Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

উজ্জ্বয়িনীতে আয়োজিত সিংহস্হের বিশ্বজনীন বার্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

উজ্জ্বয়িনীতে আয়োজিত সিংহস্হের বিশ্বজনীন বার্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ


আমাদের একটি দোষ হল, সমাজের ক্ষেত্রে আমরা সবসময়ই নিজেকে পরিস্হিতির স্বভাব থেকে আলাদা ভাবি। আমরা এমন দর্শনের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছি যেখানে শরীর আসে যায়, আমরা যুক্ত থাকি অবিনশ্বর আত্মার সঙ্গে। সেজন্যে আমাদের আত্মাবিষয়ক ভাবনা কোনও কালের বন্ধন মানে না, কালের দাসত্বও স্বীকার করে না। ফলে এমন অবস্হা দাঁড়িয়েছে যে আমাদের এই মহান ঐতিহ্য, এই হাজার হাজার বছর পুরনো সংস্কৃতি, কোন সামাজিক প্রেক্ষিতে কোন ভাবনা থেকে কিসের উতপত্তি, তা প্রায়ই জানা যায় না। এই কুম্ভ মেলার পরম্পরা কেমন করে শুরু হয়েছে, তা নিয়েও নানা মত রয়েছে।

অনেক অনেক বছর আগে থেকেই এই পরম্পরা চালু রয়েছে। কেউ বলেন হাজার বছর, আবার কেউ বলেন, দু হাজার বছর, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে এই পরম্পরা মানবজীবনের সাংস্কৃতিক যাত্রাপথের প্রাচীন ব্যবস্হাগুলির অন্যতম। আমি মনে মনে ভেবে দেখেছি যে কুম্ভমেলা নাসিক, উজ্জ্বয়িনী এবং হরিদ্বার ৩ বছর পর পর আয়োজিত হয়। আর ১২ বছরে একবার প্রয়াগরাজে হয় পূর্ণকুম্ভ মেলা। এই মেলা প্রচলনের মাধ্যমে তখনকার মনিষীরা বিশাল ভারতকে একত্রিত করার উদ্দেশ্যেই এই মহামিলনের ব্যবস্হা করেছিলেন। ততকালীন সমাজবিদ, ও মুনি ঋষিরা সর্বদাই সমাজের সুখ-দুঃখের কথা ভাবতেন। সমাজের ভাগ্য এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিত্যনতুন বিধান অন্বেষণ এবং আবিষ্কার করতেন। তাঁরা যে যেখানেই থাকুন না কেন, বাহ্য জগতের গবেষণার পাশাপাশি অন্তর্জগতের যাত্রাপথও অন্বেষণের চেষ্টা করতেন। এই প্রক্রিয়া নিরন্তর-শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে সঞ্চারিত হয়েছে। এভাবে এগুলি এক পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে বংশানুক্রমে নতুন প্রজন্মের হাতে পুনর্নবীকৃত হয়েছে, সমকালীন পরম্পরায় সমাহিত হয়েছে।

প্রয়াগরাজের কুম্ভমেলায় যে মহাসম্মেলন হতো, সেখানে বিগত ১২ বছরের সামাজিক পর্যালোচনা হতো। তারপর সেগুলির দোষ ত্রুটি বিচার করে পরবর্তী ১২ বছরের পরিকল্পনা ছকে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। বিশাল কর্মপদ্ধতি ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে দেশের সমাজপতিরা এই সিদ্ধান্ত ও সংকল্প নিয়ে নিজের নিজের এলাকায় ফিরে যেতেন। আর প্রত্যেক তিন বছরে নাসিক, উজ্জ্বয়িনী এবং হরিদ্বারে তাদের কর্মপদ্ধতি ও প্রয়োগের সুফল ও কুফল নিয়ে মধ্যবর্তী মেয়াদের মূল্যায়নহতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ পরস্পরের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবহিত হতেন। ত্রিশ দিন ধরে এক জায়গায় থেকে সমাজের নানা গতিবিধি, প্রয়োজনীয় পরিবর্তিত পরিস্হিতিতে যুগোপযোগী চিন্তাভাবনার পর আরেকবার ৩ বছরের জন্য পরিকল্পনা নির্দ্ধারিত হতো। এ ধরনের অদ্ভুত সামাজিক পরিকাঠামো ছিল আমাদের। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা সময় আসে যখন পরম্পরা থেকে গেলেও এতে আর প্রাণ অবশিষ্ট থাকে না। এখন অধিকাংশ মানুষই মেলায় এসে মাসাধিককাল থেকে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না। সকলেরই সময়ের অভাব। তারা পুণ্যার্জনে এসে ১৫ মিনিটের জন্য পুণ্যস্নান সেরে চলে যান।

