Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

কৃষি উন্নতি মেলা ২০১৬’য় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

কৃষি উন্নতি মেলা ২০১৬’য় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ


আমার প্রিয় কৃষক ভাই ও বোনেরা,

এই ‘কিষাণ মেলা’ ভারতের ভাগ্যমেলা, ভারতের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হলে গ্রাম থেকে শুরু করতে হবে, কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তন করতে হবে। আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বছরের পর বছর ধরে একই রকম চাষবাস করে যাচ্ছি। খুব কম কৃষকই নতুন কোনও প্রয়োগ করেন কিংবা নতুন কিছু করার সাহস রাখেন। আমাদের সামনে এখন এটাই সবচাইতে বড় সমস্যা, আমরা কৃষকদের কিভাবে আধুনিক করে তুলবো! আমাদের নবীন প্রজন্মের কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে যেসব উদ্ভাবন করেছেন, সেসব নব্য প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে আমাদের পরম্পরাগত কৃষিকে কিভাবে যুক্ত করবো! কৃষকদের কাছে নতুন নতুন প্রয়োগ কেমন করে পৌঁছে দেবো? এই কিষাণ মেলা’র মাধ্যমে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আমি খুশি যে আজ দেশের কৃষি বিভাগ এই কর্মসূচিকে এমনভাবে সাজিয়েছে যে, এখানে যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা ছাড়াও গোটা ভারতের সকল গ্রামের কৃষকরা এই অনুষ্ঠান দেখছেন।

শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনার জন্য আপনারা এই অনুষ্ঠান দেখছেন – তা নয়! তিনদিন ধরে এখানে যত আলাপ-আলোচনা ও নতুন নতুন প্রয়োগ সম্পর্কে বলা হবে তা গ্রামে বসে কৃষকরা শুনবেন, দেখবেন এবং বুঝতে পারবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কৃষকের কাছে এসব বিষয় পৌঁছবে না, তাঁদের মনে এগুলি সম্পর্কে বিশ্বাস জন্মাবে না। কৃষকদের স্বভাব হলো, প্রতিবেশী কৃষক যদি লাল কৌটোর ওষুধ মাটিতে মিশিয়ে ভালো ফসল পান, তা হলে তিনিও চোখ বন্ধ করে সেই লাল কৌটোর ঔষধ কিনে এনে মাটিতে মেশাবেন। প্রতিবেশী হলুদ ঔষধ মেশালে তিনিও তাই মেশাবেন। বিক্রেতাদের পোয়াবারো! তারপর, কৃষকদের কী হলো কে খবর রাখে!

সেজন্যই সরকার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের চেষ্টা করছে। আমাদের দেশে যেসব অঞ্চলে অফুরন্ত জলের যোগান রয়েছে, সেসব অঞ্চলেই প্রথম ‘সবুজ বিপ্লব’ হয়েছে।

এখন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব শুধুই জলের ভরসায় থাকলে সম্ভব হবে না। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক আবিষ্কার প্রয়োগের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। প্রথম সবুজ বিপ্লব হয়েছিল পাঞ্জাব ও হরিয়ানার নেতৃত্বে দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রাজ্যগুলিতে। পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সিংহভাগ অঞ্চলেও যেহেতু অনেক নদী, প্রচুর জল, একটু চেষ্টা করলেই সেসব রাজ্যেও সবুজ বিপ্লব আসতে পারতো। কিন্তু, পূর্ব ভারতের কৃষকরা এখনও পারম্পরিক প্রথায় চাষবাস করে যাচ্ছেন, সেজন্য আমরা এবার দেশের পূর্ব প্রান্তে দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লব শুরু করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

ভারতের অর্থনীতির ভিত্তি হল গ্রাম। গ্রামের গরিব মানুষটি এবছর যদি পাঁচ হাজার টাকার মাল কেনেন আর আগামী বছর যদি ১০ হাজার টাকার কেনাকাটা করেন, তা অর্থনীতিকে শক্তি যোগায়। দেশ এগিয়ে যায়। সেজন্যই গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। গ্রামের আর্থিক গতিবিধি বৃদ্ধি না পেলে, ব্যবসায় জোয়ার না এলে এটা সম্ভব হবে না।

আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের এ বছরের বাজেট নিয়ে সবাই প্রশংসা করছেন। কেউ কেউ চুপ, কারণ প্রশংসা করতে তাঁদের অসুবিধা রয়েছে, কিন্তু বিরুদ্ধে বলারও কিছু নেই। আর বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন, দীর্ঘদিন পর গ্রাম, গরিব ও কৃষকদের কল্যাণে বাজেট পেশ করা হয়েছে। এই সূত্রপাত দেশকে সম্পন্ন করে তুলতে, ২৫-৩০ বছর ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেই করা হয়েছে।

আমার একটি স্বপ্ন রয়েছে, কিন্তু এই স্বপ্ন আমার একার হলে চলবে না, শুধুই কেন্দ্রীয় সরকারের স্বপ্ন হলে চলবে না, কেন্দ্রীয় সরকার – প্রতিটি রাজ্য সরকার ও প্রত্যেক কৃষক ভাই-বোনের সম্মিলিত দায়িত্বপূর্ণ স্বপ্ন হওয়া উচিৎ। সেই স্বপ্নটি হল, আগামী ২০২২ সালে ভারত যখন স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন করবে, তার আগে কৃষকদের প্রত্যেকের আয় দ্বিগুণ করতে হবে। আমার এই স্বপ্ন কি সাকার হবে? সকল কৃষক, প্রতিটি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার মিলেমিশে চেষ্টা করলে এই স্বপ্ন সাকার হওয়া অসম্ভব নয়। সেজন্য সকলে মিলে চেষ্টা করতে হবে।

এতদিন আমরা দেশের উন্নয়নে কৃষি উৎপাদনের অগ্রগতিকেই কেন্দ্রে রেখে কাজ করেছি। কিন্তু, শুধু উৎপাদন কেন্দ্রিক উন্নয়নে কৃষকের তেমন লাভ হবে না। কৃষকের উন্নয়ন করতে হলে এর সঙ্গে আমাদের আরও ৫০টি বিষয়কে জুড়তে হবে। তবেই ২০২২ সালের মধ্যে তাঁদের আয় দ্বিগুণ করার স্বপ্ন সফল করতে পারবো। ধরিত্রীমাতাকে আমরা যতই অত্যাচার করি না কেন, তিনি সব মুখ বুজে সহ্য করে নেন, ব্যথা দিলেও কাঁদেন না। কিন্তু আমরা তাঁকে না বুঝলে তিনিও আমাদের আবেদনে সেরকম সাড়া দেবেন না। আমরা অধিক ফলনের স্বার্থে না জানি কতো রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মাটিকে স্নান করিয়ে দিয়েছি, না জানি কত ওষুধ খাইয়েছি! আমরা কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসক ওষুধ দেন, কিন্তু একবারে বেশি ওষুধ খেলেই অসুখ সারবে না, এতে ক্ষতিও হতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আমরা না বুঝে অন্যের দেখাদেখি মাটিতে অত্যাধিক রাসায়নিক মিশিয়ে তেমনই মাটির ক্ষতি করেছি। মাটিও আর আগের মতো ফসল দিতে পারছে না। সেজন্য মানুষের যেমন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিৎ, অসুখ হলে রক্ত ও মল-মূত্র পরীক্ষা করা উচিৎ, মাটিরও তেমনই নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা উচিৎ – এবছর কোন্‌ ফসলের বীজ বুনলে ভালো ফলন হবে!

সেজন্যই আমরা আপনাদের সহযোগিতায় দেশের সকল জমির জন্য ‘মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড’ চালু করার অভিযান শুরু করেছি। নিয়মিত মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে কোন্‌ স্তরে কোন্‌ উপাদান বেশি কিংবা কম রয়েছে, মাটির শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে জেনে চাষের কাজ করলে অধিক ফলন হবেই। এটা কোনও ব্যয়সাধ্য পরীক্ষা নয়, সরকার আপনাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মাটি পরীক্ষার পর তার সমস্ত খুঁটিনাটির বিবরণ সেই কার্ড-এ লিখে দেওয়া হবে। কার্ডটিকে নিছকই একটি কাগজের টুকরো ভেবে ঘরের এক কোণাতে ফেলে রাখবেন না। আমাদের শরীর খারাপ হলে ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন, তা নিয়ে আমরা কী করি? আমরা ওষু্ধের দোকানে বা নিকটবর্তী দাতব্য চিকিৎসালয়ে ঐ প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করে রোগীকে খাওয়াই। তেমনইমৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড সরকারি কৃষি বিজ্ঞানীদের দেখিয়ে, তাঁদের পরামর্শ মতো বীজ বুনতে হবে, পরিমাণ মতো সার মেশাতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তা হলেই দেখবেন, আপনাদের জীবনের অর্ধেক সমস্যা দূর হয়ে গেছে। আপনারা ধরিত্রীমাতার যত্ন নিলে তিনিও চারগুণ ফসল দেবেন, আপনাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না।

