পিএমইন্ডিয়া
এ বছর বাবা বান্দা সিং বাহাদুরের ৩০০তম শহীদ দিবস শুধু পাঞ্জাবেই কিংবা শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের যেখানে যেখানে ভারতীয়রা বসবাস করেন সর্বত্র অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করা হচ্ছে। পাশাপাশি, এখন আমরা এমনই অসংখ্য শহীদের স্মৃতিতে নতমস্তকে শ্রদ্ধা জানাই, আর আপনাদের সকলের সঙ্গে এই মহান যোদ্ধাদের সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই।
আজ আমরা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত কবিতায় বাবা বান্দা সিং-এর ত্যাগ ও আত্মবলিদানের যে কাহিনী শুনলাম, শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, যেন সেই কালখন্ড আমাদের চোখের সামনে সজীব হয়ে উঠেছে। এই কবিতা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, বান্দা বাহাদুর সেই মহাপুরুষের নাম, যাঁর ত্যাগ ও আত্মবলিদানের ঐতিহ্য, সমাজ সচেতনতা, অপরের সুখ-দুঃখের শরিক হয়ে আত্মবলিদানের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের যে ভিত্তি তিনি স্থাপন করে গেছেন, তাঁর ৩০০তম শহীদ দিবসে আজ আমরা তাঁর থেকে প্রেরণা গ্রহণ করব, তাঁকে অনুসরণ করব।
বাবা বান্দা বাহাদুরের বীরত্বের কথা শুধুই পাঞ্জাব কিংবা উত্তর ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বিগত ৩০০ বছর ধরেই তাঁর জীবন আপামর ভারতবাসীর সামনে আদর্শস্বরূপ, প্রেরণাস্বরূপ। আমরা সবাই জানি যে, বান্দা বাহাদুর একজন মহান যোদ্ধা এবং অত্যন্ত সৃষ্টিশীল একজন প্রশাসক হিসাবে ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে রয়েছে। কিন্তু যখন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি তাঁর মানবিক গুণগুলিকেই সকলের সামনে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরেছেন। যুদ্ধের সময় চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বান্দা সিং বাহাদুর সারা জীবনে কখনও এক মূহুর্তের জন্যও নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, এটা কম কথা নয়।
এমন নয় যে, বান্দা সিং সারা জীবন হাতে তলোয়ার ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবন এতো বেশি সংগ্রামের, তাঁর শাসনকাল এতো প্রতিকূলতায় তাঁরা, সেই কঠিন সময়ে নিজের লক্ষ্যে স্থির রয়েছেন যে বীর, তাঁর হাতে তলোয়ার থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার মতে, ইতিহাসে এই মাপের মহাপুরুষ বিরল।
বান্দা সিং বাহাদুরের সাহস, তাঁর কর্তব্য পরায়নতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেরণার উৎস ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর সাহস ও আত্মাভিমান সম্পর্কে কবিগুরুর লেখা প্রতিটি শব্দ আমাদের বাঁচার পথে প্রেরণার উৎস হয়ে উঠে আমাদের যাত্রাপথকে প্রশস্ত করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন বান্দা বাহাদুর সিং-এর জন্ম হয়েছিল, সেই সময়ে দেশ অনেক সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে। আপনার বয়স যতই হোক না কেন, দেশের যে কোনও প্রান্তেই থাকুন না কেন, এই ধরনের উত্থান-পতনের প্রত্যক্ষ প্রভাব সমাজের প্রতিটি অংশে পরিলক্ষিত হয়। বান্দা বাহাদুরজীর শৈশবও সেই প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। তিনি পরিবেশকে দেখছিলেন, বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কখনও মানুষের জীবনে একটি ছোট ঘটনাও তাঁর জীবনের লক্ষ্য স্থির করে দেয়। বান্দা সিং বাহাদুরও কৈশোরে একটি পশু হত্যার পর এতো বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁর এতো আত্মগ্লানি হয়েছিল যে তাঁর জীবনে বৈরাগ্য আসে।
