পিএমইন্ডিয়া
আপনাদের সবাইকে আমার উষ্ণ অভ্যর্থনা। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত এর আগে ভারত সফরের সুযোগ পেয়েছেন এবং কারো কারো ক্ষেত্রে সম্ভবত এটাই প্রথম ভারতে আসা। আমি আশা করি আপনাদের স্বাচ্ছ্যন্দের সবকিছু এখানে খেয়াল রাখা হচ্ছে। আমি জানি এটা একটা সরকারী কর্মসূচি, কিন্তু এর বাইরেও যদি এখানে করার জন্য আপনাদের কোনো পরামর্শ থাকে যা আপনাদের যোগ্য হবে, তাহলে তাও করা যেতে পারে। আমি এটাও চাই যে, আপনাদের এই সফর শুধুমাত্র ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনের গুরুত্বের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে, কেন না বাস্তবে এটা ভারত সফর। আর সেজন্যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার সরকারের তরফে সমস্ত রকম সহায়তার চেষ্টা করা হবে।
আমি মনে করি, ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা অবশ্যই ঠিক যে সম্মেলনের আহ্বায়ক দেশ হিসেবে ভারতের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর সঙ্গে এটাও সত্যি যে, এটাই প্রথম এমন সম্মেলন যেখানে আফ্রিকার ৫৪ টি দেশকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, এবং ৫৪টি দেশই সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। সেদিক দিয়ে ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলন এধরনের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান এবং সহযোগিতার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
এখন পর্যন্ত আমাদের্ব কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ৪০-টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের প্রধান এই সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করবেন। আর বাকি দেশগুলির বরিষ্ঠ মন্ত্রিগণ উপস্থিত থাকবেন। এবার ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রীদের বৈঠকও রয়েছে। কারণ আমরা চাই আগামী দিনগুলিতে ভারত-আফ্রিকার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক।
ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলন এর আগে ২০০৮ সালে ও ২০১১ সালে দু’বার অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এটা তৃতীয় বারের মতো সম্মেলন। আগের দুটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল ‘বানজুল ফর্মুলার’ নিরিখে এবং সে কারণে সামান্য কিছু দেশ এতে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা সেই ফর্মুলা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেই যাতে আফ্রিকার সমস্ত দেশ থেকে প্রতিনিধিদের যোগদান সুনিশ্চিত হয়।
আমি মনে করি এটা ভারত ও আফ্রিকার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আমি মনে করি এই অংশিদারিত্ব ও সাম্য সব দেশকেই দেওয়া হচ্ছে। আমাদের তরফে এটা একটা পদক্ষেপ। এবং আমি মনে করি একারণে এবারকার সম্মেলন আগেকার দুটি সম্মেলন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সম্মেলনে নানা পর্যায়ে আলোচনা হবে, উচ্চ পর্যায়েও। আমি মনে করি সহযোগিতার এই নতুন পদক্ষেপ আফ্রিকার সমস্ত প্রান্তে নতুন সজীবতা নিয়ে আসবে| আর এই সতেজ ভাব শুধুমাত্র আফ্রিকার জন্য নয়, ভারতের জন্যও বটে। কেননা এই সম্মেলন আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সতেজ ভাব নিয়ে আসবে।
আমি জেনেছি যে, আপনারা অবশ্যই ভারতে আসছেন এবং সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছেন। এর পাশাপাশি আপনাদেরকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে আপনারা অগ্রগতি ও উন্নয়ন দেখতে পাবেন। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও ৪০০ জন সাংবাদিক আফ্রিকা থেকে আসছেন এই সম্মেলনের সংবাদ পরিবেশন করার জন্য এবং তারা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব খরচে আসছেন। আমি মনে করি এই সম্মেলনের গুরুত্ব অনুধাবন করার এটা একটা সূচক। আমি সবার সঙ্গে আলোচনা করে যা বুঝতে পেরেছি, এই সম্মেলনের দিকে গোটা পৃথিবীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে এবং জনগণ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একে দেখছে এবং আমি এটা খুব ভালো লক্ষণ হিসেবে মনে করছি।
ভারতের সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলির সম্পর্কের বন্ধন শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়েই নয়, বরঞ্চ আমাদের গভীর ও উন্নত এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এটা বলা হয়ে থাকে লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর এই দুই স্থলভাগ আসলে একটা অংশই ছিল এবং অনেক পরে তা দুটি ভূখন্ডে ভাগ হয়ে যায়- যার একটি এশিয়া ও অপরটি আফ্রিকা; এবং আমাদের মাঝখানে রয়েছে এক সমুদ্র যা আমাদেরকে বিভক্ত করেছে। ভারতের পশ্চিম উপকূল এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূল আসলে সমুদ্রের দ্বারা সংযুক্ত।
