Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

ডঃ বি আর আম্বেদকর জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী প্রদত্ত আম্বেদকর স্মারক বক্তৃতা

ডঃ বি আর আম্বেদকর জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী প্রদত্ত আম্বেদকর স্মারক বক্তৃতা


আজ আম্বেদকর স্মারক বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেলাম। এটি ষষ্ঠ আম্বেদকর বক্তৃতা। কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে আমি-ই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি এই স্মারক বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। পাশাপাশি, এখানে ভারত সরকারের একটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সৌভাগ্য হয়েছে। এই ঠিকানা বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রয়াণস্থল। এখানে সরকার একটি সুদৃশ্য প্রেরণাস্থল গড়ে তুলবে। কারও মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, যে মহাপুরুষ ১৯৫৬ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, আজ ৬০ বছর পর তাঁর প্রয়াণস্থলে কোনও স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠছে।

আমি জানি না ইতিহাসকে কে কেমন করে জবাব দেবেন, কিন্তু দেশকে ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে! হয়তো এই পূণ্য কাজ করাটা আমার ভাগ্যেই লেখা ছিল।

আমি সবার আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী মহোদয়’কে অন্তর থেকে অভিনন্দন জানাতে চাই, কারণ তাঁর সরকারই প্রথম এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই জমি বেসরকারি মালিকানায় চলে গিয়েছিল, যে বাড়িটিতে বাবাসাহেব থাকতেন, সেটিকে ভেঙে নতুন বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবুও বাজপেয়ীজী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এই জমি কিনে নেন। কিন্তু, তারপর সরকার বদলে যায়, যাঁরা ক্ষমতায় আসেন, তাঁদের হৃদয়ে আম্বেদকর ছিলেন না। সেজন্য কোনও কাজ হয়নি। এখন আমরা শুরু করেছি আর এই বিভাগকে বলছি, মন্ত্রী মহোদয়কেও বলছি, ২০১৮ সালের ১৪ এপ্রিল আমি এই ভবন উদ্বোধন করবো। তারিখ ঠিক করে কাজ করলে তবেই কাজ হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এখানে একটি সুদৃশ্য স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠবে।

আপনারা এর নক্‌শা দেখেছেন। দিল্লিতে যত ঐতিহ্যবাহী ভবন রয়েছে আমার বিশ্বাস, এই স্মৃতিসৌধ তেমনই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করবে। বিশ্ববাসীর কাছে এটি ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিসৌধ হলেও আমাদের জন্য এটিই হবে প্রেরণাস্থল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মে যাঁরাই মানবতার স্বার্থে কাজ করবেন, তাঁদের জন্য এই স্মৃতিসৌধ একটি প্রেরণাস্থল হয়ে উঠবে।

আমার মনে একটা ক্ষোভ রয়েছে, আমরা অধিকাংশ সময়েই বাবাসাহেবের প্রতি ঘোর অন্যায় করি। আমরা তাঁকে দলিতের মসীহা বানিয়ে এই অন্যায় করি। এভাবে আমরা তাঁর বহুমুখী বিশাল ব্যক্তিত্বকে সীমাবদ্ধ করে তুলি। কিন্তু তিনি প্রত্যেক নিপীড়িত, শোষিত, অত্যাচারিত মানুষের বিরুদ্ধে, মানবতার সপক্ষে প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। তাঁকে ভারতের সীমায় বেঁধে রাখা যেতে পারে, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন বিশ্ব মানব। বিশ্ব যে দৃষ্টিতে মার্টিন লুথার কিং’কে দেখে বাবাসাহেব আম্বেদকরকেও আমাদের তাঁর থেকে কোনও অংশে কম ভাবা উচিৎ নয়।

