পিএমইন্ডিয়া
মঞ্চে উপস্থিত দেশের প্রথম মহিলা বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মহোদয়া, বিদেশ প্রতিমন্ত্রী জেনারেল ভি কে সিং মহোদয়, শ্রদ্ধেয় বিনয় সহস্রবুদ্ধে মহোদয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত সম্মানিত অতিথিবর্গকে আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে স্বাগত জানাই। আর গতকাল আপনারা যেখানে গিয়েছিলেন, সেই উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একজন সাংসদ হিসাবে আমি আপনাদের বিশেষ সম্মানপূর্বক স্বাগত জানাই।
আমাদের দেশে হিন্দু পরম্পরায় মনে করা হয়, যখন কেউ তীর্থযাত্রা থেকে ফেরেন, তখন তাঁকে প্রণাম জানালে তীর্থযাত্রী যতটা পুণ্যার্জন করেছেন, তার কিছুটা অংশ যিনি প্রণাম জানাচ্ছেন, তার ভাগেও জোটে। সেজন্য আপনারা যে অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী থেকেছেন, সেই তীর্থযাত্রার পুণ্য ফলের কিছুটা অংশ আপনাদের স্বাগত জানিয়ে আমিও পেয়েছি।
আপনারা আমার থেকেও বেশি ভাগ্যবান। কারণ, এবার এখনও পর্যন্ত আমি কুম্ভমেলায় যেতে পারিনি। কিন্তু আমি আগামীকাল যাব। যখন থেকে আমার জ্ঞান হয়েছে, তখন থেকে প্রত্যেক কুম্ভমেলায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আগামীকালও আমি যাব।
কুম্ভমেলায় না গেলে কেউ বুঝতেই পারবেন না যে, এটি কত বড় ঐতিহ্যের প্রদর্শন। হাজার হাজার বছর ধরে নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট সময়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এর জন্য কাউকে কোনও আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় না। সেখানে কেউ অতিথি হিসাবে যান না, আর কেউ আতিথেয়তার চেষ্টাও করেন না। তবুও মা গঙ্গার চরণে যেখানেই কুম্ভ হয়, গোটা দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা সেখানে আসেন।
আপনারা যে কুম্ভমেলা দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছেন, যা আপনাদের হৃদয় স্পর্শ করেছে, সেটি কিন্তু পূর্ণ কুম্ভ নয়। আপনারা অর্ধ কুম্ভ দেখে এসেছেন। কাজেই পূর্ণ কুম্ভ কেমন হয়, তা আপনারা অনুমান করতে পারেন!
ভারতে সাংস্কৃতিক ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সমাগম দেশের মানুষকে যতটা আধ্যাত্মিক প্রেরণা যোগায়, ততটাই সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে। আগেকার দিনে আমাদের দেশে যেরকম গণতান্ত্রিক কাঠামো ছিল, তখনকার আধ্যাত্মিক নেতা, সমাজ সংস্কারক ও জ্ঞানী তপস্যীরা তিন বছর ধরে প্রব্রজ্যার মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করতেন এবং সমাজ জীবনে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতেন, সেগুলির সমাধান তাঁরা কিভাবে করেছেন, সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে তাঁরা প্রত্যেক অর্ধ কুম্ভে ৪০ – ৪৫ দিন ধরে একসঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভারতের কোথায় কোন্ প্রান্তে কী চলছে, সে বিষয়ে সবাইকে অবগত করা হ’ত। আর সেই আলোচনা থেকে যা কিছু ভালো, সেগুলির ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন, সেই বার্তা নিয়ে সবাই ফিরে যেতেন। আর ১২ বছরে একবার এই পুরো সময়ের মধ্যে যে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলির প্রয়োগ কোথায় কতটা সফল হয়েছে, আর কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, তা নিয়ে পর্যালোচনা করতেন। সমাজে আর কী পরিবর্তনের প্রয়োজন, তা যথাযথ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হ’ত। সেখানে সামাজিক, ধার্মিক এবং রাজা-মহারাজাদের মতো রাজনৈতিক নেতারাও সামিল হতেন। তাঁরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সেসব সিদ্ধান্ত মেনে চলতেন।