আমাদের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হল সেচের জল। সময় মতো জল পেলে আমাদের কৃষকরা সোনা ফলাতে পারে। সেজন্য আমরা ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিচাঁই যোজনা’য় জোর দিয়েছি। ন্যূনতম জল নষ্ট করে আপনাদের শস্য ক্ষেত্রে কত বেশি জল পৌঁছে দেওয়া যায়, আমরা সেই পরিকল্পনা করছি। আপনারা শুনলে অবাক হবেন, আমরা যা-ই করতে চাই, বিরোধীরা বলেন, এটা তো আমাদের সময়ের পরিকল্পনা। অথচ, বাস্তব চিত্র হল, আমরা সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর খোঁজ নিয়ে দেখি, প্রায় ৯০টি এমন সেচ প্রকল্প রয়েছে, যেখানে জলের প্রাচুর্য্য রয়েছে কিন্তু সেই জল কৃষকের ক্ষেত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার কোনও সুষম সেচ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। লক্ষ-কোটি টাকা খরচ করে পূর্ববর্তী সরকার যে বাঁধগুলি নির্মাণ করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই বাঁধের জল যথাসময়ে কৃষকের ক্ষেতে না পৌঁছলে কী লাভ? আমরা সেই ৯০টি প্রকল্প পুনর্নবীকৃত করার কাজ হাতে নিয়েছি। শুধু এগুলির কাজ সম্পূর্ণ হলেই প্রায় ৮০ লক্ষ হেক্টর জমিতে সুষমভাবে সেচের জল পৌঁছবে। ভাই ও বোনেরা, ঠিক সময়ে জল পৌঁছলে সেই জমি থেকে কী পরিমাণ ফসল আপনারা উৎপন্ন করতে পারবেন, তা আন্দাজ করতে পারছেন!

এই কাজ সম্পূর্ণ করতে আমাদের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে। শুধু তাই নয়, মনরেগা’র এতো প্রশংসা শুনি, কিন্তু, কোথাও সম্পত্তি সৃষ্টি হতে দেখি না। আমাদের সরকার এদিকে নজর দিয়েছে। আমি চাইবো, গ্রীষ্মে প্রতিটি গ্রামের কাজ হোক, পুকুরগুলি খনন করে গভীরতা বাড়ানো। তা ছাড়া, সব গ্রামে ৫ লক্ষ নতুন পুকুর খননেরও স্বপ্ন রয়েছে।

আমাদের ছোট ছোট পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে তিনটি কিংবা চারটি পাহাড়ের মিলনস্থলে যে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলি থাকে, সেগুলিরও গভীরতা বাড়াতে হবে, আর যদি জলাশয় না থাকে তা হলে খনন করতে হবে। আমি বন বিভাগকে বলেছি, অরণ্যকে রক্ষা করতে হলে এই পুকুরগুলির গভীরতা বাড়াতে হবে, নতুন নতুন পুকুর খনন করতে হবে। অরণ্য বৃদ্ধি পেলে বর্ষাও বাড়বে। বর্ষা বৃদ্ধি পেলে আমাদের ভূ-গর্ভস্থ জলস্তর উপরে উঠে আসবে। সেচের জল ছাড়াও পানীয় জলের সমস্যার সুরাহা হবে। গ্রীষ্মে গ্রামের জলাশয়গুলির গভীরতা বাড়াতে পারলে প্রথম বর্ষাতেই সেগুলি জলে টইটম্বুর হয়ে উঠবে, যা আমাদের ১২ মাস কাজে লাগবে। সেজন্য যত জল সঞ্চয় হবে, তত ভালো সেচ হবে, তত ভালো ফলন হবে।