আমরা সংবিধানে যা কিছু পেয়েছি, তা কোনও জাতি বিশেষের দৃষ্টিকোণ থেকে পাইনি। বাবাসাহেবের নেতৃত্বে সংবিধান প্রণেতারা দেশ থেকে অন্যায় ও অত্যাচারের পরম্পরাকে নির্মূল করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দু’জন মহাপুরুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, প্রথমজন হলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আর দ্বিতীয়জন হলেন বাবাসাহেব আম্বেদকর।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশের অনেকটা অংশ দেশীয় রাজাদের অধীনে ছিল। ফলে রাজনীতি ও শাসনতন্ত্রে বিশৃঙ্খলা ছিল। দেশ ভাগ করে দিয়ে যাওয়া ইংরেজরা চেয়েছিলেন যে, দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাক। কিন্তু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল রাষ্ট্রীয় ঐক্যের কথা মাথায় রেখে নিজের প্রখর বুদ্ধি, কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে সেই সকল দেশীয় রাজার অধীন রাজ্যগুলির জনসাধারণকেও স্বাধীন ভারতের নাগরিক করে তোলেন। এই লৌহপুরুষের দূরদৃষ্টির সুফল হিসেবে আজ আমরা কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ ভারত। কিন্তু, তখন সমাজে জাতপাতের বিষ, দলিত, পীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত ও আদিবাসী মানুষদের প্রতি শতাব্দী প্রাচীন উপেক্ষা ও ঘৃণার করালগ্রাস থেকেও দেশের নিম্নবর্গের মানুষদের উদ্ধার করা প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরাধীন ভারতেই অনেক মহাপুরুষ সমাজ সংস্কারের চেষ্টা করেছেন, আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, মহাত্মা গান্ধী এক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রণী পুরুষ। তিনি হিন্দু সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু, বাবাসাহেব আম্বেদকর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। যে কাজ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সর্দার প্যাটেল করেছেন, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই কাজটি বাবাসাহেব আম্বেদকর করেছেন।

সেজন্য বাবাসাহেব আম্বেদকর যে স্বপ্ন দেখে গেছেন, তা সাকার করার কাজে কোনও শৈথিল্য আসা উচিৎ নয়। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বাবাসাহেব কেন মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। আমাদের দেশের ইতিহাস ঠিকভাবে লেখা হয় না। তরলীকৃত করা হয় অথবা ঘুরিয়ে লেখা হয়। সেই সময় বাবাসাহেব আম্বেদকরের সভাপতিত্বে হিন্দু কোড বিল-এর কাজ চলছিল। প্রথমদিকে তৎকালীন অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা বাবাসাহেবের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু, হিন্দু কোড বিল যখন সংসদে পাশ করানোর সময় হয়, তখন এতে মহিলাদের সমান অধিকার, সমান সম্পত্তির অধিকার, পারিবারিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। অনেক বড় বড় নেতাই তখন বাবাসাহেবের দৃষ্টিকোণ মেনে নিতে পারেননি। বাবাসাহেবের চোখে সকলেই সমান ছিলেন। শুধু দলিত, বঞ্চিত, পীড়িত, শোষিতদের জন্যই তাঁর মন কাঁদতো না, তিনি এমনকি টাটা-বিড়লাদের পরিবারের মহিলাদেরও অধিকারের কথাও ভেবেছিলেন। তখনকার বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা বলেন, এটা কেমন করে সম্ভব! কন্যা কিংবা পুত্রবধূ সম্পত্তির অধিকার পেলে বিবাহ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক বড় বড় পরিবার ভেঙে যাবে। সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। কিন্তু, বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে সরকার তাঁর চিন্তাভাবনা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। সমাজে পরিবর্তন আসে।

আমার বক্তব্যের তাৎপর্য হল, বাবাসাহেব আম্বেদকরের অবদান কেবলই দলিতদের অধিকার রক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি দেশের ৫০ শতাংশ জনসংখ্যা দেশের মা ও বোনেদের এতো বড় অধিকার সুনিশ্চিত করে গেছেন। সেজন্য তাঁকে আরও বেশি করে জানা ও বোঝার অবকাশ রয়েছে।

