয়েছে।

এবং আফগানদের অবশ্যই সমস্ত দিক থেকে তাদের নিজেদের মধ্যে শান্তি বজায় রাখারও অধিকার রয়েছে।

কাবুল নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক রক্ত। পর্বতের ঢাল বেয়ে অনেক বিষাদময় ঘটনার অন্ধকার নেমে এসেছে। অনুভূতিহীন সংঘর্ষের আগুনে দগ্ধ হয়েছে অনেক স্বপ্ন।

হতে পারেন আপনারা পুস্তুন, উজবেক, তাজিক্‌স, হাজারাস্‌। আপনারা হতে পারেন মুসলিম, হিন্দু ও শিখ।

কিন্তু, আপনারা আফগান হিসেবে গর্বিত, এক দেশ, এক জাত ও এক মানুষ হিসেবে আপনারা একত্রিত।

আপনারা ধর্মের নামে লড়াই করতে পারেন; অথবা লড়াই করতে পারেন পরিচিতির জন্য।

কিন্তু, আফগানদের জন্য শান্তির প্রয়োজনে পরস্পরের কাছে আসার সময় হয়েছে।

যেমন একজন প্রজ্ঞাবান আফগান বলেছেন, কোনো তিক্ত বীজের গাছকে যদি চিনি ও মাখন খাইয়ে বড় করা হয়, তথাপি ওটাতে তেতো ফলই গজাবে।

আপনাদের আছে বহুত্ববাদের গৌবরময় ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্য ও বহুমুখি বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা।

যারা বাইরে থেকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, তাদের অবশ্যই এই ভবন ও এই শিক্ষাসদনে এসে পথের সন্ধান খুঁজতে হবে; তাদের অবশ্যই ভোটপত্রের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে শক্তি। যারা বাড়ি-ঘর ধ্বংস করেছে, তাদের অবশ্যই এখন নিজেদের দেশকে গড়ে তুলতে হবে। কেননা, এটা করতে হবে আপনাদের দেশের জন্য, আপনাদের জনগণের জন্য।

এবং, এটা অবশ্যই আপনাদের মেধার উপর নির্ভর করে, আপনাদের নিজেদের প্রক্রিয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধের উদ্দীপনার মাধ্যমে অর্জনের ক্ষেত্রে আপনাদেরই পালা।

অন্যদের হিসাব নিকাশ অথবা উচ্চাকাঙক্ষার দ্বারা চালিত হয়ে নয়।

এবং, বিগত দেড় দশক ধরে শান্তি ও আলোচনার মাধ্যমে বহু কষ্টে যে ভবিষ্যৎ আপনারা গড়ে তুলছেন তা অবশ্যই সুরক্ষিত করতে হবে। প্রতিটি আফগানের জন্যই এখানে একটা স্থান থাকতে হবে। এখানে অবশ্যই প্রতিটি ব্যক্তির আশা-আকাঙক্ষার স্থান থাকতে হবে। এবং এটা এমনই এক দেশ হতে হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকেরই থাকবে তার অধিকার এবং ভবিষ্যতের প্রতি তার আস্থা।

এবং, যেহেতু আফগানরা তাদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন, তাই বিশ্বকে অবশ্যই তাদের পাশে সৌভ্রাতৃত্ব ও সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে হবে।

আমরা অবশ্যই যেসব সৈনিক বিদেশ থেকে এসেছে এবং যারা যেসব আফগান গ্রামের কথা কখনো শোনেনি, যেসব আফগান জনগণের কথা কখনো জানেনি, তাদের জন্য জীবন দিয়েছে যারা, তাদের জন্য কিছু করব; এবং যারা আফগানদের জন্য অপরিসীম আত্মত্যাগ করেছে, জীবন দিয়েছে তাদের কথাও মনে রাখতে হবে।

আমরা সময় সীমার কথা ছাড়াই আফগানিস্তানকে সহায়তা করব, কেননা উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের নতুন মেঘ ঘনিয়ে উঠছে, এমনকি পুরোনো মেঘেও ছেয়ে যাচ্ছে আমাদের আকাশ; এবং এজন্যেও, কারণ আফগানরা শুধু তাদের ভবিষ্যতের জন্যই লড়াই করছে না, উপরন্তু তারা আমাদের সবার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব তখনই এক উত্তম স্থান হবে, যখন আমরা আফগান জনগণের প্রকৃত সম্পদ, তাদের বৈচিত্র ও সমৃদ্ধি ঐতিহ্যের বিষয়গুলি অনুধাবন করতে পারব।