আমরা ভগবান বুদ্ধের কথা শুনেছি। দুই ভাই অরণ্যে গিয়ে একজন পাখি মারার পক্ষে অন্যজন তাকে বাঁচানোর পক্ষে মত দেয়। যিনি বাঁচাতে চেয়েছিলেন, সেই সিদ্ধার্থই পরবর্তী সময়ে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। বান্দা বাহাদুর সিং-এর মনেও সেই পশুহত্যার ওপরে বৈরাগ্য আসায় তিনি গুরু গোবিন্দ সিং-এর চরণাশ্রিত হয়ে পড়েন। নান্দেড়ে গুরু গোবিন্দ সিং-এর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, তাঁর পুরোনো জীবন ছেড়ে, সংসার ছেড়ে তিনি শিখ হয়ে যান। ইতিহাসে তাঁকে কখনও মাধব দাস নামে জানা যায়, আর তারপর গুরু গোবিন্দ সিং-এর আদেশে শিখ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার খাতিরে তিনি বান্দা সিং নাম ধারণ করে এক পবিত্র সৈনিক জীবন বেছে নেন। গুরুর প্রতি এহেন সমর্পণ ভারতীয় গুরু-শিষ্য পরম্পরার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে গুরু গোবিন্দ সিং-এর এই শিষ্যটি পরবর্তীকালে হাজার হাজার মানুষের স্বার্থে কেমন করে ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা শুরু করেছিলেন। সমাজের প্রত্যেক অংশের মানুষকে তিনি তাঁর পরিচালনাধীন মহান সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ছত্রপতি শিবাজী যেরকম মহারাষ্ট্রের ছোট ছোট অঞ্চলগুলিকে একসঙ্গে জুড়ে একটি মহান সৈন্যশক্তি গড়ে তুলেছিলেন, বান্দা সিং বাহাদুরও তেমনই সমাজের প্রত্যেক অংশের মানুষকে তাঁর পরিচালনাধীন মহান সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করে সেটিকে একটি মহান সৈন্যশক্তি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এই মহান সংগঠকের তেমন অর্থবল ছিল না, সরকারি সমর্থনও ছিল না। শুধু সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তি সম্বল করে তিনি তাঁর অনুগামীদের এতটাই উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন যে তাঁর একটি ইশারাতেই যে কেউ আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে পড়তো। তাঁর শাসনকালেই পাঞ্জাবের মাটিতে প্রথমবার গরিব কৃষকরা জমির মালিক হন। তাঁর আহ্বান ছিল, যে বীজ রোপণ করবে, চাষ করবে, সে-ই ফসল তুলবে। বান্দা সিং জানতেন যে জমি ও ফসলের অধিকার দিলে তবেই গরিব কৃষকদের উত্থান সম্ভব।তিনি কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষপাতী ছিলেন। আজ যারা সমাজবাদী বিচারধারার চর্চা করেন তাঁরা বান্দা সিং-এর শাসনকালের এক একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সমাজের সাধারণ মানুষদের ক্ষমতায়ন কিভাবে সম্ভব! তাঁদের মনে সামাজিক ও আত্মিক উন্নয়নের ইচ্ছাকে জাগিয়ে তোলা আর সাধারণ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে ভিত্তি করে গোটা দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে এক একেকটি পদক্ষেপ গ্রহণই বান্দা সিং-এর শাসনকালের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি জানতেন, সমাজের প্রত্যেক অংশে উন্নয়ন হলে তবেই দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব। তিনি ভারসাম্যহীন উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে সংস্কার করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে গরিব ও পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত ছিল এবং গরিব মানুষেরা কোনও রকম ভেদভাব মুক্ত ন্যায়বিচার পেতেন।বীর যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও সেই সময়ে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর সমর্পণ আজও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি শাসনের সকল শক্তি শুধুই নিজের হাতে রাখেননি, যুদ্ধকে তিনি প্রশাসনের একটি অঙ্গ বলে মানতেন। তাঁর শাসনকালে প্রচলিত মুদ্রা ও মোহরে নিজের নাম খোদাই না করে, সেগুলিতে গুরুনানকদেব এবং গুরু গোবিন্দ সিং-এর নাম খোদাই করেছিলেন। নিজের নাম কখনও তিনি সামনে রাখেননি। আজকের যুগের রাজনীতির দিকে তাকান, যিনি তলোয়ারের ধার দিয়ে নিজের শাসন কায়েম করেছিলেন, তিনি কখনও নিজের নামের পেছনে ছোটেননি। তাঁর মনের গভীরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি কতটা প্রযত্ন লালন করতেন, তা আমরা অনুভব করতে পারি। আমরা প্রেরণা পেতে পারি।