তিনি আমাদের দেশের শ্রম আইনেও পরিবর্তন এনেছেন। কয়লা খনিতে মহিলাদের কাজ করানোর ক্ষেত্রে আমাদের দেশের আইনে কোনও আপত্তি ছিল না। বাবাসাহেব আম্বেদকর সাহস করে মহিলাদের কয়লাখনির কাজ থেকে মুক্ত করানোর সিদ্ধান্ত নেন।

আমাদের দেশে কেবল দলিতরাই মজুর নয়, কিন্তু যাঁরাই শ্রমিক বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁদের সকলের মসীহা ছিলেন। তখন দেশের শ্রমিকদের প্রতিদিন ১২-১৪ ঘন্টা কাজ করানো হতো। ইংরেজ আমলে বাবাসাহেব আম্বেদকর এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, আর তারপর ভারতের শ্রম আইন রচনার সময়ে তিনি শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময়সীমা ৮ ঘন্টা নিশ্চিত করেন।

ভারতে যে ৫০ জন নেতার সিদ্ধান্ত দেশকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে, যে সিদ্ধান্তগুলি গোটা শতাব্দীকে প্রভাবিত করেছে, তাঁদের মধ্যে বাবাসাহেব আম্বেদকর সর্বাগ্রে রয়েছেন। তাঁর দর্শন ও সিদ্ধান্তগুলি বিংশ শতাব্দীকে প্রভাবিত করেছে, তার প্রভাব একবিংশ শতাব্দীকেও প্রভাবিত করছে। এমনকি, শক্তি উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রের ভিত্তি নির্মাণেও বাবাসাহেব আম্বেদকরের অবদান রয়েছে। ফলস্বরূপ, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ পর্ষদ ইত্যাদি গড়ে উঠেছে, যা ভারতকে শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সম্প্রতি আমরা সংসদে একটি বিল এনেছি। অনেকেই প্রশংসা করছেন যে, মোদী সরকার খুব ভালো বিল এনেছে। বিলটি দেশের জলপথের সংস্কার সংক্রান্ত। জলপথ পরিবহণকে উজ্জীবিত করার স্বার্থে এই বিলটি আমরা অবশ্যই এনেছি। কিন্তু এই ভাবনাটি ছিল আসলে বাবাসাহেব আম্বেদকরের। সেই সময়ে তিনি ভারতের সামুদ্রিক পরিবহণ এবং অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহণের শক্তির সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এ বিষয়ে তিনি কিছু সুসংগঠিত ভিত্তিও রচনা করে গেছেন। তিনি যদি দীর্ঘকাল সরকারে মন্ত্রী থাকতেন, তা হলে আজ আমরা সংসদে যে বিল এনেছি, তা আজ থেকে ৬০ বছর আগেই কার্যকরী হতো। অর্থাৎ, বাবাসাহেব আম্বেদকরের অভাব আমরা ৬০ বছর পরেও অনুভব করছি। কারণ, এই সরকার বাবাসাহেব আম্বেদকরের মতাদর্শের অনুগামী সরকার।