এহেন পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বয়িনীর কুম্ভমেলার আয়োজকরা সাধুদের আশীর্বাদে সেই সহস্রাব্দপ্রাচীন ব্যবস্হার একটি আধুনিক সংস্করণ চালু করেন। এতে আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবজাতিকে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, মানব কল্যাণের অধুনাতম উপায় কী হতে পারে, পরিবর্তিত সময়ে কালবাহ্য রীতি রেওয়াজ পরিত্যাগ করে এক নতুন বিশ্বাস, নতুন সতেজতা নিয়ে কেমন করে এগোনো যায় তা নিয়ে আলাপ আলোচনার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস এই মহাকুম্ভ উপলক্ষ্যে শুরু হয়েছে।

যে একান্নটি বিন্দু, অমৃত বিন্দু এই আলোচনায় বিশ্লেষিত হবে, শিবরাজজী বলেছেন, এটি একদিনের সমারোহ নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশ্বের নানা স্হানে এই বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরা দু’বছর ধরে গবেষণা করেছেন, আর গত তিনদিন ধরে এখানে মহাজ্ঞানী সাধু-সন্ন্যাসীদের সান্নিধ্যে তাদের গবেষণালব্ধ উপলব্ধি নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সমাজের কল্যাণে এই ৫১টি অমৃত বিন্দু প্রস্তুত করেছেন। আমাদের মতো ক্ষুদ্রবুদ্ধির রাষ্ট্রনেতারা এই বিষয়গুলি সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারবো বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু এটা বুঝি যারা স্বার্থহীনভাবে সমাজের জন্য কাজ করেন, তাঁরা গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করুন কি না করুন, তাঁরা ত্যাগ ও তপস্যার অধিষ্ঠানে বেঁচে থাকেন। যে বৈজ্ঞানিক তাঁর গবেষণাগারে জীবনের অধিকাংশ সময়অতিবাহিত করেছেন, যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষিকাজ করেছেন, যে শ্রমিক দিনরাত এক করে নিষ্ঠার সঙ্গে শিল্পোতপাদন করেন আর যে সাধু সমাজকে পথ দেখান- এই সকল শক্তির গতিপথ যদি এক হয় তাহলে সমাজে কতবড় পরিবর্তন আসতে পারে! সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই ৫১টি অমৃতবিন্দু আগামীদিনে ভারতের জনমানসকে এবং বিশ্ববাসী ভারতে কোন দৃষ্টিতে দেখবে, এমনকি রাজনৈতিক মঞ্চে কোন ধরণের চিন্তাভাবনা সময়ানুকূল হতে পারে সেই সম্পর্কে দিক নির্দেশ করলে এই প্রয়াস সার্থক প্রতিপন্ন হবে।

আমরা এমন দেশের মানুষ যেখানে ছোট ছোট জিনিসকে বড় করে দেখা হয়। আমরা সেই সংস্কার ব্যবস্হার সৃষ্টি। এ দেশে একজন ভিখিরিও ভিক্ষা চাওয়ার সময় বলেন ‘যিনি দান করবেন তাঁর ভাল হোক, যিনি দিতে পারবেন না তাঁরও ভাল হোক’। সকলের মঙ্গলকামনার এই পরম্পরা আমাদের শিরা ধমনীতে প্রবাহিত। আমাদের কৈশোরেই শেখানো হয়, তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জিথাঃ।আমাদেরশিরা ধমনীতে প্রবাহিত এই জীবনদর্শন যখন আমাদের আচরণে প্রকাশ পায় না তখন মনে হয় যে আমরা কি নিজেদের পরম্পরা থেকে বিচ্যুত হচ্ছি? আবার এ ধরনের আন্তর্জাতিক চিন্তার বিকাশ দেখলে মনেআশা জাগে যে আজও আমাদের দেশে এই সামর্থ্য রয়েছে।