সমস্ত আফগানদের, এই অঞ্চল এবং বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত অঞ্চলের মানুষকে একসাথে এসে পাশাপাশি দাঁড়ানোর এখন সময় এসেছে|

সম্মানীয় সদস্যগণ,

আমাদের বন্ধুত্ব ইতিহাসের মতই প্রাচীন|

বিশাল হিন্দুকুশের ওপর দিয়ে এবং খাইবার গিরিপথের মধ্য দিয়ে সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী ও শাসকবর্গরা জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধর্ম, বানিজ্য ও সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে আমাদের সংযুক্ত করেছেন|

ইতিহাসের পরিবর্তনশীল সীমারেখায় একসময় আমরা এক ছিলাম| একসময় আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ দেখেছি| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবসময়ই পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছি|

সময়োত্তীর্ণ বৌদ্ধ প্রতীক অয়ঙ্ক ও বামিয়ান এবং দিল্লির গরিমাময় স্মৃতিসৌধে, আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পে, ভাষা ও সাহিত্যে, খাবার-দাবার ও উৎসবে, আমরা সময়োত্তীর্ণ সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই|

মহাভারতের বিখ্যাত চরিত্র গান্ধারীকে পাওয়ার জন্য আমরা প্রাচীন আফগানিস্তানের কাছে ঋণী| মৌর্য সাম্রাজ্য অথবা শেরশাহ সুরি’র কৃতিত্বের মধ্যে আমরা সেই যোগাযোগ দেখতে পাই, যে যোগাযোগ আমরা এখন পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা করছি|

দিল্লিতে এক আফগান রাজার আকাঙ্ক্ষা কবি আহমেদ শাহ দুররানি’র ভাষায় ফুটে উঠেছে— দিল্লির রাজসিংহাসন আমি ভুলে যাই, যখন আমি আমার আফগান ভূমির পাহাড় চূড়ার কথা মনে করি|

কিন্তু, প্রত্যেক ভারতীয় ও আফগানবাসীর হৃদয়ে রয়েছে পরস্পরের জন্য অসীম ভালবাসা| আমরা পরস্পরের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও কবিতা, খাবার ও উৎসব ভালবাসি| এবং এখন আমরা পরস্পরের ক্রিকেটের প্রশংসা করি|

আমরা আনন্দিত যে, আফগান জাতীয় ক্রিকেট দল দিল্লির কাছে তাদের ঘরোয়া মাঠ খুঁজে পেয়েছে এবং আগামী বছরের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জন্য অনুশীলন করছে| এবং আমি আফগানিস্তানের অনুর্ধ-১৯ ক্রিকেট দল, যারা সম্প্রতি জিম্বাবোয়েকে তাদের প্রথম ঘরোয়া সিরিজেই হারিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে অভিনন্দন জানাই|

আমরা একইরকম গর্বিত যে, আফগানিস্তানের মানুষ ভারতকে তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য অথবা পারিবারিক বাসস্থানের স্বাভাবিক পছন্দ হিসাবে গণ্য করেন|

আমরা স্মরণ করি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আফগানিস্থানের মানুষের সহায়তা; সীমান্ত গান্ধী হিসেবে সম্মানিত খান আব্দুল গফ্ফর খানের অবদান; এবং সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পাদটীকা, যখন ঠিক একশ বছর আগে, মহারাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এবং মৌলানা বরকতউল্লাহ আফগানিস্তানের কাবুলে প্রথম নির্বাসিত ভারতীয় সরকার গঠন করেন|

রাজা আমানুল্লাহ একবার মহারাজাকে বলেছিলেন যে, যতদিন না ভারত স্বাধীন হচ্ছে, ততদিন আফগানিস্তানও সেই অর্থে স্বাধীন নয়|

সম্মানীত সদস্যগণ,

এটাই আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের মূল ভাব|

এবং আপনারা যখন নতুন শতাব্দীতে নতুন যাত্রা শুরু করেন, আমরা তখন গর্বের সাথে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং আপনাদের সঙ্গে একসাথে পা বাড়িয়েছি|

গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে বিদ্যালয়, ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র পেতে এবং শিশু কল্যাণমূলক সুবিধা ও মহিলাদের জন্য সুযোগ গড়ে তুলতে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা সহায়তা করেছে।

আমরা মিলিত প্রয়াসে নির্মিত সড়কগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলকে নিকটবর্তী করেছে;

যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ পরিবহন লাইন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি আফগান জনগনের বাড়ি-ঘরে আলো জ্বালিয়েছে;

তেমনি উপগ্রহ সংযোগ আফগান জনগণের কাছে এনে দিয়েছে শিক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এবং আমরা নিরাপত্তাবাহিনীগুলিকে আরো গতিশীল হতে সহায়তা করছি।

আমরা মিলিতভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করছি সেগুলি আফগানিস্তানে কৃষি ও খনি ব্যবস্থাকে পুনর্নির্মাণে সহায়তা করছে এবং কাবুলে অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পেতে সাহায্য করছে।

একটি দেশের কাছে মানবিক সম্পদের চেয়ে আর কোনো কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই আমরা আনন্দিত যে, আমাদের মেধাবৃত্তি স্কিম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলির মাধ্যমে আফগান যুবকরা আধুনিক শিক্ষা ও পেশাদারি দক্ষতার মাধ্যমে সক্ষম হতে পারছে; আফগান সরকারও সে সম্পদ দিয়ে দেশকে উন্নত করতে পারছে, এবং আফগান নিরাপত্তাবাহিনী তাদের দেশকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষমতা পাচ্ছে।

খুব শীঘ্রই সালমা বাঁধ থেকে বিদ্যুৎ ও জল নির্গত হবে। স্তোর প্যালেস পুনরায় আপনাদের অমূল্য ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আফগান ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রতিবছর ১০০০-টি বৃত্তি দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের প্রকল্প অব্যাহত থাকবে। কৃষিবিজ্ঞান সম্পর্কিত আমাদের বিশেষ বৃত্তিমূলক প্রকল্পের প্রতি সদুত্তর পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত।

আজ, আমি আফগান নিরাপত্তাবাহিনীর শহিদদের সন্তানদের জন্য ৫০০-টি বৃত্তিদানের কথা ঘোষণা করছি।

যেহেতু আমরা আপনাদের দেশকে পুনর্নির্মাণ করতে আমাদের প্রয়াস নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি, আপনারাও আমাদের জনগণকে আপনাদের নিজেদের বলে গ্রহণ করে সুরক্ষা দিয়েছেন। আমরা প্রতিদিনই হুমকির মুখোমুখি হচ্ছি, কিন্তু আমরা আপনাদের মাঝখানে নিরাপদ বোধ করছি।
প্রতিটি আফগান নাগরিকের প্রতি আমি ভারতের দিক থেকে স্বর্গীয় কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অথবা প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় অতিথিকে সুরক্ষিত রেখেছেন|

এখানে গর্বের সঙ্গে কাজ করছেন যেসব ভারতীয় কূটনীতিবিদ, আধিকারিক, ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তার – তাদের প্রতি এবং, ভারতীয় শহিদদের পরিবারবর্গের প্রতি আমি ভারতীয়দের ও আফগানদের হয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

কেউ কেউ আছে, যারা চায় না আমরা এখানে থাকি। তাদের কেউ কেউ এখানে আমাদের উপস্থিতিতে চক্রান্তমূলক নক্সা দেখেছেন| রয়েছে অন্যান্যরা যারা আমাদের অংশীদারিত্বের শক্তির প্রতি অস্বস্তি বোধ করছে। এমনকী কেউ কেউ আবার আমাদের নিরুৎসাহিত করতে চেয়েছে।

কিন্তু, আমরা এখানে আছি, কারণ আপনারা আমাদের উপর আস্থা রাখেন। আপনারা কখনোই আমাদের প্রতিশ্রুতি এবং আমাদের বন্ধুত্বের শক্তির প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেননি। এবং আপনারা আমাদের বন্ধুত্বের সুফল দেখতে পেয়েছেন।

আপনারা যা দেখেছেন তার ভিত্তিতে আমাদের বিচার করেছেন; অন্যেরা কি বলেছে, এমনকি রহস্যময় ভারতীয় দূতাবাস সম্পর্কেও যা বলেছে, তাতে ভরসা রাখেননি।