আমি ভারতের পশ্চিম উপকূলের গুজরাতের লোক | বাস্তবে গুজরাতিরাই মূলত আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক সম্পর্ক শুরু করে। এমনকি আজও ২,৭০,০০০ ভারতীয় আফ্রিকায় বসবাস করছেন এবং তাদের অনেকেই গুজরাতি। এমনকি আমার সঙ্গেও আফ্রিকার সংযোগ রয়েছে। তা আমি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলাম, সেই সময় নয়, তারও অনেক আগে থেকেই। আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে আমার সবসময়ই যোগাযোগ ছিল এবং যখনই কোনো অভ্যাগত এসেছেন, আমার সঙ্গে সবসময়ই সাক্ষাৎ করেছেন। আফ্রিকার বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সবসময়েই আমার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই, ব্যক্তিগত দিক দিয়েও এই অঞ্চলের সঙ্গে আমার সর্বদাই গভীর যোগাযোগ রয়েছে।
মূলত ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে বেশ কিছু দিক দিয়ে মিল রয়েছে এবং ভারত ও আফ্রিকা মিলিয়ে পৃথিবীর জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এঅঞ্চলে রয়েছেন। সম্পূর্ণ আফ্রিকার জনসংখ্যার সমান অবশ্য ভারতের জনসংখ্যা। তবে আফ্রিকা পৃথিবীর মধ্যে যেমন তরুণ অঞ্চল, তেমনি ভারতও নবীন দেশ। কেননা আমরা যদি পৃথিবীর দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো যে এই দুটো অঞ্চলেই জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছর বয়সের নীচে। এবং আমি মনে করি এটা ভারত ও আফ্রিকার জন্য এক বিশেষ সৌভাগ্য।
ভারত ও আফ্রিকার মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গত কয়েক বছরে তা আট থেকে নয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি মনে করি যে এই সম্মেলনের পর তা আরও লক্ষনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। আফ্রিকায় এখন ভারতও প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ এবং তা মূলত তেল ক্ষেত্রে। আর তা আফ্রিকার অর্থব্যবস্থায় এক নতুন গতিশীলতার সঞ্চার করেছে।
আগের দুটি ভারত-আফ্রিকার শিখর সম্মেলনের পরে ভারত ৭.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শর্তসাপেক্ষ ঋণ দিয়েছিল। আর এই অর্থ পরিকাঠামো, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ জলের ক্ষেত্রে উন্নয়নে ব্যবহার হয়েছে। আফ্রিকার চল্লিশটিরও বেশি দেশে একশটিরও বেশি প্রকল্প রূপায়নের কাজ চলছে।
একই ধারায়, ভারত একশটিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে ১.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং তা মানব সম্পদের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। আমার কাছে, আমি মনে করি যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করেছে, তা হচ্ছে ভারত ও আফ্রিকার মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা তৈরিতে সহযোগিতা। এবং গত কয়েক বছর ধরে আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা অন্তত ২৫০০০ আফ্রিকার ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছি। এবং আমি মনে করি এটা ভারতের সৌভাগ্যের বিষয়। বর্তমানে আফ্রিকার বহু নেতা যারা এখন ক্ষমতায় এবং উচ্চ পদে রয়েছেন, তাদের অনেকেই ভারতে তাদের পড়াশোনা করেছেন ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
আমি মনে করি ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে আরেকটি দিক রয়েছে, যা আমাদেরকে আফ্রিকার অনেক দেশের সঙ্গেই যুক্ত করেছে । আর তা হচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ, যা থেকে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ উপকৃত হচ্ছে। আমি মনে করি এর মাধ্যমে দেশগুলির মধ্যে এক শক্তিশালী গোষ্ঠীবন্ধন তৈরী হবে। এবং পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন ঘিরে সমস্যা মোকাবিলায় যে বিশ্বময় যুদ্ধ চলছে, তাতে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্রভাব হ্রাসে ও উপশমে এক বৃহত্তর ভূমিকা নিতে চলেছি।
বর্তমানে পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার মুখোমুখি। ভূ-উঞ্চায়ন নিয়ে বাড়ছে সমস্যা। এই অবস্থায় আমি মনে করি ভারত ও আফ্রিকার কিছুটা হলেও গর্ব করা উচিত। কেননা ভারত ও আফ্রিকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর মধ্যেই পরিবেশকে ক্ষতি না করা বা ধ্বংস না করার প্রেরনা রয়েছে। এবং আমরাই সম্ভবত পৃথিবীর এই বড় সমস্যার জন্য কম দায়ী। আমি মনে করি ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে এটাও একটা সমতার বিষয়।
আমি বিশ্বাস করি এই সম্মেলনের সময় এবং এর পরে আমরা এমন সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি যা ভারত ও আফ্রিকার আত্মবিশ্বাসকে নতুন মাত্রা দেবে। আমাদের সম্পর্ক হবে আরও ঘনিষ্ট ও গভীর। আমি মনে করি আমরা সম্মিলিতভাবে পৃথিবীকে যা দিতে পারি তার ভিত্তি সূচিত করতে পারব।
আবারও আপনাদের সবাইকে উষ্ণ অভিনন্দন। সম্মেলনের সময় আবার আপনাদের শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ পাব। ধন্যবাদ!