তিনি এদেশের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে সম্মান করতেন। আজ আমি অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে বলছি, শিখ ইতিহাসের প্রত্যেক পাতাতেই সকল ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং শহীদদের আত্মবলিদানের কথা লেখা রয়েছে। কিন্তু, বাবা বান্দা সিং বাহাদুরের আত্মবলিদান ছিল নজিরবিহীন। একদা বৈরাগী মানুষটি তাঁর গুরুর আদেশের প্রতি এতটাই সমর্পিত ছিলেন যে, তিনি কোনও অত্যাচার বা মৃত্যুকে ভয় পাননি।
এই ৩০০তম শহীদ দিবসের সমাগমে আমি বান্দা সিং বাহাদুরের অতুলনীয় প্রতিভা, অসীম সাহস এবং আত্মবলিদানকে শত শত প্রণাম জানাই। শ্রীগুরু গ্রন্থসাহিবে সংকলিত ভক্ত কবির দাসের ভাষায় বলি –
সুরা সো পেহেচানিয়ে, যো লড়ে দীন কে হেত।
পুর্জা-পুর্জা কর মরে, কবহু না ছোড়ে খেত।।
আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, শ্রদ্ধেয় প্রকাশ সিং বাদলের নেতৃত্বে পাঞ্জাব সরকার ২০১০ সালে চপ্পড় চিড়ীর ঐতিহাসিক ময়দানে ফতহ বুর্জ (বিজয় সৌধ) নির্মাণ করে বাবা বান্দা সিং বাহাদুর এবং তাঁর সঙ্গীদের আত্মবলিদানের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছে, একটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক সম্মান প্রদর্শন করেছে। এই ফতহ বুর্জ শুধু পাঞ্জাব নয়, দেশের যে কোনও প্রান্তে নবীন প্রজন্মের মানুষদের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নবযুবক-যুবতীদের জন্য একটি প্রেরণাস্থল হয়ে উঠেছে।
গত এক বছরে পাঞ্জাব সরকার, শিরোমণি গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটি এবং দিল্লি শিখ গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটি বাবা বান্দা সিং বাহাদুরের ৩০০তম শহীদ দিবস পালনের জন্য অনেক আয়োজন করেছে, আরও অনেক আয়োজন হবে। এই মহাপুরুষকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পাশাপাশি, আমি এই অনুষ্ঠানগুলির জন্যও অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই।
এ বছর আমাদের সৌভাগ্য হবে, দেশের কোটি কোটি মানুষের সৌভাগ্য হবে গুরু গোবিন্দ সিং-এর ৩৫০তম জন্মবার্ষিকী পালনের। ভারত সরকার দেশের প্রত্যেক প্রান্তে এই উৎসব পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বের যেখানেই ভারতীয়রা রয়েছেন, সর্বত্র মানুষ উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে ঐ দিনটি পালন করবেন। এই আয়োজনের জন্য ভারত সরকার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং একটি জাতীয় স্তরের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করবে। যাঁরা ইতিহাস বিস্মৃত হন, তাঁরা কখনও ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন না। তাঁরাই ইতিহাস রচনা করতে পারেন, যাঁরা ইতিহাসকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারেন। সেজন্যই আমরা কোনও মহাপুরুষের ৩০০তম শহীদ দিবস পালন করি আবার কোনও মহাপুরুষের ৩৫০তম জন্মদিবস পালনের কথা ভাবি। এই সুযোগে সেই মহান ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা ও নতুন প্রেরণা গ্রহণ করতে পারি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাবা বান্দা সিং বাহাদুরকে স্মরণের মাধ্যমে তাঁর বীরত্বের পাশাপাশি, ত্যাগ ও আত্মবলিদানের পাশাপাশি, একজন দক্ষ প্রশাসক এবং একজন সমাজ সংস্কারক হিসাবে তাঁর কর্মপদ্ধতিকেও আমরা মনে রাখবো। সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক হবেন। আমি তাঁর শ্রীচরণে প্রণাম জানিয়ে তাঁর জীবন থেকে প্রেরণা নিয়ে সমাজ ও দেশের সেবা করার সংকল্প নিচ্ছি। আজকে এই সমারোহে আসার সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। এজন্য আমি আপনাদের সকলের কাছে অনেক অনেক কৃতজ্ঞ। বাহে গুরুজী কা খালসা, বাহে গুরুজী কী ফতহ।
PG/SB/SB/S
Paid tributes to the great Baba Banda Singh Bahadur Ji at the programme to mark 300th anniversary of his martyrdom. pic.twitter.com/AveitXi7BY
— Narendra Modi (@narendramodi) July 3, 2016
Spoke about how compassion towards poor & welfare of farmers was at the core of Baba Banda Singh Bahadur Ji’s ideals https://t.co/ozWDKRp3nP
— Narendra Modi (@narendramodi) July 3, 2016