আপনারা জানেন যে ভারত এখানে অবদান রাখতে এসেছে, প্রতিযোগিতা করতে নয়; ভারত এসেছে ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করতে, সংঘর্ষের অগ্নিশিখা জালাতে নয়; ভারত এসেছে জীবন পুনর্নির্মাণ করতে, একটি দেশকে ধ্বংস করতে নয়।

আপনারা জানেন, আমরা যেভাবে করি, ভারতীয়রা এবং আফগানরা সবসময়ই পরস্পরের পাশে দাঁড়ায়, কখনোই একে অপরের বিরুদ্ধে নয়।

আপনারা ইতিহাসের এক বাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন। এবং আপনাদের ইতিহাস আমাদের বলছে যে আপনারা কখনোই আপনাদের এক প্রতিযোগিতামূলক নাট্যের কুশিলব হয়ে উঠতে দেবেন না; অথবা অপরের নক্সা অনুযায়ীও কাজ করবেন না।

কবি কুশল খান খাট্টাক যেভাবে জাতির সম্মান ও জাতির খ্যাতিকে প্রশংসার সঙ্গে তুলে ধরেছেন, আপনাদের কাজে জীবনও সেই রকম জাতির গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকা, জীবনই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পায়।

তাই, আপনাদের বিশ্বাস ও আশ্বাস ক্রমে আফগান সমৃদ্ধি অনুযায়ী আপনারা যাতে আপনাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারেন সেজন্য আফগানদের প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য ভারত তার কাজ করে যাবে।

বন্ধুত্ব থেকে যে দায়িত্ব আসে আমরা সেখানে থেকে কাজ করে যাব। কিন্তু, আমরা আমাদের অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এই কাজ করব।

আমরা জানি আফগানিস্তানের সাফল্যের জন্য তার প্রতিটি প্রতিবেশীর কাছ থেকে সহযোগিতা ও সহায়তা দরকার। এবং, এই অঞ্চলের আমরা সবাই ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও অন্যান্যরা-অবশ্যই আমাদের অভিন্ন গন্তব্যকে স্বীকৃতি জানিয়ে এবং আমাদের অভিন্ন প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হব।

আফগানিস্তান যখন শান্তির স্বর্গ হয়ে উঠবে এবং যে কেন্দ্রটি থেকে এঅঞ্চলে বাণিজ্য, শক্তি ও বিনিয়োগের প্রবাহ বইতে থাকবে, তখন আমরা সবাই মিলিতভাবে সমৃদ্ধ হব।

সেইজন্য আমরা ইরানের চাভাহারের মাধ্যমে এবং সেই সঙ্গে স্থল ও সমুদ্র পথে আপনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে আমরা কাজ করছি।

সেইজন্যই আমি আশা করি দক্ষিণ এশিয়া ও আফগানিস্তান এবং তারও পরে বিস্তৃত অঞ্চলে যোগসূত্রের সেতু হয়ে উঠবে পাকিস্তান।

আমি আশা করি, সেদিন খুব শীঘ্রই আসবে, যখন আমাদের এঅঞ্চলে মধ্য এশিয়া থেকে সমৃদ্ধির শক্তি হিসেবে শক্তি আসবে; যখন কাবুলিওয়ালারা পুনরায় সহজেই ভারতীয় হৃদয় জয় করতে পেরিয়ে আসবে পথ; যখন ভারতে আমরা আফগানিস্তানের অনুপম ফল আস্বাদন করব; যখন আফগানদেরও ভারত থেকে তাদের পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে আর চড়া মূল্য দিতে হবে না।

এটাই হল এই অঞ্চলের ইতিহাসের ধারা। এবং এটাকে অবশ্যই এর ভবিষ্যতের পথ হয়ে উঠতে হবে।

কিন্তু, সাহসিকতার সঙ্গে ও অক্লান্তভাবে দেশকে রক্ষা করার জন্য লড়াকু আফগানদের আফগানিস্তান একমাত্র তখনই সফল হবে যখন আর তার সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হবে না সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ; যখন সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়স্থল ও মুক্তোদ্যানগুলি বন্ধ হয়ে যাবে; এবং যখন তাদের পৃষ্ঠপোষকরা আর বাণিজ্য করতে পারবে না।