তৃতীয় ভারত-আফ্রিকা শিখর বৈঠকের সম্পাদক সম্মেলনে আফ্রিকার সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত সাক্ষাৎকার
প্রশ্ন: আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের কাছে আফ্রিকার স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব কী? আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বোঝাপড়া কী ছড়িয়ে থাকা প্রভূত সম্পদ নিয়ে চিনের সঙ্গে কাড়াকরির একটি প্রক্রিয়া?
উত্তর: এই সম্মেলনে আফ্রিকার সবক’টি দেশের অংশগ্রহণ, যার মধ্যে চল্লিশটিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের প্রধান অংশগ্রহণ করছেন- এটাই ভারত ও আফ্রিকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের গভীর বন্ধনের প্রমাণ।
সমস্তরকম কূটনৈতিক সম্পর্ককে ছাড়িয়ে এই সম্পর্কের অবস্থান। গভীর অনুভূত্তির সংযুক্তি থেকেই এই সম্পর্ক। আমাদের দু’দেশের ঐতিহাসিক আদান-প্রদান, বহু প্রাচীন আত্মীয়তার সম্পর্ক, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই, সমস্ত মানুষের সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়ের জন্য আন্দোলন, আমাদের উন্নয়নের জন্য যৌথ আকাঙ্খা থেকেই এই সম্পর্ক। পারস্পরিক বিশ্বাস ও শুভবুদ্ধির শক্তিতে আমরা বলিয়ান।
ভারত ও আফ্রিকার পৃথিবীর জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এদের একটা বড় অংশই তরুন ও যুবক। এই শতব্দীতে তাই প্রকৃত পক্ষেই পৃথিবীর যুব সংখ্যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ভারত ও আফ্রিকায়। তাদের ভবিষ্যতই বাস্তবে এই পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারন করবে।
ভারত ও আফ্রিকা বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে আশার এক উজ্জ্বল ক্ষেত্র। ভারত এখন আর্থিক দিক দিয়ে দ্রুত অগ্রগতি সম্পন্ন দেশ। আফ্রিকায়ও প্রবৃদ্ধির দ্রুতগতি দেখা যাচ্ছে | ভারত ও আফ্রিকা যদিও নিজেদের জনগনের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু করবে, কিন্তু আমাদের এই সহযোগিতা দু’দেশের পরস্পরের কাছেই বিশেষ শক্তির উৎস হতে পারে। দু’দেশই যদি পরস্পরের আর্থিক উন্নয়নে সহযোগী হয়ে জোর চেষ্টা করে তাহলে সমদর্শী, সর্বব্যাপী ও দীর্ঘস্থায়ী এক বিশ্ব নির্মানের বাইরেও অনেক কিছু করা সম্ভব। আমাদের পরস্পরের সম্পূরক সম্পদ ও বাজার রয়েছে, আর রয়েছে শক্তিশালী মানবসম্পদ। বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য আমাদের দিকেই।
আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের সহযোগিতার আগ্রহ ক্ষমতায়ন, সক্ষমতা তৈরি, মানব সম্পদের উন্নয়ন, ভারতের বাজারের সহজলভ্যতা এবং আফ্রিকায় ভারতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা থেকেই জন্ম নিয়েছে। যাতে আফ্রিকার মানুষ নিজেদের অঞ্চলের উন্নয়নের দায়িত্বভার কাঁধে বহন করার জন্য নিজেদের সক্ষমতা ও পছন্দ অর্জন করতে পারেন। আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এক অনন্য বিষয় এবং এরজন্য কোন কিছুর উল্লেখেরও প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন: আফ্রিকার অঞ্চলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত ও আফ্রিকার সম্পর্ক কীভাবে সহযোগিতা করবে? এটা কি দু’দেশের জন্যই সমান লাভজনক হবে?