অনেক বছর আগে দেশের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী দেশবাসীকে সপ্তাহে একদিন রাতের খাবার ত্যাগ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেশ তখন খাদ্যাভাবে ভুগছিলো। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তখন কোটী কোটী মানুষ ‘তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জিথাঃ’কে মূলমন্ত্র করে একবেলার আহার পরিত্যাগ করে দেশকে খাদ্য-সংকট থেকে মুক্ত করেন। এ ধরণের মানুষেরা আজও আমাদের দেশে রয়েছেন। তাদের শিরা ধমনীতে ‘তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জিথাঃ’ সদা সঞ্জীবিত ও নিয়ত প্রবহমান। আগের বছর মার্চ মাসে আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি আহ্বান রেখেছিনাম। এমনি কথায় কথায় বলেছিলাম যে, যাঁরা সম্পন্ন মানুষ তাঁরা গ্যাস সিলিন্ডারে ভর্তুকি পরিত্যাগ করুন। আপনারা ভর্তুকি না নিলে আমরা অসংখ্য হতদরিদ্র মানুষের রান্নাঘরে ভর্তুকিযুক্ত রান্নার গ্যাস সংযোগ দিতে পারবো। আমার এই আবেদনে সাড়া দিয়ে এদেশের এক কোটি পরিবারের মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষও ভর্তুকি পরিত্যাগ করে দিয়েছেন। তাদের সকলকে আমি বারবার নতমস্তকে প্রণাম জানাই।

তাঁদের এই ত্যাগ বৃথা যায়নি। আমরা দেখেছি যে হতদরিদ্র পরিবারের মায়েরা কাঠের উনুন জ্বালিয়ে রান্না করার সময় প্রতিদিন চারশো সিগারেটের সমান ধোঁয়া ফুসফুসে ভরে নিয়ে ক্রমে অসুস্হ হয়ে পড়েন। আমরা সেই মায়েদের রান্নাঘরে আপনাদের শুভেচ্ছার পরিণাম পৌঁছে দেব। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আগামী তিন বছরে দেশের পাঁচ কোটী হত দরিদ্র পরিবারে গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে সেই মায়েদের বিষাক্ত ধোঁয়ার কবল থেকে মুক্তি দেব। আজ এখানে আলোচনার অন্যতম বিষয় হল, পরিবেশের নিরাপত্তা। পাঁচ কোটি পরিবারে গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে পারলে মায়েদের স্বাস্হ্যের উন্নতির পাশাপাশি দেশের বনসম্পদও রক্ষা পাবে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে।

এখানে নারী ক্ষমতায়ন এবং নারীর অস্মিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।এই গ্যাসের উনুন মায়েদের অস্মিতারক্ষার পাশাপাশি তাদের স্বাস্হ্যের সুরক্ষাও সুনিশ্চিত করবে।

আমি জানি যে, আমাদের শাস্ত্রগুলিতে এমন কিছুই নেই যা আমাদের পথভ্রষ্ট করতে পারে। আমরা শুধুই নিজের সুবিধামতো বিষয়গুলিকে তুলে ধরি, পূর্ণরূপে গোটা বিষয়টিকে অবলোকন করার স্বভাব পরিত্যাগ করলে চলবে কেন? আমাদেরমুনিঋষিরা বলেছেন, মানুষ নিজের কর্তব্যগুলিকে যথাযথভাবে পালন করলে সে নারায়ণ হয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, ‘যোগঃ কর্মসু কৌশলম্’। এভাবে শ্রীমদ্ভাগবতগীতায় যুগে যুগে আমাদের দেশে কর্মের মহত্বকে স্বীকার করা হয়েছে। সেজন্যেই আমরা এই পবিত্র সম্মেলনে সেই ভাবনাপ্রবাহকে পুনর্জীবিত করতে পারি। তমসো মা জ্যোতির্গময়। অন্ধকার থেকে আলোর পথ জ্ঞানের পথ অন্বেষণ করতে পারি। আমাদের পূর্বজরা বলেছেন, জ্ঞানের কোনও পূর্ব-পশ্চিম ভেদ হয় না, জ্ঞান গতকাল কিম্বা আগামীকাল হয় না, জ্ঞান অজর অমর অক্ষয়, সর্বকালের মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হন। বিশ্বে যা কিছু ভাল, যা কিছু শ্রেষ্ঠ- তাকে গ্রহণ করা ও আত্মস্হ করা আমাদের হাজার হাজার বছরের স্বভাব।

