Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

লোকসভায় ডঃ বি আর আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্কের শেষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

লোকসভায় ডঃ বি আর আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্কের শেষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

লোকসভায় ডঃ বি আর আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্কের শেষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ

লোকসভায় ডঃ বি আর আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্কের শেষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ


মাননীয় অধ্যক্ষ মহোদয়া,

আপনি এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করেছেন এবং সারা দেশের সামনে সংবিধানের মাহাত্ম্য, উপযোগিতা এবং সংবিধান রচনার প্রেক্ষিতে রচয়িতা মহাপুরুষদের দূরদৃষ্টি নিয়ে সুন্দর বক্তব্য রেখেছেন। আমার বিশ্বাস, আপনার এই ভাষণ সংসদীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণাদায়ী দলিল হয়ে থাকবে। আপনাকে অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই।

সংসদে এই কর্মসূচি নিয়ে যে উৎসাহ দেখা গেছে, প্রত্যেকেই এই আলোচনাকে সমস্বরে স্বাগত জানিয়ে অনুমোদন করেছেন আর নিজের মতো করে সংবিধানের মাহাত্ম্য আর তার প্রতি দায়বদ্ধতাকে যেভাবে আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, সেজন্য আমি সকল মাননীয় সদস্যকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

হয়তো পুরনো অভ্যাসের কারণে অনেকের মনে ভুল ধারনা ছিল যে, প্রধানমন্ত্রী আলোচনার শেষে জবাব দেবেন। আমি সেটা মানি না, এটা তেমন কোনও বিতর্ক নয়, তাই আমিও অন্যান্য মাননীয় সদস্যদের মতোই নিজের মনের ভাবপুষ্প অর্পণ করার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছি। কারণ, এটাই এই আলোচনার আত্মা, কোনও রকম অভিযোগ-পাল্টা জবাব এই আলোচনার আত্মা নয়। এই আলোচনার মূলভাব আমরা, গোটা কক্ষ, দেশের সকল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, আর এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্যও আমরাই। ২৬ জানুয়ারি আমরা প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করি। কিন্তু, ইতিহাসের আরেকটি ঘটনা হল ২৬ নভেম্বর। সেই দিনটাও উদযাপন করতে হবে। এই উদযাপন ২৬ জানুয়ারির মাহাত্ম্যকে কোনওভাবে খাটো করার জন্য নয়। ২৬ জানুয়ারির যে শক্তি, তা ২৬ নভেম্বরে নিহিত, সেজন্যই একে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। এখন প্রত্যেক রাজ্যেরই নিজস্ব বিদ্যালয় পাঠ্যক্রম রয়েছে। কোন্‌ রাজ্যে কোন্‌ কোন্‌ শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে সংবিধান সম্পর্কে পরিচয় দেওয়া হয়েছে জানি না। কিন্তু, আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমাদের যে ‘নাগরিক শাস্ত্র’ পড়ানো হতো, তার মধ্যে ‘সংবিধান পরিচয়’ একটা অংশ ছিল। কিন্তু উঁচু ক্লাসে এসবের বালাই থাকে না। একমাত্র যাঁরা ওকালতি পড়েন, আইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়েন কিংবা রাজনীতিতে যোগদান করেন, তাঁরাই শুধু নিয়মিত সংবিধান চর্চা করেন, এর নানা সংশোধনী সম্পর্কে অবগত থাকেন।

