Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

কলকাতায় গৌড়ীয় মিশনের শতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

কলকাতায় গৌড়ীয় মিশনের শতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ


পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল শ্রদ্ধেয় কেশরীনাথ ত্রিপাঠী, ত্রিপুরার রাজ্যপাল শ্রদ্ধেয় তথাগত রায়, আমার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য শ্রীমান বাবুল সুপ্রিয়, পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী শ্রীমান ববি হাকিম, গৌড়ীয় মিশনের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় শ্রীমন্ত ভক্তিশৌর্য পরিব্রাজক গোস্বামী, মায়াপুর চৈতন্যমঠের আচার্য শ্রীমন্ত ভক্তি প্রজ্ঞানজ্যোতি মহারাজ, বৃন্দাবন ভজনকুটিরের আচার্য শ্রদ্ধেয় ভক্তি গোপনন্দ বন মহারাজ, দেবানন্দ গৌড়ীয় মঠের আচার্য শ্রদ্ধেয় ভক্তিবেদান্ত প্রজাটক মহারাজ, গৌড়ীয় মিশনের সচিব শ্রদ্ধেয় ভক্তি সুন্দর সন্ন্যাসী মহারাজ, গৌড়ীয় সংঘের আচার্য শ্রদ্ধেয় ভক্তি প্রসূন সাধু মহারাজ, নয়াদিল্লির পাহাড়গঞ্জ গৌড়ীয় মঠের ভক্তিবিষ্ণু বিচার বিষ্ণু মহারাজ, শ্যাম্বেদী গৌড়ীয় মঠ বিজয়ওয়াড়ার শ্রদ্ধেয় বিদ্‌ভক্ত ভাগবত মহারাজ আর বিপুল সংখ্যায় আগত গৌড়ীয় মঠের অনুগামী ভক্তজনেরা,

কিছুদিন আগে মহারাজজী আমার কাছে গিয়েছেন। এই শতবার্ষিকী সমারোহে আমাকে আসতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আমার সৌভাগ্য যে আমি তাঁর অনুরোধ রাখতে পেরেছি আর আপনাদের সকলের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে ভারত একটি বিচিত্র দেশ। এত ঘাত-প্রতিঘাতের পর দেশটি এখনও নিজের পথে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিভাবে? আমরা কবিতায় পড়ি, ইতিহাসে পড়ি, এই পৃথিবীর এমনই অনেক দেশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু, কালের গতিকে উপেক্ষা করে আমরা কেমন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছি? এর প্রধান কারণ হল, দেশের মানুষের মনের আত্মিক শক্তি। এই বিশাল ভারতের অন্তঃসলিলা আত্মিক শক্তি হল তাঁর আধ্যাত্মবোধ। বিশ্বের আর কোথাও এরকম আধ্যাত্মিক পরম্পরা নেই, যা এত বৈচিত্র্যে র মধ্যেও ঐক্যের সূত্র খুঁজে পেয়েছে। এই সমাজ এত বিশাল, ব্যাপক, গহন, গভীর যে এখানে মূর্তি পূজারীরাও এই সমাজের জয়গান করেন, মূর্তিপূজা বিরোধিরাও এর প্রশংসা করেন।

যিনি সাকারকে স্বীকার করেন আর যিনি নিরাকারে সমপিত উভয়েই এদেশে সমান মর্যাদা পান। পরমাত্মার পূজারী নিশ্চিন্তে বুকে টেনে নেন প্রকৃতির সাধককে। এ কেমন শক্তি? এই শক্তি কেবলই পূজাপাঠ নয়, কেবলই ধর্মগ্রন্থ নয়, কেবলই বাণী নয়, এই শক্তি আমাদের আধ্যাত্মিক চেতনায় নিহিত। আমরা সম্প্রদায়বদ্ধ মানুষ নই। সময়ের সঙ্গে সম্প্রদায় গড়ে ওঠে, বিলীন হয়ে যায়, পথ ও পরম্পরা বিকশিত হতে থাকে, অধ্যাত্ম আমাদের সৎকর্মের প্রেরণা দেয়। চৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন ভক্তির প্রেরণাস্রোত। হাতে মালা আর মুখে ঈশ্বরের নাম জপলেই মানুষের চোখে ভক্ত হওয়া যায়। কিন্তু নিজের কাছে ভক্ত হতে গেলে কোনও বিভাজনকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। বিভক্ত হলে চলবে না। আমার সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার কোন বিভক্তী চলবে না। উভয়কে এক হতে হবে, শ্রী চৈতন্য কৃষ্ণে ডুবে ছিলেন, কৃষ্ণ তাঁর মধ্যে লীন হয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল একটি বড় কালজয়ী ভক্তি আন্দোলন। ভারতের বৈশিষ্ট্য এটাই, অনেকবার আক্রান্ত হয়েও হানাদারদের অত্যাচার, শাসকের অত্যাচার সহ্য করেও দেশের মানুষ আধ্যাত্মিক ধারাকে সঞ্জীবিত রেখেছেন।

আমরা যদি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো, ভক্তি আন্দোলনের ভিত থেকেই প্রেরণাস্রোত নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভু, আচার্য শঙ্করদেব, মহর্ষি তিরুভাল্লুভর, মহর্ষি বশ্বেশ্বরের মতো অসংখ্য সন্ত মহাপুরুষের কাছ থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিয়ে আমাদের বিপ্লবীরা মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদার বোধ জাগিয়ে তোলেন।