উত্তর: বর্তমান বছরগুলিতে আফ্রিকার উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। এটা অবশ্যই আফ্রিকার দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্ব, শান্তি ও এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহযোগিতার ফলেই সম্ভব হয়েছে। আফ্রিকার মানুষ, বিশেষ করে মহিলা ও যুব সমাজের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন ও সক্ষমতার ক্ষেত্রে সাফল্যের অনেক তথ্য ও উদাহরন উৎসাহের জন্ম দেয়।
আফ্রিকার জন্য উন্নয়নের অংশিদার হতে পেরে ভারত গর্বিত। আফ্রিকার দেশগুলি যখন থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে, তখন থেকেই আমরা আফ্রিকার দেশগুলির মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা করে আসছি। আমাদের এই সহযোগিতা এখন নানা রূপ পাচ্ছে এবং তার খুব দ্রুত বিস্তৃতি ঘটছে।
ভারতের একশ পঁচিশ কোটি মানুষের বাজারে আফ্রিকার ৩৪ টি দেশ এখন কোনো শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্য করতে পারছে। এর আগের দুটি ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনে আমরা ৭.৪ বিলিয়ন ডলার শর্তসাপেক্ষ ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলাম। আর এই অর্থ আফ্রিকার পরিকাঠামো, ক্ষুদ্র নির্মাণ, জনসেবা এবং পরিশ্রুত বিদ্যুৎ তৈরিতে ব্যয় হয়েছে। আমরা আরও ১.২ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছি যা মানব সম্পদ উন্নয়নে এবং একশটিরও বেশি সক্ষমতা তৈরির প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যায় হবে। শুধুমাত্র গত তিন বছরে পঁচিশ হাজার আফ্রিকাবাসী ভারতে পড়াশোনা করেছেন অথবা প্রশিক্ষন নিয়েছেন। প্যান আফ্রিকা ই-নেইওয়ার্ক, যা এখন আফ্রিকার ৪৮ টি দেশকে সংযুক্ত করেছে, তা আঞ্চলিক সংযুক্তি ও মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন পথ সূচিত করেছে। আফ্রিকায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত ক্রমেই এক প্রধান ও দ্রুত বৃদ্ধিসম্পন্ন দেশ হয়ে উঠছে। আফ্রিকায় ভারতের পর্যটকদের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে।
আফ্রিকার উন্নয়ন আফ্রিকার সম্পদের মতই ভারতের জন্য এক বিশেষ সুযোগ। আফ্রিকায় তেল ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সেদেশে কর্মসংস্থান তৈরি করবে। তাছাড়া এই অঞ্চলের উন্নয়ন বিশ্বের আর্থিক স্থায়িত্ব ও অগ্রগতিতেও সহায়তা করবে, যার পরিনতিতে লাভ হবে ভারতেরও।
প্রশ্ন: কিছু সমালোচক বলেন যে উপনিবেশবাদ এবং নয়া-উপনিবেশবাদ (উপনিবেশবাদ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাক্তন ঔপনিবেশিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক চাপ)-এর প্রভাব এখন আফ্রিকায় শান্তি, স্থায়িত্ব ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করছে। ভারতও এরকম এক ঐতিহাসিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। কিন্তু বিষাদ ও টুকরো করে দেওয়ার এই চক্রকে ভেঙ্গে দিয়ে প্রশাসন, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে আফ্রিকার জন্য ভারতের কী পরামর্শ রয়েছে?