ভারত বৈচিত্র্যময় দেশ। নানা ভাষা, নানা সম্প্রদায় ও নানা ধর্মের মানুষ রয়েছেন। আমাদের সকলকে একসূত্রে গেঁথে রাখার ক্ষমতা এই সংবিধানের রয়েছে। আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তিও সংবিধানে রয়েছে। যে কোনও সমস্যা ও সংকটের সম্মুখীন হলে তার মোকাবিলা করার আলোকবর্তিকাও হল আমাদের সংবিধান। সেজন্য সময়ের দাবি মেনে সংবিধানের পবিত্রতা, সংবিধানের শক্তি এবং এতে নিহিত ধারাগুলি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করার দায়িত্ব আমাদের। ধর্মপালনের মনোভাব নিয়ে কোন্‌ পরিপ্রেক্ষিতে ধারাগুলি রচিত হয়েছে, কোন্‌ মহাপুরুষেরা এই রচনাকর্মে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের দূরদৃষ্টি কিভাবে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জীবনকে সহজ করে তুলেছে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবস পালনের মাধ্যমে সরকারের ভাবনাচিন্তার সংস্কার করা হবে। কোনও কিছুই চূড়ান্ত হয়না, সবকিছুই নিরন্তর বিকাশের প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা এই ব্যবস্থাকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাব? এবার তো বিশেষ উপলক্ষ ছিল, গোটা দেশ যেহেতু বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্মজয়ন্তী পালন করছে, সেজন্য সংসদকে যুক্ত করে এই কর্মসূচি রচিত হয়েছে। আগামীদিনে একে লোকসভায় সীমিত না রেখে জনসভা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। ব্যাপকভাবে দেশের সর্বত্র সেমিনার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা হোক, যাতে প্রত্যেক প্রজন্মের মানুষ অংশগ্রহণ করবেন। সাংসদরা যেমন ইতিবাচক আলোচনা করেছেন, তা থেকে এর মাহাত্ম্য বোঝা যায়। আমরা সারা দেশে অনলাইন প্রতিযোগিতা, ক্যুইজ ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে সংবিধান চর্চাকে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিতে চাই, প্রতিটি স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এই চর্চায় যুক্ত করতে চাই।

আমি লালকেল্লার প্রাকার থেকে একটি কথা বলেছিলাম, একবার সংসদেও বলেছিলাম, আমার আগে কোনও প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লা থেকে একথা বলেছেন কি না জানি না, বলে থাকলে তাঁকে আমার প্রণাম জানাই, আমি বলেছিলাম, দেশে অদ্যাবধি যে কটি সরকার গঠিত হয়েছে, যত জন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, প্রত্যেকের চেষ্টাতেই দেশ এগিয়েছে। আমি আবারও বলছি, এই দেশ অনেক মনীষীর তপস্যার ফলে আজকের জায়গায় এসে পৌঁছেছে। প্রত্যেক সরকারের অবদান রয়েছে। হ্যাঁ, অভিযোগ থাকতেই পারে, গণতন্ত্রে যে কারও অভিযোগ করার অধিকার রয়েছে।কে কম করেছেন আর কে বেশি করেছেন, তার তুলনাও হতে পারে। কিন্তু, কেউ একথা বলতে পারবেন না যে, পূর্ববর্তী কোনও সরকার কিছু করেননি। আজ আমি বলবো, এই দেশ গঠনে পূর্ববর্তী রাজা-মহারাজাদের অবদানও কম নয়। তা ছাড়া, কোটি কোটি মানুষ, শ্রমিক, কৃষক, গরিব মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রম দিয়ে এই দেশ গড়ে উঠেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিক্ষক, আচার্যরা তাঁদের ভূমিকা পালন করে গেছেন। আমাদের দায়িত্ব তাঁদের অবদানের ঋণ স্বীকার করা, তাঁদেরকে প্রণাম জানানো।

সংবিধান প্রত্যেকের ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এক কথায় বললে ভারতের সংবিধান ‘প্রত্যেক ভারতীয়র অস্মিতা’ এবং ‘ভারতের একতা’– এই দুই মূল মন্ত্রকে সাকার করেছে। সাধারণ মানুষের আত্মসম্মান আর দেশের একতা ও অখন্ডতা। বাবাসাহেব আম্বেদকরের নেতৃত্বে এই সংবিধান রচিত হলেও তাঁর প্রত্যেক সহযোগীর অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের সকলের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমাহার ভারতের সংবিধান। তাঁদের সকলের প্রতি আমাদের প্রভূত ঋণ রয়েছে, তাঁদেরকে প্রণাম জানাই।