বাবাসাহেব আম্বেদকর আমাদের কী শিক্ষা দিয়ে গেছেন? এদেশের অনেক রোগের প্রতিকার বাবাসাহেব আম্বেদকর আবিষ্কার করেছিলেন। রোগ সম্পর্কে অনেকেই জানেন, তার ছোটখাটোপ্রতিকার অনেকেই করে থাকেন। কিন্তু, বাবাসাহেব আম্বেদকর স্থায়ী সমাধানের পথ আবিষ্কার করে গেছেন। সেই পথটি হল সুশিক্ষা। তিনি সকলকে শিক্ষিত হওয়ার বার্তা দিয়ে গেছেন। এদেশের সকল রোগের সমাধান সুশিক্ষা। শিক্ষিত হলেই আপনি বিশ্বের সকলের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবেন, কেউ আপনাকে অস্পৃশ্য করে রাখতে পারবেন না। বাবাসাহেব আম্বেদকর আমাদের আন্তরিক শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় মন্ত্রটি ছিল সংগঠিত হও। আর তৃতীয় মন্ত্র ছিল মানবতার পক্ষে লড়াই করো, অমানবিক সকল কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করো। এই তিনটি মন্ত্র আমাদের আজও প্রেরণা যোগায়, শক্তি যোগায়। সেজন্য বাবাসাহেব আম্বেদকর’কে শ্রদ্ধা জানাতে হলে আমাদের দায়িত্ব বর্তায় তাঁর প্রদর্শিত পথে চলা। সেজন্য আমাদের প্রথম মন্ত্র দিয়েই শুরু করতে হবে। শিক্ষিত হল্‌ এবং দ্বিতীয়মন্ত্র অনুযায়ী সংগঠিত হলে অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় মন্ত্রে অনুগমনের প্রয়োজনই পড়ে না। তিনি যা বলেছেন, নিজের জীবনেও তিনি তা করে দেখিয়েছেন। সম্প্রতি, আমাদের বিহারের রাজ্যপাল একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বরোদা গিয়েছিলেন, আর সেখানে গিয়ে তাঁরা সয়াজীরাও পরিবারকে সম্মানীত করেছেন। সয়াজীরাও গায়কোয়াড-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই হীরেটিকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি-ই সেই হীরেকে প্রথম নিজের মুকুটে স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর দৌলতেই ভারত বাবাসাহেব আম্বেদকরের মতো রত্ন পেয়েছিল। সেই সময়ে একজন সরকারি পিওনও বাবাসাহেব আম্বেদকর’কে নিজের হাতে জল দিতো না, সে নীচে রাখতো, বাবাসাহেব জল উঠিয়ে খেতেন। তেমন প্রতিকূল সময়ে সয়াজীরাও গায়কোয়াড বাবাসাহেব আম্বেদকর’কে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সেজন্য বিহারের রাজ্যপালের এই সম্মান অভিযানের জন্য আমি তাঁকে অভিনন্দন জানাই।

আমার মনে পড়ে, বাজপেয়ীজীর নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় এলেসারা দেশে শোরগোল উঠেছিল যে, বি জে পি সরকার এসেছে, এবার সংরক্ষণ প্রথা তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু, বাজপেয়ীজীর নেতৃত্বে দু’দফা সরকার দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করেছে। সংরক্ষণ প্রথা উঠিয়ে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠেনি। এখনও তেমনই শোরগোল তোলা হচ্ছে।

মধ্যপ্রদেশে অনেক বছর ধরে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও অন্য অনেক রাজ্যে বিভিন্ন সময়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু এই দল কখনও দলিত, পীড়িত, শোষিত ও জনজাতির মানুষের সংরক্ষণ উঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেনি। তবুও আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়, কেন? বাবাসাহেব আম্বেদকর যে রাষ্ট্রনিষ্ঠা ও সমাজ নিষ্ঠার ভিত্তিতে দেশকে পরিচালিত করার প্রেরণা দিয়ে গেছেন, তা থেকে সরে গিয়ে যাঁরা কেবল রাজনীতি করে, তাঁদের মিথ্যা সম্বল করে গুজব রটানো ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। আমি যখন ইন্দু মিলস্‌-এর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, চৈত্যভূমির পুনর্নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে গিয়েছিলাম, সেই সময়েও আমি বলেছি, স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকরও এসে আপনাদের এই অধিকার হরণ করতে চাইবেন না। সেই মহাপুরুষের তুলনায় আমরা কোথায়! সেজন্য যাঁরা গুজব রটিয়ে রাজনীতি করেন, সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করার মাধ্যমে সমাজকে দুর্বল করতে চান, তাঁদেরকে কখনই দায়িত্বশীল মানুষ বলা যায় না।