উত্তর: আফ্রিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীনতা এক গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আফ্রিকার দেশগুলির স্বাধীনতার লড়াইয়ে এবং জাতি-বিদ্বেষ নির্মূলে দৃঢ়তার সঙ্গে পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরাও গর্বিত।
আমাদের কাছ থেকে আফ্রিকার কোনো পাঠ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। উপনিবেশের প্রেক্ষাপট আমাদের সবার ক্ষেত্রেই দীর্ঘ ও গভীর প্রভাব ফেলেছে। আফ্রিকাও এইরকম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। যাইহোক, আফ্রিকা এখন উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিচয় দিচ্ছে। এই অঞ্চল অনেক বেশি স্থায়ী ও সুস্থির। আফ্রিকার দেশগুলি এখন নিজেদের উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য পরস্পরের কাছাকাছি আসছে। আফ্রিকাবাসীদের এখন ভোটদানের সংখ্যা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্থিক সংস্কার এবং আঞ্চলিক আর্থিক সহযোগিতা ও সংহতির বিশেষ প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। আর্থিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। আফ্রিকার অন্তত ৯৫ শতাংশ অংশেই এখন মোবাইল টেলিফোন রয়েছে। তাছাড়া শিল্প, উদ্ভাবন, নারী-ক্ষমতায়ন, দক্ষতার উন্নয়ন ও প্রকৃতির সুরক্ষায়ও উচ্চস্বরে উল্লেখ করার মতো কোন কিছু পদক্ষেপ রয়েছে।
তবে অবশ্যই আফ্রিকা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েই চলেছে। নতুন করে কিছু নিরাপত্তা সমস্যাও তৈরি হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ। পৃথিবীর অন্যান্য অংশও এর দ্বারা প্রভাবিত।
উন্নত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ইতিহাস রয়েছে আফ্রিকার, রয়েছে প্রভূত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আছে বড় সংখ্যার মেধাবী যুব সমাজ। ‘অ্যাজেন্ডা ২০৬৩: দি আফ্রিকা উই ওয়ান্ট’ (‘লক্ষ্য ২০৬৩: যে আফ্রিকা আমরা চাই’)- এই লক্ষ্য আফ্রিকার নেতৃত্ব ও জনগণ উপলব্ধি করতে পারেছেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।
আফ্রিকার দেশগুলি যেভাবে চাইবে সেভাবেই একজন বন্ধু হয়ে, সহযোগী হয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা, বিশেষজ্ঞ ও সম্পদের আদান প্রাদনের মাধ্যমে আফ্রিকার জনগণকে সহযোগিতার জন্য ভারত সবসময় পাশে থাকবে। যেহেতু আমাদের প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রায় একই রকম, তাই এর সমাধানও হয়ত প্রাসঙ্গিক হবে।
প্রশ্ন: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুফলের জন্য ভারত ও আফ্রিকা আর কী কী করতে পারে? ২০০৮ সালে প্রথম ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনের পর এই সময়টার মধ্যে কী কী সাফল্য পাওয়া গেছে?
উত্তর: ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমি বিশাল সুযোগ দেখতে পাচ্ছি। এই শতাব্দীতে ভারত সবচেয়ে জনবহুল দেশ ও আফ্রিকা সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল হয়ে উঠবে। আমাদের দুই তরফেই রয়েছে যুব-জনগণ। আফ্রিকাও প্রচুর সম্পদে বলীয়ান। ভারত ও আফ্রিকা খুব দ্রুততার সঙ্গেই আধুনিকীকরণ, নগরায়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে।
আমাদের আর্থিক সহযোগিতা এখন বিশেষ গতি পাচ্ছে। আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে যেখানে ছিল ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থ বর্ষে ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে পৌঁছেছে। যা প্রায় দ্বিগুন। ভারত ও আফ্রিকার আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি ২০০৮ সালে ভারতের সিদ্ধান্তের ফলে দু’দেশের বাণিজ্যেরও সহায়তা হয়েছে। ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কম উন্নত দেশগুলিকে ভারতের বাজারের সুযোগ করে দিতে শুল্কমুক্ত করে দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ২০০৮ সালের প্রথম ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিতেই। এই উদ্যোগে আফ্রিকার ৩৪ টি দেশ সরাসরি সুবিধা পেয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে আফ্রিকা বিনিয়োগের দিক দিয়ে ভারত চিনকে অতিক্রম করেও এগিয়ে গেছে। প্রথম দুটি ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনের পর আফ্রিকাকে ভারতের প্রদেয় ঋণ ৭.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর এই ঋণ আফ্রিকার পরিকাঠামোগত উন্নয়নে এবং দ্বিপাক্ষিক বানিজ্যের বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। একই রকমভাবে আফ্রিকার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও ব্যবহারযোগ্য জমি শুধুমাত্র যে আফ্রিকার উন্নয়নেই সহায়তা করবে, তা নয়, ভারতের ক্রমবর্ধমান চাহিদারও প্রধান উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে মানব সম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আফ্রিকায় দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নানা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরন, বস্ত্র, ক্ষুদ্র শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি হলে ভারত সহ অন্যান্য দেশে আফ্রিকার রফতানি বাড়বে।
সেই সঙ্গে আমি এটাও যোগ করতে চাই যে, বাজারকে সুংসহত রূপ দেওয়ার জন্য আফ্রিকা যে উচ্চ প্রশংসিত পদক্ষেপ সিয়েছে, এর ফলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে ভারত ও আফ্রিকা যেভাবে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ওঠে এসেছে, আমি আশাবাদী তৃতীয় এই ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনে আফ্রিকার নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই ক্ষেত্রকে আরও উন্নত রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। আমাদের দ্বিপাক্ষিক আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি এর মাধ্যমে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা ও প্রতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রকে আরও অনুকূল পরিবেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি ২০১৫ এর জুলাই মাসে যে নতুন উন্নয়ন ব্যঙ্ক (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক) গঠন করেছে, তা আফ্রিকার দেশগুলিকে কীভাবে সহায়তা করবে?