আমরা বিবিধের মাঝে মিলন মহান সমাজের মানুষ। আমাদের বৈচিত্র্যে কিছু বাইরের মানুষ দ্বন্দ্ব অনুভব করেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে দ্বন্দ্ব ব্যবস্হাপনা নিয়ে অনেক সম্মেলনে আলাপ আলোচনা করেও সমাধান খুঁজে পান না। কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য আমরা পরম্পরাগতভাবেই আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব ব্যবস্হাপনায় পারদর্শী। তা না হলে আমরা কেমনভাবে বিপরীতমুখী ভাবনাকে ধারণ করতাম। আমরা রামের পুজো করি যিনি পিতার আজ্ঞা পালন করতে চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গিয়েছিলেন। আবার আমরা সেই প্রহ্লাদের-ও পুজো করি যিনি পিতার আদেশ অগ্রাহ্য করে বিষ্ণুর পুজো করেছিলেন। আমরা মা সীতাকে পুজো করি যিনি স্বামী ও শ্বশুরের ইচ্ছাপালনে সারাজীবন কষ্ট পেয়েছেন, আত্মাহুতি দিয়েছেন। আবার আমরা মীরাকে শ্রদ্ধা করি যিনি স্বামীর আদেশ অগ্রাহ্য করে কৃষ্ণের উপাসনা করেছেন। এর থেকে বড় দ্বন্দ্ব ব্যবস্হাপনা আর কী হতে পারে? আমরা কট্টরতাকে প্রশ্রয় দিই না, আমরা দর্শন অনুসারী। দর্শন হল উত্তপ্ত বিচার প্রক্রিয়া আর জীবন শৈলীর সমন্বয় ভাবনা, সময়ের চাহিদা অনুসারে যা বিস্তার লাভ করে। এই দর্শন আমাদের জিজীবিষাকেপ্রতিনিয়ত প্রেরণা যোগায়।

এখানে আলোচনার আরেকটি বিষয় হল- মূল্যবোধ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। যারা বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে অবহিত তাঁরা জানেন, আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের আগে নেতারা যখন বক্তৃতা দেন তখন একটি সাধারণ জনপ্রিয় বিষয় হলো- পারিবারিক মূল্যবোধের পুনঃস্হাপন। এখন গোটা বিশ্ব পরিবার সংস্হা এবং পারিবারিক জীবনের মূল্য খুব ভালভাবে অনুভব করছে। আমরা সেই পারিবারিক মূল্যবোধে সম্পৃক্ত দেশের মানুষ। কিন্তু আমাদের সামনেও মূল্যবোধের অবক্ষয় একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আপনাকে সম্মান জানাবো আর আপনি আমাকে সম্মান জানাবেন, মূল্যবোধের সীমা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। যে মূল্যবোধ সময়ের কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত সেটাই মান্যতা পায়। সেজন্য প্রত্যেক সমাজের মূল্যবোধ আলাদা হয়। সেই মূল্যবোধ সম্পর্কে অবহিত ও সজাগ না থাকলে, অজ্ঞানতা কিম্বা হীনমন্যতার কারণে বড় সংকট মুহূর্তে অধিকাংশ মানুষ তার মোকাবিলা করতে পারে না। পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। আমাদের পলায়নোন্মুখ দেখলে বিশ্ববাসী আমাদের সংকট মুহূর্তে মূল্যবোধকে সম্মান জানাবে না।

আমাদের ভাবনাচিন্তাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে বিচার বিশ্লেষণের পরই বিশ্ববাসীর কাছে উপস্হাপিত করতে হবে। এই কুম্ভের উপলক্ষে এ ধরণের আলাপ-আলোচনা অগ্রাধিকার পেলে আমাদের মূল্যবোধে শান দেওয়া সম্ভব হবে।