জল ঈশ্বরের আশীর্বাদ। একে নষ্ট করার কোনও অধিকার আমাদের নেই। সেজন্য আমাদের শ্লোগান হল – ‘per drop more crop’ । প্রত্যেক বিন্দু জল বাঁচিয়ে ফলন বাড়াতে হবে। আমরা ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প, ‘drip irrigation’– এর মাধ্যমে ছোট ছোট পাম্প বসিয়ে সেচের কাজ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। সেই জলেই তরল সার মিশিয়ে দিলে সার ছড়ানোর পরিশ্রম কমবে, খরচ কমবে, উৎপাদন বাড়বে। অনেকের ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে যে, আখ চাষে বেশি জল লাগে। কিন্তু, নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী, ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের মাধ্যমেই আখ থেকে শুরু করে ধান চাষ পর্যন্ত সবই সম্ভব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বদলে গেছে। এখন আর ফসল ফলাতে ক্ষেতকে জলে ডুবিয়ে রাখতে হয় না। আপনারা সেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্য নিন।

আগামী ১৪ এপ্রিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মজয়ন্তীতে ভারত সরকার আপনাদের ফসল বাজারজাত করার প্রক্রিয়াকে সরল ও আধুনিক করে তুলতে তথ্য প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে একটি ই-প্ল্যাটফর্ম চালু করবে। এর মাধ্যমে কোন্‌ বাজারে কোন্‌ ফসল বিক্রি করলে ভালো দাম পাবেন, তা নিজের মোবাইল ফোনেই জানতে পারবেন। কৃষকরা নিজেরাই খবরের আদান-প্রদান করে যথাসময়ে নির্দিষ্ট বাজারে পৌঁছে কম সময়ে বিক্রি করে হাসিমুখে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। তা ছাড়া, এর মাধ্যমে কৃষকরা নিয়মিত আবহাওয়ার খবরও পাবেন। এটাও জানতে পারবেন যে কোথায় গেলে কোন্‌ কৃষি বিজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ নিতে পারবেন।

এই ই-প্ল্যাটফর্মের সঠিক ব্যবহার কৃষককে সকল প্রকার অসহায়তা্র হাত থেকে রেহাই দেবে। বর্তমান সরকার আপনাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। এই সরকার আপনাদের কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে চলতে চায়। এটাই সময়ের দাবি, আমাদের ফসলের মূল্য বৃদ্ধি করতে হবে, মূল্য সংযোজন করতে হবে, প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে। যত বেশি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ হবে, ততবেশি কৃষকের আয় বাড়বে। আপনি দুধ বিক্রি করে যত টাকা পান, ক্ষীর বানিয়ে বিক্রি করলে তুলনায় অনেক বেশি টাকা পান। ঘি বানিয়ে বিক্রি করলে আরও বেশি লাভ হয়। কাঁচা আম বিক্রি করলে যত লাভ হয়, সেগুলি কেটে আচার বানিয়ে বিক্রি করলে আরও অনেক বেশি লাভ হয়। কাঁচালঙ্কা বিক্রি করলে যত টাকা পাবেন, সেই লঙ্কা লাল হলে শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার বানিয়ে প্যাকেটে করে বিক্রি করলে আরও বেশি লাভ পাবেন। এই প্রক্রিয়াকরণের জন্য ভারতে বড় কোনও প্রযুক্তি আমদানি করতে হবে না। আমাদের গ্রামের মানুষ এগুলি প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতি জানেন, শুধু অগ্রাধিকার দিতে হবে – এই যাঃ। এগুলিই আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে।

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর রাজপুত্র ভারত সফরে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলির হাতে পেট্রোলিয়াম বিক্রির অনেক টাকা হাতে রয়েছে, কিন্তু, উদরপূর্তির জন্য শস্য উৎপাদনের কোনও সম্ভাবনা নেই। আমরা মরুভূমিতে থাকি অথচ আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীদিনে আমাদের ভারত থেকে বেশি করে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে’। অর্থাৎ, ভারতে উৎপন্ন শস্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়ছে। একটি বৃহৎ বিশ্ববাজার আমাদের প্রতীক্ষায় রয়েছে। আমরা যদি নিজেদের ফসলের মান উন্নত করতে পারি, তা হলে বিশ্ববাসী অধিক মূল্যে আমাদের খাদ্যশস্য, ফলমূল ও শাকসব্জি কিনতে প্রস্তুত।