উত্তর: নতুন উন্নয়ন ব্যাঙ্ক বিশ্বের অর্থনীতি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলার মতো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। প্রথমত, এটা সম্ভবত এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কের সঙ্গে সহযোগিতায় সাম্প্রতিককালে গঠিত বহমুখী আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে পাঁচটি ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিকে সমান অংশগ্রহনে নিয়ে আসা হয়েছে, এধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ নতুন এক পদক্ষেপ। উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ ও অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই এর ঋণদান পদ্ধতি তৈরি হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলির আর্থিক পরিকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটা নতুন এক পথ সুচিত করবে। আমি মনে করি, আফ্রিকা এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পাবে এবং ভবিষ্যতে এই ব্যাঙ্কের আফ্রিকান বিভাগ বা আঞ্চলিক অবস্থান হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী।
প্রশ্ন: আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষের ক্ষেত্রে কৃষি এবং এই সংক্রান্ত কর্মকান্ড কি মৌলিক? ভারতের একটা বড় অংশের মানুষের ক্ষেত্রেও এটা বিশেষ বিষয়। কৃষির পাশাপাশি উন্নয়নকে ধরে রাখতে ভারত কীভাবে আফ্রিকাকে সহায়তা করতে পারে?
উত্তর: পৃথিবীর চাষযোগ্য জমির ৬০ শতাংশই রয়েছে আফ্রিকায়। অথচ পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদনের মাত্র দশ শতাংশই এখান থেকে আসে। আফ্রিকার কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন আফ্রিকাকেই শুধুমাত্র অর্থ, কর্মসংস্থান ও খাদ্য সুরক্ষার দিক দিয়ে উন্নত করবে না, এর মাধ্যমে গোটা পৃথিবীর খাদ্য ভান্ডার হয়ে উঠতে পারবে আফ্রিকা। এই অঞ্চলের বর্তমান অগ্রগতি আফ্রিকার কৃষি ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদেরকে স্থির নিশ্চিত করেছে।
গত কয়েক দশক ধরে কৃষি ও ডেয়ারী ক্ষেত্রে ভারত ভালো সাফল্য অর্জন করেছে| এই দুটো ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে আমরা রয়েছি| কম পুঁজিতে ফসল ভালো করা ও বৈচিত্রপূর্ণ জৈব বৈচিত্রের প্রেক্ষাপটে ভারত সাফল্য পেয়েছে| এদৃষ্টান্ত আফ্রিকার কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হতে পারে| এটাও সত্যি যে, ভারতের বহু কৃষি বিশেষজ্ঞ ১৯৬০ এর সময় থেকেই আফ্রিকার অনেক দেশে কজ করছেন| ভারতে কৃষি-বিষয়ক কোর্সগুলোতে চালু বৃত্তি আফ্রিকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়| আফ্রিকার সাথে আমাদের উন্নয়ন-সহযোগিতার ক্ষেত্রে কৃষির ওপর প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে| এটা অনেক রকম প্রকার নেয়, যেমন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, আফ্রিকায় কৃষি-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা, জলসেচ প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করা| আমরা এখন সামনের দিকে তাকাচ্ছি, ফলে আফ্রিকার সাথে এই ক্ষেত্রগুলোতে আমরা যৌথভাবে কাজ করে যাব| একইসাথে উদ্ভূত সমস্যাসমূহের মোকাবিলা করতেও পদক্ষেপ করব, যেমন – জলবায়ুর সাথে মানিয়ে চলার মতো কৃষি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া| ফসল সংগ্রহের পর প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার শৃঙ্খল তৈরির ওপরও আমাদের নজর দিতে হবে| এব্যাপারে আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোও শোনার জন্য অপেক্ষা করছি|
প্রশ্ন: ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক বর্তমানে বানিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জ্ঞান বিনিময় ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে| আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের কাছ থেকে আরো কি কি আশা করা যেতে পারে?