সন্ত্রাস ও হিংসা আফগানিস্তানের ভবিষ্যকে রূপদানের যন্ত্র হতে পারে না অথবা আফগানদের পছন্দকেও নিয়ন্ত্রন করা যাবে না এইভাবে।

আফগানিস্তানে যে আগুন জ্বলেছে তা কখনোই সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকতে পারে না।

আফগানরা তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে সদিচ্ছা রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করারও সাহস রয়েছে।

এবং আফগানদের অবশ্যই সমস্ত দিক থেকে তাদের নিজেদের মধ্যে শান্তি বজায় রাখারও অধিকার রয়েছে।

কাবুল নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক রক্ত। পর্বতের ঢাল বেয়ে অনেক বিষাদময় ঘটনার অন্ধকার নেমে এসেছে। অনুভূতিহীন সংঘর্ষের আগুনে দগ্ধ হয়েছে অনেক স্বপ্ন।

হতে পারেন আপনারা পুস্তুন, উজবেক, তাজিক্স, হাজারাস্। আপনারা হতে পারেন মুসলিম, হিন্দু ও শিখ।

কিন্তু, আপনারা আফগান হিসেবে গর্বিত, এক দেশ, এক জাত ও এক মানুষ হিসেবে আপনারা একত্রিত।

আপনারা ধর্মের নামে লড়াই করতে পারেন; অথবা লড়াই করতে পারেন পরিচিতির জন্য।

কিন্তু, আফগানদের জন্য শান্তির প্রয়োজনে পরস্পরের কাছে আসার সময় হয়েছে।

যেমন একজন প্রজ্ঞাবান আফগান বলেছেন, কোনো তিক্ত বীজের গাছকে যদি চিনি ও মাখন খাইয়ে বড় করা হয়, তথাপি ওটাতে তেতো ফলই গজাবে।

আপনাদের আছে বহুত্ববাদের গৌবরময় ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্য ও বহুমুখি বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা।

যারা বাইরে থেকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, তাদের অবশ্যই এই ভবন ও এই শিক্ষাসদনে এসে পথের সন্ধান খুঁজতে হবে; তাদের অবশ্যই ভোটপত্রের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে শক্তি। যারা বাড়ি-ঘর ধ্বংস করেছে, তাদের অবশ্যই এখন নিজেদের দেশকে গড়ে তুলতে হবে। কেননা, এটা করতে হবে আপনাদের দেশের জন্য, আপনাদের জনগণের জন্য।

এবং, এটা অবশ্যই আপনাদের মেধার উপর নির্ভর করে, আপনাদের নিজেদের প্রক্রিয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধের উদ্দীপনার মাধ্যমে অর্জনের ক্ষেত্রে আপনাদেরই পালা।

অন্যদের হিসাব নিকাশ অথবা উচ্চাকাঙক্ষার দ্বারা চালিত হয়ে নয়।

এবং, বিগত দেড় দশক ধরে শান্তি ও আলোচনার মাধ্যমে বহু কষ্টে যে ভবিষ্যৎ আপনারা গড়ে তুলছেন তা অবশ্যই সুরক্ষিত করতে হবে। প্রতিটি আফগানের জন্যই এখানে একটা স্থান থাকতে হবে। এখানে অবশ্যই প্রতিটি ব্যক্তির আশা-আকাঙক্ষার স্থান থাকতে হবে। এবং এটা এমনই এক দেশ হতে হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকেরই থাকবে তার অধিকার এবং ভবিষ্যতের প্রতি তার আস্থা।

এবং, যেহেতু আফগানরা তাদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন, তাই বিশ্বকে অবশ্যই তাদের পাশে সৌভ্রাতৃত্ব ও সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে হবে।

আমরা অবশ্যই যেসব সৈনিক বিদেশ থেকে এসেছে এবং যারা যেসব আফগান গ্রামের কথা কখনো শোনেনি, যেসব আফগান জনগণের কথা কখনো জানেনি, তাদের জন্য জীবন দিয়েছে যারা, তাদের জন্য কিছু করব; এবং যারা আফগানদের জন্য অপরিসীম আত্মত্যাগ করেছে, জীবন দিয়েছে তাদের কথাও মনে রাখতে হবে।