২০০৯ সালে সংবিধানের ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। আমি যখন একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন এই ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের সংবিধানকে একটি সুসজ্জিত হাতির পিঠে রেখে শোভাযাত্রা করেছিলাম। আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সেই হাতির সামনে পায়ে হেঁটে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। সংবিধানের মাহাত্ম্যকে গুজরাটের সাধারণ মানুষের মনে ছড়িয়ে দিতে এ ধরনের উদযাপনের পরিকল্পনা। আমাদের প্রত্যেকের উচিত, এই সংবিধানের মূল্যকে মন থেকে গ্রহণ করা। বিশেষ করে, যাঁরা জনপ্রতিনিধি হয়ে দেশের সেবার দায়িত্ব পেয়েছেন।

আজ আমাদের রাজনৈতিক দলের প্রতি ভক্তি এত তীব্র হয়ে উঠেছে যে, সংবিধান তো দূরের কথা, তার মধ্যে যে ছবিগুলি আঁকা রয়েছে সেগুলি সম্পর্কেও আমরা সহমত পোষণ করি না। সুযোগ পেলে কেউ হয়তো সেই ছবিগুলি বিরুদ্ধে ও ব্যবহৃত রং-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবেন। অথচ, একবার ভেবে দেখুন, ঐ মহানব্যক্তিত্ব মাত্র তিন বছরের পরিশ্রমে এই সংবিধান রচনা করেছেন। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশের সংবিধান রচনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যে দেশে বিশ্বের জীবিত ১২টি ধর্মের প্রত্যেকটির অনুগামী নাগরিক রয়েছেন, প্রতিটি ধর্মই এদেশে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়, যে দেশে ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন ২২টি ভাষা রয়েছে আর রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০-রও বেশি উপ-ভাষা। আস্তিকদের পাশাপাশি নাস্তিকরাও রয়েছেন। প্রকৃতি প্রেমিকদের পাশাপাশি, তেমন ভক্তরা রয়েছেন, যাঁরা পাথরেও পরমাত্মা দর্শন করেন। এহেন বৈচিত্র্যময় দেশের মানুষের অভিব্যক্তি কী হবে তাঁদের আশা-আকাঙ্খা কেমন হবে, এমনই সকল নাগরিকের কথা মাথায় রেখে একসঙ্গে বসে সংবিধান রচনা করা সহজ কাজ না। আমরা আজ একটি আইন পাশ করতে গেলে কত প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হয়, তারপর আইন প্রণয়ন করার পর দেখা যায়, পরবর্তী অধিবেশনেই আমাদের নতুন করে দু-একটি শব্দ যুক্ত করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সংবিধান নির্মাতারা কতটা তপস্যা করেছেন যে, প্রায় ৭০ বছর ধরে তাঁদের প্রদর্শিত পথে আমরা এগিয়ে চলেছি।

আমাদের সংবিধান রচনার পর সংবিধান সভার উদ্বোধনী ভাষণে প্রভিশনাল চেয়ারম্যান শ্রীযুক্ত সচ্চিদানন্দ সিনহা যে কথাটি বলেছিলেন, আমি তা উল্লেখ করতে চাই। তিনি আমেরিকার সংবিধান বিশেষজ্ঞ যোশেফ স্টোরির মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, “সংবিধান অমর রাখার জন্য রচিত, যদি মনুষ্য রচিত উপায়-সমূহ এই গন্তব্যে পৌঁছনোর আশা রাখতে পারে”!

আমরা বাবাসাহেব আম্বেদকরের দূরদৃষ্টি সম্পর্কে ধারনা করতে পারি। কেউ যদি সরকারকে আক্রমণ করতে চায়, তা হলেও বাবাসাহেবের উদ্ধৃতি কাজে লাগে, আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্ধৃতি কাজে লাগে। কেউ নিরপেক্ষ বক্তব্য রাখতে চাইলে বাবাসাহেবের উদ্ধৃতি বেছে নিতে পারেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে স্থান-কাল নির্বিশেষে যাঁর উদ্ধৃতি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভারতীয় নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা করে, তা হলেই বুঝুন, তিনি কত বড় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। আমার ধারনা আজ থেকে ১০০ বছর পরেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তাঁকে আমার অসংখ্য প্রণাম।