কিন্তু, আজকাল সকলেই স্বাস্থ্য সচেতন। সেজন্য সকলেই জৈবসারে ফলানো শস্য, শাকসব্জি ও ফলমূল খেতে চান। সেজন্য তাঁরা দ্বিগুণ দাম দিতেও রাজি। রাসায়নিক সারে ফলানো খাদ্য খাওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে যত খরচ করতে হয়, তারচেয়ে অনেক কম খরচে বেশি দাম দিয়ে জৈব সারে ফলানো খাদ্য কিনতে তাঁরা প্রস্তুত। সেজন্য আমাদের গোটা দেশে জৈব চাষ বাড়াতে হবে। আমরা চেষ্টা করলেই পারবো।

সিকিমের কৃষকরা তাঁদের পাহাড়ের ঢালগুলিতে ২০০৩ সাল থেকে পরিশ্রম করে ১০ বছরের মধ্যেই গোটা রাজ্যটিকে জৈব চাষের রাজ্যে রূপান্তরিত করেছে। এই সাফল্যের জন্য আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাই। আজ আর তাঁদের রাসায়নিক সারের কথা ভাবতে হয় না। দীর্ঘ এক দশক ধরে জৈব সার প্রয়োগের ফলে জমিও আগের তুলনায় অনেক বেশি ফলনশীল হয়েছে। দ্বিগুণ-তিনগুণ উৎপাদন হচ্ছে। তাঁদের উৎপাদিত ফসলের চাহিদা গোটা বিশ্বেই ক্রমবর্ধমান। সকল রাজ্যের কৃষকরা এভাবে জৈব চাষ শুরু করলে লাভবান হবেন।

এখন কৃষকদের আয়কে তিন ভাগে ভাগ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এখনকার মতো একটি মাত্র খুঁটিনির্ভর থাকলে ঝড়ঝঞ্ঝায় এই খুঁটি নড়বড়ে হয়ে পড়া কিংবা পতনের সম্ভাবনা থাকে। সেজুন্য কৃষকদের এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে তাঁদের আয়ের তিনভাগের একভাগ এসবে সাধারণ ফসলের চাষ থেকে। ধান, গম, ভুট্টা, ফলমূল, সব্জি এসব থেকে।

আপনার জমির সম্পূর্ণ এলাকায় সাধারণ চাষের পর জমির সীমানায় প্রতিবেশীর সঙ্গে পরামর্শ করে ভবিষ্যতে মূল্যবান কাঠ হবে নির্দিষ্ট দূরত্বে এমন বৃক্ষ রোপণ করুন। আপনি ও প্রতিবেশী উভয়েই গাছ লাগান। ১৫-২০ বছর পর সেই গাছ কেটে উভয়েই বাড়ির দরজা-জানলা কিংবা আসবাবপত্র তৈরি করতে পারবেন, অথবা বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দিতে পারবেন, ছেলেমেয়ের উচ্চ শিক্ষার কাজেও লাগতে পারে। একটি গাছ দিয়ে একটি সন্তানকে আত্মনির্ভর করে তুলতে পারবেন। জমির সীমানা নিয়ে বিবাদের সম্ভাবনাও থাকবে না। বেড়া লাগানো বাবদ যে দু-তিন মিটার জমি নষ্ট হয়, তা আর নষ্ট হবে না।

তৃতীয় আয়ের উপায়টি হল পশুপালন, মৌ চাষ, মৎস্যচাষ ও হাঁস-মুরগী পালন। এতে বাড়ির ছেলেমেয়েরা ঘরে দুধ-ডিম, মাছ-মাংস খাবে, মধু খাবে। অতিরিক্ত দুধ-ডিম, মাছ-মাংস ও মধু বাজারে বিক্রি করেও ভালো রোজগার হবে। কোনও বছর খরা, বন্যা কিংবা শিলাবৃষ্টির ফলে ভালো ফলন না হলে এই তৃতীয় আয়ের উপায়টি আপনাদের সংসার প্রতিপালনে সাহায্য করবে। এরজন্য আলাদা পরিশ্রম করতে হবে না।