বাবাসাহেব আম্বেদকর ছিলেন একজন বড় মাপের অর্থনীতিবিদ। যাঁরা আজ ভারতের মহান ঐতিহ্যকে ছোট দেখিয়ে গর্ব অনুভব করেন, তাঁরা সম্ভবত জানেন না যে, বাবাসাহেব আম্বেদকরের গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল ভারতের বাণিজ্য বৈভব। এ বিষয়ে গবেষণাপত্র লিখেই তিনি পি এইচ ডি পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভারতে শিল্পায়ন অনিবার্য। একদিকে তিনি শিল্পায়নের কথা ভাবছিলেন, অন্যদিকে তিনি শ্রম আইন সংশোধন করছিলেন। দেশকে শিল্পে উন্নত করার পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার নিয়ে চিন্তা – কত বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি। আজ যাঁরা শ্রমিক আন্দোলন করেন, তাঁরা শিল্প বিরোধী শ্লোগান দেন, আর যাঁরা শিল্প নিয়ে ভাবেন, তাঁদের অধিকাংশই শ্রমিক বিরোধী। কিন্তু, বাবাসাহেব আম্বেদকর ছিলেন দূরদ্রষ্টা। তিনি বলতেন, আমার দেশের দলিত, পীড়িত, শোষিত অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ-ই ভূমিহীন। যাঁদের কৃষিযোগ্য জমি নেই, তাঁরা ও তাঁদের সন্তানরা ক্ষেত মজুরি ছাড়া আর কী করবেন? শিল্পায়ন হলেই এঁদের সন্তানরা ক্ষেত মজুরি ছেড়ে নিজেদের প্রশিক্ষিত করে শিল্পক্ষেত্রে কাজ করতে পারবেন। উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের জীবনের মানও পরিবর্তিত হতে পারে।

কিছুদিন আগে এই বিজ্ঞান ভবনে আমি দলিত শিল্পপতিদের সম্মেলনে এসেছিলাম। সেদিন আমার গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল। আমার পাশেই মিলিন্দ বসেছিলেন। সারা দেশ থেকেই দলিত শিল্পপতিরা এসেছিলেন। আর আমাকে চমকে দিয়ে এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন দলিত মহিলা শিল্পপতিও ছিলেন। আমার মতে, এঁরাই বাবাসাহেব আম্বেদকর’কে সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করার কাজ করছেন। তাঁরা বলেছেন, আমরা চাই না যে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ আর কর্মসংস্থানের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াক। আমরা এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই যাতে দলিত শিল্পপতিরা অন্যদের কর্মসংস্থান যোগাবে। সেদিন তাঁরা আমার কাছে বেশ কিছু দাবি পেশ করেছিলেন। আজ আমি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, সেই সম্মেলনের পর চার মাসও পেরোয়নি, ইতিমধ্যেই এবারের বাজেটে তাঁদের সকল দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। একথা হয়তো আপনারা খবরের কাগজে পড়েননি। ভাল কথা খুব কমই ছাপা হয়।