ভারতের সংবিধান সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে গ্র্যান ভিলে অস্টিন বলেছিলেন, “এটি একটি সামাজিক নথি”। সাধারণত, সংবিধান আইনি দস্তাবেজ হয়, সরকার কিভাবে চালাতে হবে, সংসদ কিভাবে পরিচালিত হবে – এই সব কিছু লেখা থাকবে। আমি কারও সমালোচনা করছি না, আমার মনে হয়, ভারতের সংবিধান রচনার সময়, নেতৃত্বে বাবাসাহেব আম্বেদকর না থাকলে, আমাদের সংবিধান হয়তো দেশ ও সংসদ পরিচালনার আরও অনুকূল হতে পারতো, কিন্তু তা সামাজিক দস্তাবেজ হয়ে উঠতো না। যিনি বাবাসাহেব আম্বেদকরের মতো দুঃখ-যন্ত্রণা-শোষণ-নিপীড়নের যাতনা সহ্য না করেছেন, তাঁর পক্ষে এ ধরনের সামাজিক দস্তাবেজ রচনা সম্ভব নয়।

আমরা সবাই মানুষ, দোষ-ত্রুটি সকলেরই থাকে। কিন্তু, কোনও ভুল হয়ে গেলে, কোনও শব্দ কারও মনে আঘাত দিলে দীর্ঘদিন তা কষ্ট দিতে থাকে। এটাই আমাদের স্বভাব। আপনারা কল্পনা করতে পারেন, এক দলিত মায়ের সন্তান, যিনি জন্ম থেকে শুধু উপেক্ষা ও বঞ্চনার যাতনা সহ্য করেছেন, অপমানিত হয়েছেন, তাঁর হাতেই যখন দেশের ভবিষ্যৎ দস্তাবেজ রচনার নেতৃত্ব আসে সেখানে সেই অপমান ও অত্যাচারের প্রতিশোধ স্পৃহা প্রতিফলিত হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, বাবাসাহেব আম্বেদকরের মন এত উঁচু ছিল যে, তাঁর নেতৃত্বে রচিত সংবিধানে কোনও রকম প্রতিশোধ ভাবনার ছিটেফোটাও নেই। সেই মহাপুরুষ নীলকন্ঠের মতো সকল বিষ পান করে দেশবাসীর জন্য অমৃত রেখে গেছেন। তাঁর জন্য একটি সংস্কৃত শ্লোক মনে পড়ে –

স্বভাবম ন জহা ত্যেব সাধুরা আপদ্‌ গতোঅপি সন্‌।

কর্পূরঃ পাবক স্পর্শঃ সৌরভং লভতে তরাম।।

সাধুর আসল পরীক্ষা হয় কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার সময়। কর্পুরকে আগুনের কাছে নিয়ে গেলে সে যেমন ভয় পায় না, নিজে জ্বলতে জ্বলতে সৌরভে সবাইকে মাতিয়ে দেয় – এই শ্লোক দিয়েই শুধু বাবাসাহেব আম্বেদকর’কে বোঝা যেতে পারে। তিনি সংবিধান রচনায় তাঁর জীবনের সকল কষ্ট ও যাতনা, অত্যাচার ও উপেক্ষার প্রতিশোধ নেওয়ার কোনও চেষ্টাই করেননি। সবাইকে যুক্ত করতে, সমাহিত করতে চেয়েছেন। ১৯৪৯-এর ২৬ নভেম্বর বাবাসাহেব আম্বেদকর স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে স্বাধীন ভারতের নাগরিকদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে একটি ভাষণে বলেছেন, “আমরা যদি গণতন্ত্রকে কেবল রূপে নয়, সত্য হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তা হলে আমাদের কী করা উচিত। আমার মতে, সর্বাগ্রে নিজের সামাজিক এবং আর্থিক লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে সংবিধানিক পদ্ধতি দৃঢ়তার সঙ্গে পালন করা উচিত। যে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদ্ধতি রয়েছে, সে ক্ষেত্রে অসংবিধানিকপদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত না। এই পদ্ধতি অরাজকতা ছাড়া আর কিছুই নয়, তাকে শীঘ্রই ত্যাগ করা আমাদের জন্যে মঙ্গল!”