ভারত এখন বিশ্বে সর্বাধিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু, পশু প্রতি যতটা দুধ পাওয়া উচিৎ, ততটা আমরা পাই না। সেজন্য পশুদের সুষম আহারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের উদ্যোগে উন্নত পশু প্রজনন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

গোটা বিশ্বেই আজ মধুর বেশ চাহিদা রয়েছে। অথচ, ভারতে আমরা মৌচাষের সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না। আমি সকল কৃষককেই এই অনায়াসসাধ্য লাভজনক চাষের পরামর্শ দেবো। মধু কখনও নষ্ট হয় না, বছরের পর বছর রেখে দেওয়া যায়, বাড়ির সকলের অসুখ-বিসুখে কাজে লাগে, বিক্রি করলেও ভালো দাম পাওয়া যায় এমনকি ওষুধ নির্মাতারাও কিনে নিয়ে যান। ফসলের ক্ষেতের এক কোণে দু-চারটে বাক্স লাগিয়ে নিয়মিত নজরদারিতেই কাজ চলে যায়।

এই তিনটি আয়ের স্তম্ভ কৃষককে যে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে। পাশাপাশি, আমরা কৃষক ভাই-বোনদের সুবিধার্থে চালু করেছি ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’। আগে অটল বিহারী বাজপেয়ী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি দেশে ফসল বিমা যোজনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সরকার এসে সেই বিমা যোজনায় সামান্য পরিবর্তন করে দেওয়ায় কৃষকরা আস্থা হারান। টাকা ঠিক সময়ে জমা পড়লেও বিপদের সময়ে বিমার টাকা হাতে না পেলে তাঁরা শুধু শুধু এমন প্রকল্পে টাকা রাখবেন কেন? আমরা কৃষকদের সব অভিযোগ শুনে অর্থনীতিবিদ ও বিমা সংস্থাগুলির সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কৃষক-বান্ধব প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা চালু করেছি। এতে প্রিমিয়াম কম কিন্তু নিরাপত্তা অনেক বেশি। এই প্রথম এই ধরনের বিমা চালু হয়েছে।

আমাদের দেশে ২০ শতাংশের বেশি কৃষক এখনও কৃষি বিমা করাননি। যাঁরা করিয়েছেন, তাঁদের অধিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে আমরা অন্যদেরকেও এর প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইছি। এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কোথায় কত পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার হিসেব-নিকেশ দ্রুত করে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তারপরই যথাযথ বিমার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেজন্য এখন আর দু-তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে না।

এতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হল, ফসল কাটার আগে শিলাবৃষ্টি, ঝড়ঝঞ্ঝা হলে তার হিসেব হলেও ফসল কেটে গুদামজাত করার আগে এ ধরনের বিপর্যয়ে ফসল নষ্ট হলে কোনও রকম বিমার টাকা পাওয়া যেত না। বর্তমান ব্যবস্থায় আমরা ফসল কাটার পরও ১৪ দিন পর্যন্ত ক্ষেতে স্তূপ করে রাখা ফসল কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নষ্ট হলে বিমার টাকা কৃষকের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, মনে করুন, জুন মাসে বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, আপনারা পরিশ্রম করে ক্ষেত তৈরি করে রেখেছেন, কিন্তু জুন মাসে বৃষ্টি হল না, জুলাই এমনকি আগস্টেও বৃষ্টি হল না। এখন আপনাদের কী হবে? বৃষ্টিই যদি না হয়, বীজ বপনই যদি না করে থাকেন, তা হলে ফসল নষ্ট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সেক্ষেত্রে আগে বিমা কোম্পানি থেকে টাকা পাওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। বর্তমান ব্যবস্থায় আপনার এলাকায় বৃষ্টি না হওয়ায় বীজ বপন করতে না পারলেও আপনারা ২৫ শতাংশ বিমার টাকা পাবেন, ফলে আপনার বছরটি বিফলে যাবে না।

ভাই ও বোনেরা, কৃষকদের স্বার্থে কী কী করা যায়, তার খুঁটিনাটি আমরা মাথায় রেখেছি। আগে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ৫০ শতাংশ লোকসান হলে তবেই বিমার টাকা পাওয়া যেতো, সেও গোটা এলাকায় ৫০ শতাংশ লোকসান হয়েছে কি না, তা হিসাব করে দেখা হতো। আমরা বলেছি, না, ৩৩ শতাংশ লোকসান হলেও ভর্তুকি দিতে হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমদের আগে পর্যন্ত সকল সরকার এই বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা আলাপ-আলোচনা করেছে। কিন্তু, কেউই কৃষকদের দাবি পূরণ করতে পারেনি। আমরা এটা করতে পেরেছি।