যদি বৈষ্ণব আন্দোলনের কথা বলি, যখন আমরা বৈষ্ণব গায়কের কন্ঠে শুনি ‘বৈষ্ণব জন তো তেনে রে কহিয়ে’ মানুষটিকে কত আপন মনে হয়। আমরা ভাবি না যে, এই পদটি কোন্‌ ভাষায় লেখা হয়েছে! আমি বলতে চাইছি, ভক্তিমার্গ, ভক্তিগীতি ও কবিতা এভাবেই আমাদের দেশের মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান ও সংস্কৃতি সত্ত্বেও ভক্তিই আমাদের সকলকে ভারতীয় আধ্যাত্মবোধে ধনী করেছে। মহাপ্রভু চৈতন্যের সময়েই গুজরাটের মাটিতে নরসিংহ মেহতা অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর লেখা গান ‘বৈষ্ণব জন তো তেনে রে কহিয়ে’ মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় ছিল। আমি এই গানে একটু অনধিকার চর্চা করে নিজের মতো বানিয়েছি ‘জনপ্রতিনিধি তেনে রে কহিয়ে জো পীড় পরাই জানে রে, পর দুঃখে উপকার করে তোহে মন অভিমান না আনে রে, বাছ-কাছ মন নিশ্চল রাখে, পর ধন নওজালে হাত রে!’ চারশো বছর আগেও সমাজে দুর্নীতি ছিল বলেই ভক্তিকবি ‘…… পর ধন নওজালে হাত রে’ লিখেছিলেন। ঐ গানটি মহাত্মা গান্ধীর কেন প্রিয় ছিল তা আমি নিবিড়ভাবে অনুভব করেছি। কৃষ্ণের এক বিরাট রূপকে কিভাবে অনুভব করেছিলেন বৈষ্ণব ভক্ত ও পদকর্তারা। সেই শাস্ত্র আধ্যাত্মের পাশাপাশি, শস্ত্রের মতো নিরাপত্তা দেয়। ভক্তরা নানা রূপে কৃষ্ণকে ভালোবেসেছেন। কেউ ননীচোরা কানহাইয়ার বাৎসল্যরসে মজেছেন, কেউ সুদর্শনধারী কৃষ্ণের বীরত্বে প্রাণিত, কেউবা বংশীধারী, রাধার প্রেমিক, গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলায় মেতে থাকা কৃষ্ণের প্রেমে হাবুডুবু, আবার কেউ তারই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বলা বাণীর সংকলন গীতা থেকে প্রেরণা নেন, বাঁচার অর্থ খোঁজেন। নির্লিপ্ত জীবন কাকে বলে, প্রতিবেশে কী চলছে, তাঁর থেকে ব্যক্তিত্ব কিভাবে উচ্চতা স্পর্শ করে, যেখানে যুদ্ধ হয়, প্রিয়জনদের মরতে দেখে যে শাস্ত্র গড়ে ওঠে তা জয়-পরাজয়ের সংঘর্ষে লিপ্ত থেকেও নির্লিপ্ততার বার্তা প্রদান করে। গৌড়ীয় মিশনের বৈষ্ণব পরম্পরায়ই রয়েছে সেবাধর্ম। মহারাজজী একটু আগেই বলছিলেন, দরিদ্র নারায়ণের সেবার কথা। ‘সেবা পরমো ধর্মঃ’-ই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। অপরের জন্য বাঁচা। পরার্থে আত্মাহুতি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই মন্ত্রকেই জীবনের মূলমন্ত্র করে দেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। বিশ্বের নানা দেশে একটি বার্তা শোনা যায় ‘বাঁচো ও বাঁচতে দাও’। আমাদের দেশ এক কদম এগিয়ে বলে, ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও, আর যদি কারও বাঁচার ক্ষমতা না থাকে, তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও’’। গুজরাতিতে বলা হয় ‘জিবো অনে জিবাড়ো’! অন্যকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে না দিয়ে বাঁচার প্রেরণা জোগাও, তাঁর পাশে দাঁড়াও। বৈষ্ণবরা এই মহান ভাবনার প্রচারক। তাঁরা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’কে মূলমন্ত্র করে বাঁচেন। সকলকে দু’হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নেন। আমি এই মহান পরম্পরাকে প্রণাম জানাই। সমাজের দোষত্রুটিগুলিকে চিহ্নিত করে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়ত সংস্কারই ভারতীয় পরম্পরাকে অমর করেছে। হিন্দু সমাজে যখনই কুসংস্কার বৃদ্ধি পেয়েছে, তখনই কোনও না কোনও যুগপুরুষ আবির্ভূত হয়েছেন, সেই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এই বাংলার মাটিতেই রাজা রামমোহন রায় সতীপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, বিধবা বিবাহ প্রচলন করেছেন। এটাই আমাদের পরম্পরা, যখনই সমাজে বিকৃতি এসেছে, এই সমাজ থেকে মহাপুরুষেরা উঠে এসে সেসব বিকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। যে সমাজ কালবাহ্য বোঝা থেকে মুক্তিলাভের সামর্থ্য রাখে না, সেই সমাজ টেকে না, বাঁচে না, মৃতের মতো কালাতিপাত করতে করতে এক সময় অবলুপ্ত হয়ে সকল নিজস্বতা হারায়।

আমরা সৌভাগ্যবান যে আমাদের সমাজে যুগে যুগে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান গাওয়ার জন্য যুগপুরুষরা অবতীর্ণ হয়েছেন। সমাজকে কলুষমুক্ত করতে নতুন ভক্তি আন্দোলন শুরু করেছেন। এই মহান ব্যবস্থা, মহান পরম্পরার সকল সাধু-সন্ন্যাসী, সন্ত মহন্ত্রা এই পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনাদের সকলকে আমার প্রণাম। চৈতন্য মহাপ্রভূ’কে পূণ্য স্মরণ করি। এই পরম্পরার সকল যোগীদের প্রণাম জানাই। আপনাদের সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

PG/SB/SB