আমি মনে করি, আমরা সবাই গণতন্ত্রের পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছি, আমাদের জন্য সংবিধান “করণীয় অথবা করণীয় নয়’ এই দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেদিন পণ্ডিত নেহরু সংবিধান সভায় এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, আমাদের ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি ডঃ রাধাকৃষ্ণণ তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, “ধর্মম ক্ষত্রস্য ক্ষত্রম” অর্থাৎ ধর্ম রাজাদের মধ্যে সর্বোপরি, প্রজা এবং শাসক উভয়েরই শাসক। এই আইন আমাদের চাহিদা অনুসারে নিজেই নিজের প্রভূ। এখানে ধর্ম বলতে কোনও ধর্মীয় আচরণকে বোঝানো হয়নি, এখানে সংবিধানই ধর্ম। একইভাবে, বাবাসাহেব আম্বেদকর অনুচ্ছেদ ৩৬৮-তে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা আমাদের বুঝতে হবে।

“সংবিধান একটি মৌলিক নথি। এই নথি রাজ্য-সমূহের তিন মূল স্তম্ভ। কার্যপালিকা, ন্যায়পালিকা এবং বিধায়িকার স্থিতি এবং শক্তিসমূহকে পরিভাষিত করে। নাগরিকদের প্রতি কার্যপালিকার শক্তি এবং বিধায়িকাসমূহকেও পরিভাষিত করে। আমরা যেমন করেছি মৌলিক অধিকারের অধ্যায়। বস্তুত, সংবিধানের উদ্দেশ্য রাজ্যের অঙ্গসমূহ সৃষ্টি করা নয়, বরং সেগুলির ক্ষমতাকে সীমিত করা। কারণ, সীমানা থাকলে সেগুলি পুনঃনিরঙ্কুশ হবে। বিধায়িকা যদি কোনও আইন প্রণয়নে স্বতন্ত্র হয়, কার্যপালিকা যদি স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে আর সুপ্রিম কোর্ট যদি স্বতন্ত্রভাবে আইনের ব্যাখ্যা করে, তার পরিণাম হবে অরাজকতা”। বাবাসাহেব আম্বেদকর একথা জোর দিয়ে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে ভারতের ভূতপূর্ব প্রধান বিচারপতি ন্যায়মূর্তি গজেন্দ্র গড়কর বিধি আয়োগের অধ্যক্ষ হিসেবে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন।

“বিধি আয়োগ বিশ্বাস করে, ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশ যেহেতু সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেখানে সর্বোচ্চতার দাবি কেবল সংবিধান স্বীকৃত আইনের মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ, এই দেশে সংবিধানই সর্বোচ্চ। সকল আইনের আইন হল সংবিধান। রাজ্য বিধায়িকা, কার্যপালিকা এবং ন্যায়পালিকা’কে শক্তি প্রদান করে এই সংবিধান। পাশাপাশি, এগুলির সীমাও বেঁধে দিয়েছে সংবিধান। অর্থাৎ, গোটা সংবিধানই স্পষ্ট ও সঠিক। সেজন্যই আমাদের দায়িত্ব এই সংবিধান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা”।