একটা সময় ছিল যখন আমাদের মুনি ঋষিরা সমুদ্রযাত্রাকে অশুভ মানতেন। কিন্তু তারপর সমুদ্র সম্পর্কে জ্ঞানবৃদ্ধির পর আমাদের বণিকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বানিজ্যতরী ভাসানো শুরু করেন। তখনকার মুনিঋষিরা তাদের উদ্দেশে আশীর্বাদ করতেন, তারা নিজেরাও বিশ্বভ্রমণে গেছেন, বিশ্বের নানা প্রান্তে গিয়ে সাধনা করেছেন। জ্ঞানবৃদ্ধি হলে পরম্পরাতেও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। মানুষকে যুগোপযোগী হতে হবে। পরম্পরার নামে কোনও অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত আঁকড়ে বসে থাকলে চলবে না। বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কারকে স্বীকার করে নিয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবো!

আজ বিশ্ব দুটি সংকটের মুখোমুখি- বিশ্ব উষ্ণায়ণ এবং সন্ত্রাসবাদ। আমরা কিভাবে এগুলির মোকাবিলা করবো? এই সমস্যাগুলির মূলে কী? তোমার পথ থেকে আমার পথ বেশি ঠিক। এই মনোভাবই যে কোনও দ্বন্দ্বকে সংকটে পরিণত করে। আজকের বিশ্বে বিস্তারবাদ কোনও সমস্যার সমাধান নয়। শুধুই আনুভূমিক না ভেবে আনুলম্বিক ভাবারও প্রয়োজন রয়েছে। অন্তরকেজাগাতে হবে, ব্যবস্হাগুলিকে আধুনিক করতে হবে। নতুন উচ্চতা পার করতে হলে অন্যের মূল্যবোধকেও স্বীকার করে নিতে হবে। সেজন্যই হাতে সময় থাকতে চিন্তন, মনন ও আন্তরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনের উপজ হিসেবে নতুন বিধান সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের বেদ জ্ঞানের ভান্ডার। এসত্ত্বেও বেদের আলোকে পরবর্তী জ্ঞানের বিশ্লেষণের জন্য রচিত হয়েছে উপনিষদ। পরবর্তীকালে উপনিষদের আলোকে তাঁর পরবর্তী জ্ঞানকে সংহত করেছে স্মৃতি ও শ্রুতি শাস্ত্রসমূহ। আজ একবিংশ শতাব্দীর মানবকল্যাণে বেদ, উপনিষদ, স্মৃতি ও শ্রুতির আলোকে অধুনাতম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে সংযুক্ত করে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যে ৫১টি অমৃতবিন্দু নিয়ে এই সম্মেলনে চিন্তন ও মনন প্রক্রিয়া চলছে এতে সম্ভবতঃ এই সময়ের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এগিয়ে এসেছেন মহাজ্ঞানী সাধকেরা। যদি এই ৫১ অমৃতবিন্দু নিয়ে চিন্তন ও মনন প্রক্রিয়ার পরও কিছু বাকি থেকে যায় সেই অমৃতও আপনারাই এই কুম্ভ উপলক্ষে মানবকল্যাণে উতসর্গ করবেন।