এই মেলার আধ্যাত্মিক আবহের ঊর্ধ্বে এহেন সামাজিক কার্যকারিতা সম্পর্কে বিশ্ববাসী অবহিত নন। আপনারা এবারেও হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, কুম্ভমেলায় কোনও না কোনও সামাজিক বার্তা ছিল। সাধারণ মানুষের উপকারে লাগে – এরকম বার্তা ছিল। সেখানে কোনও বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রত্যেক তীর্থযাত্রী গঙ্গা স্নান করেছেন। নিজের নিজের আস্থা অনুসারে পুজো ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।
সমগ্র বিশ্ব যখন শান্তির খোঁজে রয়েছে, ভারত স্বাভাবিকভাবেই তখন পর্যটনের গন্তব্য হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত জীবনের দৌড়-ঝাঁপ থেকে কিছুটা সময় বের করে মানুষ নিজের জন্য, নিজের অন্তর্যামীর সঙ্গে কাটাতে চায়। ধন, বৈভব, সমৃদ্ধি, আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হোটেল – এসব কিছু মানুষকে প্রভাবিত করে ঠিকই, কিন্তু প্রেরণা যোগায় না। তথাকথিত উন্নয়ন থেকে বিতশ্রদ্ধ হয়ে তাঁরা প্রেরণার খোঁজে থাকেন।
যাবতীয় বৈষয়িক সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কত মানুষ অন্তর্নীহিত আনন্দ খুঁজতে কুম্ভে আসেন, জীবনের নতুন পথ খোঁজেন, তা হয়তো আপনারা অনুভব করেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আপনারা যখন দেশে ফিরে যাবেন, তখন অনেকেই আপনাদের জিজ্ঞেস করবেন যে, কী দেখেছেন? একটা নদীতে ডুব দেওয়ার জন্য এত টাকা খরচ করে কেন গিয়েছিলেন? এবার কুম্ভমেলায় গিয়ে সেখানকার অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা দেখে আপনারা হয়তো ভারতের সংগঠনমূলক সামর্থ্য কতটা, তা অনুভব করেছেন।
আমাকে বলা হয়েছে যে, সেখানকার তথ্য কেন্দ্রে প্রতিদিন হাজার হাজার হারিয়ে যাওয়া মানুষ, বিশেষ করে, হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খবর আসে। এত লোকের ভিড়ে দু – একটি শিশু কিংবা বয়স্ক মানুষ হাতছাড়া হয়েই যেতে পারেন। কিন্তু মেলা-প্রাঙ্গণের অন্বেষণ ব্যবস্থা এত সুন্দর যে, এত হাজার হাজার হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ঠিক তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
প্রয়াগরাজের গঙ্গাতটে এই ৪০ দিনে ২২ কোটিরও বেশি মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন। প্রতিদিন গঙ্গাতটে ইউরোপের অনেক দেশের জনসংখ্যারও বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও এবারের কুম্ভমেলা পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে উদাহরণ স্থাপন করেছে। অর্থাৎ, আমাদের দেশে সেই সামর্থ্য রয়েছে। এই ব্যবস্থা হয়তো বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনার ছাত্রদের জন্য একটি কেস স্টাডির বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এজন্য আমি ভারতের বিদেশ মন্ত্রক, বিশেষ করে, সুষমা স্বরাজ মহোদয়াকে অন্তর থেকে অভিনন্দন জানাই। তিনি ও তাঁর মন্ত্রক কুম্ভমেলাকে নিছকই একটি দায়িত্ব পালনের বিষয় হিসাবে নেননি। এর সামাজিক দৃষ্টিকোণের সঙ্গে শ্রদ্ধা, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেল-বন্ধনকেও সফলভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। ভারতে এই প্রথম এই ধরণের মেল-বন্ধনের প্রচেষ্টা হয়েছে। আপনারা এসে এই প্রচেষ্টাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেজন্য আপনাদেরও আমি অনেক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই।
ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিশ্বকে আকর্ষিত করার যে অভূতপূর্ব সামর্থ্য রয়েছে, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে আমরা দৃঢ় সংকল্প। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আপনাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসী এই আধুনিক ভারতকে চিনবে। আগামীদিনে আমাদের দেশে সাধারণ নির্বাচন হবে। কুম্ভমেলার মতোই সাধারণ নির্বাচনের সময়ে সারা দেশে প্রযুক্তির মাধ্যমে যে অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে, তাও একটি দেখার মতো বিষয়। ৮০ কোটি মানুষ নিজেদের স্বাধীন মতপ্রকাশ করবেন। এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ নির্বাচন ব্যবস্থা। আমি নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছি যে, যাতে এবারের নির্বাচনে বিদেশ থেকে অনেক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাঁরা নির্বাচন পর্যটনে আসবেন। কেউ মার্চের দ্বিতীয়-তৃতীয় সপ্তাহে আসবেন, কেউ শেষ সপ্তাহে কিংবা এপ্রিল কিংবা মে মাসে আসবেন। বিশ্বের প্রতিটি দেশ থেকে অন্তত দু’জন প্রতিনিধি প্রত্যেক সপ্তাহে এসে দেখে যাবেন, আর ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি ও সামর্থ্যকে অনুভব করবেন।
আপনারা যখন অক্ষয়বট দেখেছেন, তখন ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের আধ্যাত্মিক অনুভূতি সম্পর্কে পরিচিত না হলেও এতটা নিশ্চয়ই বুঝেছেন যে, এই দেশ কতটা প্রকৃতি-প্রেমিক। হাজার হাজার বছর ধরে একটি বৃক্ষকে বিশ্বাসের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমে এদেশের সমাজ বৃক্ষগুল্মের মধ্যে পরমাত্মাকে দেখে। এই সমাজকে যদি বিশ্ববাসী আগে বুঝতে পারতো, এই দর্শন মেনে যদি বিশ্ব চলতো, তা হলে কখনও আবহাওয়া পরিবর্তন কিংবা বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হ’ত না। এই বৃক্ষ একটি প্রতীক মাত্র। বৃক্ষগুল্মের মধ্যে পরমাত্মা দর্শন আমাদের দেশের মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সহবাসে অভ্যস্ত করেছে। এই সহবাস এবং প্রকৃতির প্রতি অপার শ্রদ্ধাই মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে। প্রকৃতি বিরোধী নানা কাজের ফলেই মানবজাতি আজ সঙ্কটের সম্মুখীন। আর সেই সঙ্কট থেকে মুক্তির উপায় দেখাতে পারে আমাদের মহান পরম্পরা। এই অক্ষয়বটের দর্শন, নদীর প্রতি শ্রদ্ধা, অত্যাধুনিক বিশ্ব মানের ব্যবস্থাপনা সারা পৃথিবীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য যেমন কেস স্টাডির বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তেমনই ভারতের মহান পরম্পরা মানবজাতির কল্যাণে পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে। এই অনুভবের কথা আপনাদের কাছে বলতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত।
আমি আরেকবার আপনাদের সকলকে অন্তর থেকে স্বাগত জানাই। যতটা সময় আপনারা এদেশে থাকার সুযোগ পাবেন, ভারতকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করুন, আর ফিরে গিয়ে বিশ্ববাসীকে নতুন ভারত দর্শনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন। তাঁরা যতটা জানেন, ভারত তারচেয়ে কিছুটা বেশি। এই ভারত আগামীদিনে মানবজাতিকে নতুন পথ দেখানোর সামর্থ্য রাখে। আপনারা এই মহান পরম্পরার রাজদূত হয়ে নিজের দেশে ফিরে যাবেন – এটাই আমার শুভেচ্ছা।
অনেক অনেক ধন্যবাদ।
CG/SB/SB
PM @narendramodi addresses delegates at the Kumbh Global Participation Event organized by ICCR. https://t.co/KHyKQI5g39
— PMO India (@PMOIndia) February 23, 2019
via NaMo App pic.twitter.com/zRoqtF0Aio