ভাই ও বোনেরা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কৃষকরা কিভাবে সাহায্য পাবেন, তার সকল নিয়ম বদলে দিয়েছি। কৃষকদের ভরসা দিয়েছি। দুর্নীতি ঠেকাতে তাঁদেরকে জন ধন যোজনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে বলেছি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভর্তুকির টাকাও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। এজন্য কোনও দালালের হাত-পা ধরতে হবে না, কাউকে ঘুষ দিতেও হবে না।

ইউরিয়া নিয়ে দেশে কী হতো, তা আমরা সবাই জানি। কৃষকদের সারা রাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। পরদিন ইউরিয়া এলে কালোবাজারি হতো, প্রতিবাদ করলে কৃষকদের পুলিশের লাঠির ঘা সহ্য করতে হতো। আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম তিন থেকে পাঁচ মাস নিয়মিত মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি পেতাম, ‘এবার আমাদের রাজ্যে কম ইউরিয়া এসেছে, শীঘ্রই আরও ইউরিয়া পাঠান’। খবরের কাগজে বিরোধীদের কড়া সমালোচনা ছাপা হতো, ‘মোদী সরকার জন বিরোধী, অমুক রাজ্যে যথেষ্ট ইউরিয়া পাঠানো হয়নি’। আমরা এক বছর ধরে ইউরিয়া নিয়ে এমন কাজ করেছি যে, এ বছর কোনও মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি আসেনি। গোটা দেশে এবছর একজন কৃষককেও পুলিশের লাঠি খেতে হয়নি। আমরা ইউরিয়াতে নিম কোটিং করেছি, ইউরিয়ার দানায় নিমতেল মাখিয়ে কৃষকদের হাতে তুলে দিয়েছি। এতে জমির শক্তি বাড়ছে। আগে যে জমিতে ১০ কেজি ইউরিয়া লাগতো সেই জমিতে এখন নিমকোটিং দেওয়া ইউরিয়া ৬-৭ কেজি মেশালেই আগের থেকে বেশি ফলন হচ্ছে। কৃষকের এই তিন-চার কেজির মূল্য সাশ্রয় হচ্ছে। নিম ফলের চাহিদা বাড়ছে। আর ভারত সরকার ১০০ শতাংশ নিম কোটেড ইউরিয়া বন্টন সুনিশ্চিত করায় চোরাবাজারে ইউরিয়া বিক্রি বন্ধ হয়েছে। রাসায়নিক কারখানাগুলি চোরাপথে কৃষকদের নামে ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি হওয়া ইউরিয়া কম দামে কিনে অন্য জিনিস বানিয়ে বাজারে ছাড়তো, সেই দুর্নীতিও কমেছে। কারণ, নিম কোটিং দেওয়া এক গ্রাম ইউরিয়াও কোনও রাসায়নিক কারখানার কাজে লাগে না। এভাবে আমরা কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি রুখে দিতে পেরেছি, কৃষকদের পরিবেশ-বান্ধব নিম কোটেড ইউরিয়া সরবরাহ সুনিশ্চিত করেছি।

কৃষক ভাই ও বোনেরা, এভাবেই আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কৃষির অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োগের সাহস দেখাতে হবে। আজ সরকার যে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে, তা আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে। আমি বিশেষ করে, নবীন প্রজন্মের কৃষকদের আমন্ত্রণ জানাই, আপনারা এগিয়ে আসুন, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, ভারত সরকারের নতুন কর্মসূচিগুলিকে আপন করে নিন। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, ভারতের গ্রাম, গ্রামের গরিব মানুষের জীবন, ভারতের কৃষকের জীবনে আমরা অদূর ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনতে পারবো। একাজে আপনাদের সঙ্গ ও সহযোগিতা চাই। আপনাদের সকলকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। রাধামোহনজী’কে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। এই কৃষিমেলার মাধ্যমে আগামীদিনে দেশের সকল কৃষক উপকৃত হোক। এই শুভেচ্ছা জানিয়ে সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

PG/SB/SB/S