আমাদের এত বড় বড় মেলা, এত ভিড় থেকে বাইরের মানুষ আমাদের বিশৃঙ্খল ভাবেন। কারণ আমরা সঠিকভাবে নিজেদের জ্ঞানকে বিশ্ববাসীর সামনে পরিবেশন করতে জানিনা। যারা এই পরিবেশন বিদ্যায় পারদর্শী, পেশাদার, তারাও অনেক সময় সংক্ষেপে সারেন। এটা আমাদের জাতীয় চরিত্র। কুম্ভমেলার নামে বিশ্বের সর্বত্র শুধু নাগা সন্ন্যাসীদের ছবি প্রচারিত হয়। যারা মাহাত্ম্য বোঝে না, তারা এই দৃশ্যগুলিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। অথচ আমরা যদি এই কুম্ভমেলাকে আমাদের ব্যবস্হাপনার সার্থকরূপে পরিবেশন করতে পারি তাহলেই দেখবেন সকলের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। আমরা যদি বলি, কোনওরকম সার্কুলার জারি করা হয়নি, নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় নি তবুও দেশের সকল প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসেছেন। শিপ্রা নদীর দুই তীরে ইউরোপের অনেক দেশের জনসংখ্যার থেকে বেশি মানুষ একত্রিত হয়েছেন, তাদের জন্য কোনও ফাইভস্টার হোটেল নেই, রুম বুক করার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ ত্রিশ দিন ধরে মেলা চলতে থাকে, পুণ্যস্নান, পুজো সবই চলতে থাকে। প্রয়াগরাজে পূর্ণকুম্ভের সময় তো ইউরোপের কয়েকটা দেশের জনসংখ্যার সমান মানুষ প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করেন। তেমন উল্লেখ করার মতো আইন-শৃঙ্খলা সমস্যাও হয় না। এর থেকে বড় ব্যবস্হাপনা আর কী হতে পারে। আমরা এই আন্তরিক ব্যবস্হাপনাকে ব্রান্ডিং করতে পারি যদি তাহলেই দেখবেন আমাদের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গী কত বদলে গেছে। ভারতের সাধারণ নির্বাচন একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। এত বড় দেশ, বিশ্বের অনেক দেশের জনসংখ্যার থেকে বেশি আমাদের ভোটদাতা। কিন্তু নির্বাচন কমিশন আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে কত সুচারুরূপে এই নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পাদন করে। বিশ্বের ব্যবস্হাপনা শাস্ত্রের ছাত্রদের জন্য এই দেশের নির্বাচন ইতিমধ্যেই সবচাইতে বড় কেস স্টাডির বিষয় হয়ে উঠেছে, আর আমিও বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছি। কুম্ভমেলার ব্যবস্হাপনা নিয়েও তাদের কেস স্টাডি করা উচিত।

সময়ের চাহিদা অনুযায়ী, বিশ্ববাসী যে ভাষা বোঝে, সেই ভাষায় আমাদের সামর্থ্যকে তুলে ধরতে হবে। শুধুই নিজেদের মত করে বললে চলবে না, যে যে ভাষায় বোঝে, যে যুক্তি দিয়ে বোঝে, যে মাধ্যমে বোঝে, সেগুলিকে আমাদের রপ্ত করতে হবে। তারপর তাদের মতো করে আমাদের সামর্থ্যকে পরিস্ফুট করতে হবে। আমি নিশ্চিত যে তাদের ভাষায় বোঝালে আমাদের দেশের হাজার হাজার বছর প্রাচীন ঐতিহ্য ও সামাজিক চেতনা আমাদের নবীন প্রজন্মকে আকর্ষণ করবে। তারা যদি এই ঐতিহ্যে অনুপ্রানিত হন তাহলে পারিবারিক বন্ধন দ্রুত ভেঙে পড়বে না। সেজন্যে আমি আপনাদের আলোচ্য ৫১ অমৃতবিন্দুর বাইরে সমস্ত আখড়া, সকল পরম্পরার সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে বিনম্র নিবেদন করবো, প্রার্থনা করবো, এখান থেকে যাওয়ার পর আপনারা নিজেদের আখড়ায় এবং পরস্পরের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিবেচনা করুন যে প্রতি বছর এই বিচার-কুম্ভের আয়োজন করা যায় কি না!

আপনারা মোক্ষলাভের কথা অবশ্যই বলবেন, কিন্তু বছরে অন্ততঃ একটি সপ্তাহ সকলে মিলে বসে বিশ্বের নানা সমস্যার সমাধানে বৃক্ষরোপন, নদী সংস্কার, নির্মল জল ও পরিবেশ, স্ত্রী ও শিশু শিক্ষা, স্ত্রী অস্মিতা বৃদ্ধির কথা বলুন। নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সুফল ও কুফল নিয়ে আলোচনা হোক। যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না তাদেরও এই আলোচনা সভায় আমন্ত্রণ জানানো হোক। তাদের মতামতও শোনা হোক এবং তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ হোক। এতে আপনাদের ভক্ত গোষ্ঠী তো উপকৃত হবেনই, আপামর দেশবাসীও উপকৃত হবেন, মানব সভ্যতাও লাভবান হবে বলে আমার বিশ্বাস।