দলিত স্ব-উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া, ব্যবসা, পুঁজি, বিনিয়োগ সহ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের যুবসম্প্রদায়ের অগ্রগতিকে সুনিশ্চিত করতে তাঁদের দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ ছিল না। এজন্য তাঁরা পথে নেমে কোনও আন্দোলন করেননি। কিন্তু তাঁদের দাবিতে অধিকারবোধের শক্তি ছিল। সরকার সেই শক্তির প্রতি সংবেদনশীল, সেজন্যই তাঁদের দাবিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আমরা সমাজের ঐক্যকে অগ্রাধিকার দিতে চাই। বাবাসাহেব আম্বেদকরের থেকে আমরা এই শিক্ষাই পেয়েছি। যিনি শৈশব থেকে এতো অন্যায় উপেক্ষা আর উৎপীড়ন সহ্য করেছেন, যিনি নিজের মা’কে অপমানিত হতে দেখেছেন, নিজের হাতে ক্ষমতা আসার পর তিনি কোনও প্রতিশোধ নেননি। তিনি সবার সমান অধিকারের কথা বলে গেছেন। আপনারা যদি সংবিধান সভার বিতর্ক বিবরণী পড়েন, তা হলে দেখবেন, বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁর কথায়, বাণীতে এমনকি কোনও শব্দে কোনও রকম বিদ্বেষকে স্থান দেননি। আমাদের খাবার সময় কখনও জিভে কামড় পরে, তখন যত ব্যথাই পাই না কেন, আমরা কি দাঁত ভেঙে দিই? ভাঙ্গি না, কারণ, দাঁতও আমার-জিভও আমার। বাবাসাহেব আম্বেদকরও সংবিধান রচনার সময় তেমনই উচ্চ বর্ণের মানুষদের দলিত ও অত্যাচারিত মানুষদের থেকে আলাদা করে ভাবেননি। সকলকে সমান অধিকার দিয়ে গেছেন। সেজন্য আজ ১২৫ কোটি মানুষের দেশ বাবাসাহেব আম্বেদকরের কাছে ঋণী। ভবিষ্যতেও তাঁর দর্শন আমাদের পথ দেখাবে।

আমরা পরাজয়কে মেনে নিতে পারি না। রাজনৈতিক পরাজয়ের থেকেও সমাজের জয় এবং দেশের জয় অনেক বড়। সেজন্য আমরা সরকারে থাকি কিংবা বিরোধী পক্ষে, দেশের অগ্রগতির প্রতি সকলেরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। বাবাসাহেব আম্বেদকর রাজনীতির উর্ধ্বে সমাজ ও দেশকে স্থান দিয়েছেন। আমরা যদি তাঁকে ভুলে না যেতাম, তা হলে আজ দেশের এই অবস্থা হতো না। তিনি সারা জীবন মানবতার জয়গান গেয়ে গেছেন। অমানবিকতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল সাংবিধানিক পদ্ধতি মেনে। গণতন্ত্রকে তিনি সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি কারা অন্যায় করেছিলেন, আমরা সবাই ভালোভাবেই জানি। সেজন্য আমাদের সংকল্প দেশের সকল দলিত, পীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত, দরিদ্র আদিবাসী, গ্রামের মানুষ, শহরের বস্তিবাসী, অশিক্ষিত মানুষের স্বার্থে কাজ করা। এই কাজে বাবাসাহেব আম্বেদকর-ই আমাদের সবচেয়ে প্রেরণার উৎস।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর অবাক হয়ে দেখি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এতো বছর পেরিয়ে গেলেও ভারতের ১৮ হাজার গ্রামে একটি বিদ্যুতের খুঁটিও পোঁতা হয়নি। বাবাসাহেব আম্বেদকর যে শক্তি উৎপাদনের ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর ৬০ বছর পরও ১৮ হাজার গ্রামে সেই স্বপ্ন সাকার না করে আমরা কিভাবে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবো! আমরা সংকল্প গ্রহণ করি। আমি লালকেল্লার প্রাকার থেকে ঘোষণা করি যে, আগামী ১ হাজার দিনের মধ্যে এই ১৮ হাজার গ্রামে আমরা বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবো। আজ যেমন ঘোষণা করেছি, ২০১৮ সালের ১৪ এপ্রিল আমি এই স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করবো। এটা নিছকই ঘোষণা নয়, সরকারের সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিভাগ একাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আপনারা এখনই নিজের মোবাইল ফোনে দেখে নিতে পারেন, ৬০ বছর ধরে যা এখনও হয়নি, মাত্র ছ’মাসের মধ্যেই ছ’হাজারেরও বেশি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বাকি, ১২ হাজার গ্রামে আমরা সম্ভবত ঐ ১ হাজার দিন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবো। ৬০ বছর পর বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে ঐ গ্রামগুলিতে সরকারের জয়জয়কার হচ্ছে। আমি সেসব গ্রামের মানুষদের বলবো, সরকারের জয়জয়কার না করে আপনারা বাবাসাহেব আম্বেদকরের জয়জয়কার করুন, তিনি-ই এর ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন, মাঝে কেউ কাজ করেননি। আমরা সৌভাগ্যবান, বাবাসাহেব আম্বেদকরের স্বপ্নকে সাকার করার সুযোগ, তাঁরা আমাদের দিয়ে গেছেন।