আমরা সময় সীমার কথা ছাড়াই আফগানিস্তানকে সহায়তা করব, কেননা উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের নতুন মেঘ ঘনিয়ে উঠছে, এমনকি পুরোনো মেঘেও ছেয়ে যাচ্ছে আমাদের আকাশ; এবং এজন্যেও, কারণ আফগানরা শুধু তাদের ভবিষ্যতের জন্যই লড়াই করছে না, উপরন্তু তারা আমাদের সবার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব তখনই এক উত্তম স্থান হবে, যখন আমরা আফগান জনগণের প্রকৃত সম্পদ, তাদের বৈচিত্র ও সমৃদ্ধি ঐতিহ্যের বিষয়গুলি অনুধাবন করতে পারব।

সমস্ত আফগানদের, এই অঞ্চল এবং বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত অঞ্চলের মানুষকে একসাথে এসে পাশাপাশি দাঁড়ানোর এখন সময় এসেছে|

এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।

আশার আলোকশিখা কখনোই নির্বাপিত হবে না।

কোনো বালিকাই আর সুযোগের অভাবে পদস্খলিত হয়ে নিমজ্জিত হবে না অন্ধকার দুনিয়ায়।

কোনো পুত্রকেই আর বন্দুক বেছে নেওয়ার মুখে পড়তে হবে না অথবা আশ্রয় নিতে হবে না দূর দেশে।

কোনো মা-কেই আর তার সন্তানকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসার সময় সন্ত্রস্ত হতে হবে না।

কোনো নেতাকেই আর আফগান স্বাধীকারের জন্য বন্ধু বেছে নেওয়ার বিষয়ে কথা বলার কারণে হারাতে হবে না তার ভাইকে।

কাউকেই আর মসজিদে নতজানু অবস্থায় প্রার্থনাকালে ধর্মের নামে নিহত হতে হবে না।

কোনো প্রবীণকেই, যার যৌবন সংঘর্ষের মাঝে বিফল হয়েছে বলে, পেছন ফিরে তাকাতে হবে না এবং তার পৌত্রের জন্য দেখতে হবে না অনুরূপ ভবিষ্যৎ।

প্রতিটি যুবকই আফগানিস্তানে দেখতে চায় এমন এক ভবিষ্যৎ যেখানে ‘আইটি’-র মানে ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি’ (তথ্য-প্রযুক্তিই), তা কখনোই ‘ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিজম’ (আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ) নয়।

একুশ শতকের এই প্রতিশ্রুতি ও সুযোগ বিশ্বের আর অন্যান্যদের মতো আফগান যুবকদের কাছেও একই রকম।

ভারতের জন্য এ এক গভীরতর প্রতিশ্রুতি।

আপনাদের দুর্ভোগ আমাদের বেদনা।

আপনাদের স্বপ্ন আমাদের কর্তব্য।

আপনাদের শক্তি আমাদের বিশ্বাস।

আপনাদের সাহস আমাদের অনুপ্রেরণা। সর্বোপরি, আপনাদের বন্ধুত্ব আমাদের সম্মান।

এবং হিন্দি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত পাঠান চরিত্র শের খান ‘জঞ্জির’ ছবিতে যেমন গেয়েছেন,

ইয়ারি হায় ইমান মেরা, ইয়ার মেরি জিন্দেগি। বন্ধুত্ব আমার বিশ্বাস, বন্ধু আমার জীবন।

এ হল আফগান ও ভারতীয়দের ধর্ম-বিশ্বাস।

আমি এ বিষয়ে প্রত্যয়ী যে আপনাদের গৃহে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রত্যাবর্তন হবে, হাসি ফিরে আসবে আপনাদের বিদ্যালয়গুলিতে, আপনাদের রাস্তায় ফিরে আসবে জীবন, আপনাদের নগরীগুলিতে আসবে জীবন, আপনাদের সমাজে আসবে ঐক্য এবং শান্তি ফিরে আসবে আপনাদের দেশে।

এবং আপনাদের যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে ভারত থাকবে আপনাদের সঙ্গে।

ধন্যবাদ। এই সম্মান ও সুযোগ দেওয়ার জন্য ফের ধন্যবাদ জানাই আপনাদের।

ধন্যবাদ।

SC/SRC/AD/DSC/AGT