উত্তর: ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্ক লেনদেনের মধ্যে সীমিত নয়| একই গন্তব্যের দিকে আমাদের অংশীদারি এবং আমাদের জনগনের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতার শক্তির উপর রচিত বিশ্বাসের ওপর তা দাঁড়িয়ে রয়েছে|
আফ্রিকায় আমাদের বন্ধুদের প্রয়োজন ও প্রাধান্য অনুযায়ী ভারত সবসময় কাজ করে যাবে| নতুন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্ত রকমের সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো উদ্ভুত সংকট নিরসনেও আমরা একসাথে কাজ করে যাব| ভবিষ্যৎ কালের জন্য রূপরেখায় আমাদের অংশীদারীমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, লক্ষ্য এবং আমাদের পরস্পরের শক্তি ও সামর্থ্য প্রতিফলিত হবে|
যে সমস্ত ক্ষেত্রের ওপর আমরা আলোকপাত করে যাব তার মধ্যে রয়েছে মানবসম্পদ বিকাশ, প্রতিষ্ঠান স্থাপনা, পরিকাঠামো, স্বচ্ছ শক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ও দক্ষতা বিকাশ| জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং নীল অর্থনীতির সুস্থায়ী বিকাশে আমরা একসাথে কাজ করব|
সামনের বছরগুলোতে আমরা আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে অবশ্যই অনেকটা উপরের স্তরে উন্নীত করব| বিশেষত দক্ষতা বিকাশ, পরিকাঠামোর জন্য সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় ক্ষেত্রে আফ্রিকার সাথে আমাদের উন্নয়ন সহযোগিতার কর্মসূচির সর্বাত্মক পর্যালোচনা ও আফ্রিকার সহযোগীদের সাথে আলোচনাক্রমে করার ভিত্তিতে আমাদের সহযোগিতার সম্পর্ককে আরো কার্যকরী করে তুলব|
প্রশ্ন: বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারে ভারতের দায়বদ্ধতার সাথে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার সদস্য হওয়ার আকাঙ্খার কি কোনো যোগসূত্র আছে?
উত্তর: বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর এতো দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে যা সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি | রাষ্ট্রসংঘের প্রতিষ্ঠার সময়ের অবস্থার সাথে তুলনা করলে বর্তমানে আমাদের সদস্য সংখ্যা চারগুণ দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও অগ্রগতির জন্য আকাঙ্খা অনেকদূর বিস্তৃত| বিশ্ব শক্তি বর্তমানে অধিকতর বন্টিত| আমরা বর্তমানে ডিজিট্যাল সমন্বিত বিশ্ব-দুনিয়ায় রয়েছি, যা বিশ্ব অর্থনীতির চরিত্রকেই পাল্টে ফেলছে| শান্তি ও সুরক্ষার সামনে আগত হুমকি অনেক জটিল, অভাবনীয় ও অসংজ্ঞেয় হয়ে পরেছে| বহু দিক দিয়ে আমাদের জীবনযাপন বিশ্বায়িত হয়ে উঠছে, তেমনি আমাদের পরিচয় ঘিরে ভ্রান্তি রেখাগুলোও বেড়ে উঠছে| হুমকি, সুযোগ-সুবিধে ও চ্যালেঞ্জ-এর অঙ্গনে সন্ত্রাসবাদ, সাইবার ও মহাকাশ সম্পূর্ণ নতুন ক্ষেত্র| জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের সামনে বিরাট সমস্যা হিসেবে উদ্ভুত হচ্ছে| উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নগরায়নের নতুন তরঙ্গের জটিলতাগুলোকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে |
তথাপি, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা, এর প্রতিষ্ঠানসমূহ ও আমাদের মানসিকতা এখনো সেই পরিস্থিতির প্রতিফলন করে চলেছে যা শেষ বিশ্ব যুদ্ধের শেষে কায়েম ছিল| এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের অনেক উত্তম পরিসেবা দিয়েছে, কিন্তু সেগুলোকে নতুন যুগের সাথে আরো কার্যকরী ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে এদের সংস্কার অবশ্যই দরকার| আমাদের সামনে আসতে পারে আরো খন্ডিত এক বিশ্ব এবং আমাদের এযুগের সমস্যা ও পরিবর্তনগুলো মোকাবিলায় আমাদের সম্মিলিত ক্ষমতাও দুর্বল হবে |
একারণেই, ভারত বিশ্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করছে| এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয়ে উঠতে হবে অধিকতর গণতান্ত্রিক, সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিকৃত ও আমাদের বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী| এদের কারোর মধ্যেই সেই চরিত্র দেখা যাবে না, যদি না সেখানে আফ্রিকার কন্ঠ শোনা যায় অথবা মানব সমাজের ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষের বসবাস যেখানে সেই বৃহত্তম গণতন্ত্রের কথা শোনা যায়|
প্রশ্ন: ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে সহযোগিতার প্রশ্নে এই শীর্ষ বৈঠক (আই এ এফ এস-৩য়)সুনির্দিষ্টভাবে কি ফল দেবে ?