তাহলে হয়তো ৩ বছর পর যে কুম্ভমেলা হবে কিম্বা ১২ বছর পর যে মহাকুম্ভ হবে সেখানে তুলনামূলক অনেক বেশি ক্ষুরধার চিন্তন ও মনন অনুভব করবেন।

সম্প্রতি প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা ধার্মিক জীবনকে কেমনভাবে বদলে দিতে পারে তা নিয়ে লেখা একটি বই ওই সম্মেলনে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে। আমাদের এই সাফল্যের কারণ হল, আমরা সে দেশের মানুষ যারা হাজার হাজার বছর ধরে বৃক্ষে পরমাত্মা দর্শন করি, জলে জীবন দেখি, চন্দ্র এবং সূর্যের সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করি। আজ সারা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক ধরিত্রীদিবস পালন করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শিশুরা সকালে ঘুম থেকে উঠে মাটিতে পা রাখতেই মা শেখান, বাবা মাটিতে পা রেখেই আগে ধরিত্রী মা-কে প্রণাম জানিও, ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমাদের দেশে মায়েরা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখান যে এই গোটা ব্রম্ভান্ড তোমার পরিবার। চাঁদ তোমার মামা, সূর্য তোমার দাদু! এভাবে আমরা সকলেই সহজরূপে প্রকৃতিকে ভালবাসতে শিখি, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্হানের সংস্কার আমাদের ঋদ্ধ করে। সেজন্যেই যে বিন্দুগুলি নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই, সেগুলির মধ্যে যা কালবাহ্য তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। আমরা কেন কালবাহ্য সংস্কারের বোঝা বহন করবো? সব পরিবর্তনকেইসংকট ভাবার কোনও কারণ নেই। বিজ্ঞানসম্মত ও ব্যবহারিক পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে হবে। পরিবর্তনই সজীবতার লক্ষণ। আমরা সর্বসমাবেশক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, আমরা সকল ইতিবাচকতাকে, শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকে আহরণ করবো, সমৃদ্ধ হবো। আমাদের এই সংযোজনের সামর্থ্যকে দুর্বল হতে দিলে চলবে না। এই সামর্থ্যই আমাদের সহিষ্ণু করে তোলো। যে কোনও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সহিষ্ণুতাকে আরও বিকশিত করতে হবে। আমাদের মুনি ঋষিদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্ঞানভান্ডারকে সম্বল করে আমরা এই সংযুক্তিকরণ ও কালবাহ্য বর্জনে অবশ্যই সাফল্য পাব। এই সম্মেলন এই সাফল্যের পথ দেখাক।

আমি এই অসাধারণ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য শিবরাজজী এবং তাঁর অনুগামী দলকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। মাঝে প্রকৃতি বাধ সেধেছিল, হঠাতই ভয়ানক ধুলিঝড় ও বৃষ্টি আসায় বেশ কিছু ভক্ত প্রাণ হারালেন। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আপনারা সবকিছু সামলে নিয়েছেন। এখানে মধ্যপ্রদেশ সরকারের প্রায় চল্লিশ হাজার কর্মচারী নিযুক্ত রয়েছেন। তাদের প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সুষ্ঠভাবে মেলা সম্পাদনের পাশাপাশি বিশ্ববাসীর সামনে ভারতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। দেশবাসীর আপনাদের প্রতি ভরসা বেড়েছে যেভাবে একমাস ধরে আপনারা লাগাতার পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি আমি উজ্জ্বয়িনীর সকল নাগরিককে অভিনন্দন জানাতে চাই। তারা যেভাবে গোটা বিশ্বকে স্বাগত জানিয়েছেন, সম্মান ও আদর দিয়েছেন, আপনাদের আতিথেয়তা তারা কোনওদিন ভুলবেন না। এই সম্মেলনের চিন্তন ও মননের রেশ আগামী কুম্ভমেলা পর্যন্ত সঞ্চারিত হবে এই আশা নিয়েই আপনাদের সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, সকল সাধু মহাপুরুষদের অসংখ্য প্রণাম জানাই। তাদের আশীর্বাদ, সামর্থ্য অবশ্যই এই ব্যবস্হাকে ভবিষ্যতে আরও উন্নত করবে।

PG/SB/NS/S