আগামী ১৪ এপ্রিল আমি মউ যাবো। এই পঞ্চতীর্থ নির্মাণের সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। ইন্দু মিলস্‌ – এর চৈত্যভূমির কাজ পূর্ববর্তী কোনও সরকার কেন করেনি, ২৬ আলিপুরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর এত বছর পর কেন স্থাপিত হচ্ছে? বাবাসাহেব আম্বেদকরের লণ্ডন বাসস্থানকে পুনর্নির্মাণ করে মিউজিয়াম গড়ে তোলার উদ্যোগ আমাদের নিতে হল কেন? এখন যে কোনও ভারতীয় লণ্ডন বেড়াতে গেলে অবশ্যই সেই মিউজিয়াম দেখতে যাবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই পঞ্চতীর্থ যাত্রা দেশের সকল পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য প্রেরণা যাত্রায় পরিণত হবে। দিল্লিতে দুটি স্মৃতিসৌধ, বছরখানেক আগেই ১৫ জনপথ-এ তাঁর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম, সেটি নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, অদূর ভবিষ্যতেই সেটিকে জাতির উদ্দেশে সমর্পণ করার সৌভাগ্য আমার হবে।

এইসব কাজ করার সৌভাগ্য ভারতীয় জনতা পার্টি সরকারের হয়েছে। কারণ, আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা করি। আগামী ১৪ এপ্রিল আমি অবশ্যই মউ যাবো কিন্তু সেদিন মুম্বাই-এ আরেকটি বড় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছি। সেদিন বাবাসাহেব আম্বেদকরের সমুদ্রপথ ও জলপথ পরিবহণের স্বপ্ন সফল করার উদ্দেশে আমরা একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছি।

মউ শহরের কর্মসূচি উদ্বোধনের পর আমি সেদিন বাবাসাহেব আম্বেদকরের আরেকটি স্বপ্ন সাকার করার কর্মসূচি উদ্বোধন করবো। বাবাসাহেব আম্বেদকর দেশের কৃষকদের স্বনির্ভর করে তোলার কথা ভেবেছিলেন। আমাদের দেশে আজও কৃষকদের ফসল বাজারজাত করার সমস্যা রয়েছে। ফসল ভালো হলেও অনেক সময়ে বাজারে সঠিক দাম না পেলে কৃষকদের আত্মহত্যা করতে হয়। আগামী ১৪ এপ্রিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মজয়ন্তীতে আমরা কৃষকদের ফসল বাজারজাত করার স্বার্থে একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ই-মার্কেট, ই-প্ল্যাটফর্ম চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মাধ্যমে কৃষক নিজের মোবাইল ফোনেই জানতে পারবেন কোন্‌ বাজারে তাঁর ফলানো ফসলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে ফসল বিক্রি করে তিনি লাভবান হবেন।

আমার এত কথা বলার তাৎপর্য হল, আমরা বাবাসাহেব আম্বেদকরের মতো মহাপুরুষের রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক চিন্তা ও সামাজিক চিন্তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে চাই। আমরা সেই পথেই এগিয়ে চলেছি। গত ৬০ বছর ধরে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি, বাজপেয়ীজী যে স্বপ্ন দেখে গেছেন, তাঁকে বাস্তবায়িত করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আপনারা সকলে ২০১৮ সালের ১৪ এপ্রিল এখানে আসবেন, আমরা সেদিন এই স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করবো।

অনেক অনেক ধন্যবাদ।

PG/SB/SB