উত্তর: আমাদের উদ্দ্যেশ্য হলো, আমাদের সহযোগিতার মনোভাবকে আরও গভীর করে তোলা, আমাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সংহতির ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা| আফ্রিকার নিজেকে নিয়ে তার যে দূরদর্শী চিন্তাভাবনা রয়েছে, যা এজেন্ডা ২০৬৩-র মধ্যে স্পষ্টভাবে ধরা পরে, এর সাথে, আমি বিশ্বাস করি যে, আমদের উন্নয়ন লক্ষ্য ও আন্তর্জাতিক আশা-আকাঙ্খার নিকট সাযুজ্য রয়েছে| আগামী বছরগুলোতে এটাই হবে আমাদের অংশীদারিত্বের ভিত্তি |
দিল্লিতে আয়োজিত ভারত-আফ্রিকা ফোরাম সামিটের মধ্য দিয়ে আমরা আশা করছি যে, আমাদের উন্নয়ন অংশীদারিত্বের জন্য অনেক উঁচু পর্যায়ের ও বিরাট আকারের লক্ষ্যসমূহ স্থির করব| আমাদের লক্ষ্য হলো, গত এক দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে একে আরো কার্যকরী রূপ দেওয়া| অতীতের মতো, আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো আফ্রিকায় আমাদের শরিক দেশগুলোর তাদের উন্নয়নে কর্মসূচিকে বেগবান করতে আমাদের সহযোগ দিয়ে যাওয়া| আমরা অবশ্যই এই সময়ের প্রধান সমস্যাগুলো যেমন খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সুরক্ষার সমস্যা মোকাবিলা করব| আমাদের দেশগুলোর মধ্যে বানিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধিতে উদ্দীপক হয়ে উঠবে এমন অবস্থার সৃষ্টি করব| জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যার মোকাবিলায় আমরা যৌথ উদ্যোগে কাজ করব| সুস্থায়ী নীল অর্থনীতির মতো নতুন ক্ষেত্রের অন্বেষণ ও উপযোগিতা তৈরিতে আমরা কাজ করব| আমাদের পদক্ষেপসমূহের লক্ষ্য হলো জীবনযাত্রার রূপান্তর ঘটাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মহাকাশ বিজ্ঞান ও ইন্টারনেট-যুক্ত বিশ্বের ক্ষমতাকে ব্যবহার করা| এটা এক-সড়কের পথ নয়| আশা করি, আফ্রিকার জীবনের নানা শাখায় সঞ্চারিত অসংখ্য সাফল্যের কাহিনী থেকে আমরা প্রভূত জ্ঞান নিতে পারব |
বিশ্ব মঞ্চে আমাদের যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রের ওপর আমরা বাড়তি গুরুত্ব দেব এবং বিশেষত সামুদ্রিক পথে যোগাযোগ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সহ নিরাপত্তা ক্ষেত্রের সহযোগিতাকে গভীরতর করব |
এই তৃতীয় শীর্ষ বৈঠক, যেখানে প্রথমবারের মতো সমস্ত আফ্রিকার দেশ অংশ নেবে, ভারত-আফ্রিকা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করবে |
SC/AD/DDB
Exchanged views on India-Africa relations with African journalists attending 3rd India Africa Editors Forum. pic.twitter.com/4KJoIYAuEW
— Narendra Modi (@narendramodi) October 23, 2015
Am told over 400 media persons from Africa are coming for @indiafrica2015. This indicates the vitality of the Summit & optimism towards it.
— Narendra Modi (@narendramodi) October 23, 2015
Am hopeful on achieving stronger economic ties between India & Africa. Also hopeful for deeper cooperation in energy, HRD & other areas.
— Narendra Modi (@narendramodi) October 23, 2015