আমাদের জন্য আজ সংবিধান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, আমাদের দেশ বৈচিত্র্যময়। এই বৈচিত্র্যের প্রত্যেক উপাদান,প্রত্যেকের অভিব্যক্তিকে সমান মর্যাদা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আজ আমরা এই গণতন্ত্রের মন্দিরে একত্রিত হয়েছি। কোন্‌ সংকল্প আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে! বাবাসাহেব আম্বেদকর বলেছেন, “আমি অনুভব করি, একটি সংবিধান যত ভালো কিংবা খারাপ হোক না কেন, যাঁরা একে বাস্তবায়িত করবেন, তাঁরা যদি ভালো হন, তা হলে সংবিধান ভালো প্রমাণিত হবে। আর তাঁরা ভালো না হলে অন্যথা প্রমাণিত হবে”। গতকাল ম্যাডাম সোনিয়াজীও এ বিষয়ে বলেছেন। আজও রাজ্যসভায় এই প্রসঙ্গে কথা হয়েছে। সেজন্যই সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এটা ঠিক যে সবকিছু সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অনুসারে বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু, আমাদের এটা ভোলা উচিত নয়, সহমতের পথে চললেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আমরা সহমত এবং বোঝাপড়ার চেষ্টা করি কিন্তু যখন সকল প্রয়াস বিফল হয়ে যায়, তখনই শেষ রাস্তা হল সংখ্যালঘুর মত আর সংখ্যাগরিষ্ঠের মত। সংসদে যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁরা অন্যদের ওপর নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে পারেন না। সেজন্যই সহমতের পথ, বোঝাপড়ার পথ খুঁজে বের করা উচিত। এই ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অটল বিহারী বাজপেয়ী যখন বিদেশ মন্ত্রী ছিলেন, তখন একবার সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট হচ্ছিল, দু’পক্ষই প্রায় সমান সমান ছিল। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী গিরিধরজী তখন লোকসভার সদস্য ছিলেন। বিধানসভায় জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তখনও লোকসভা থেকে পদত্যাগ করেননি। মাঝে ১৫ দিন সময় থাকে। সেই সময়েই বাজপেয়ীজীকে নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হতো। গিরিধরজী ভোট দেবেন কি দেবেন না, তা নিয়ে বিতর্ক হলে অধ্যক্ষ মহোদয় বলেছিলেন, আপনি নিজের অন্তরাত্মার কথা শুনে চলুন। গিরিধরজী অটলজীর সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, সেই একটি ভোটে সেবার অটলজী প্রধানমন্ত্রীত্ব হারিয়েছিলেন। সংবিধানের মহিমা এমনই। অটলজীর সেদিনকার ভাষণ আমার মনে আছে। সেই ভাষণের মাধ্যমে সেদিন যে উচ্চতা থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন, সেকথা আমরা কোনওদিন ভুলতে পারবো না। গণতন্ত্রের উচ্চতাকে তিনি শিরোধার্য করে নিয়েছিলেন।

হাজার হাজার বছরের পুরোনো দেশ আমাদের। কখনও কোথাও দোষ-ত্রুটিও প্রবেশ করে। কিন্তু, আমরা সেই সংকট থেকে আবার উঠে দাঁড়াতে পারি। আমাদের মূল শক্তি, আমাদের হাজার হাজার বছরের পুরনো সমাজ, এখানে একটি ‘অটো পাইলট কোয়ালিফিকেশন অ্যারেঞ্জমেন্ট’ রয়েছে। যখনই দোষ-ত্রুটি বাড়তে বাড়তে যখন আমাদের মাটিতে শিকড় প্রোথিত করে ফেলেছে, তখনই এই সমাজেই জন্ম নেওয়া কিছু মানুষ সেই দোষ-ত্রুটির বিনাশ করার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। সমাজের প্রবল বিরোধিতার মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, দেশের একতা ও অখন্ডতা বজায় রাখতে সময়ের চাহিদা অনুসারে পরিবর্তন এনেছেন।

আমাদের দেশের ধার্মিক ঐতিহ্য অনেক কুসংস্কার বাসা বেঁধেছিল। পুরোহিতদের তান্ডবে সমাজ বিচলিত হয়ে পড়েছিল, তখনই দেশে ভক্তিযুগ আসে। চৈতন্য মহাপ্রভু, মীরাবাঈ কিংবা নরসিংহ মেহতার মতো মহামানবেরা সমাজকে সেই অন্ধকারের যুগ থেকে টেনে বের করেছেন। সমাজ যখন সতীদাহ প্রথা নিয়ে গর্ব করতো, তখন রাজা রামমোহন রায় সেই সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, সতীদাহ প্রথা পাপ, এই পাপ বন্ধ করতে হবে। সমাজও এক সময় সেই পরিবর্তনকে স্বীকার করে নিয়েছে। তেমনই, বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলনের মাধ্যমে বাল্যবিধবাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ হিসেবে বড় করে তুলতে চেয়েছিলেন। বাবাসাহেব আম্বেদকর, জ্যোতিবা ফুলের মতো মহামানবরা দলিত-পীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। মহাত্মা গান্ধী এবং নরসিংহ মেহতা দু’হাত বাড়িয়ে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সমাজ যখন দুর্নীতির চরম শিখরে, তখন জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো মহাপুরুষ সেই খারাপ সময়ের অবসানের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের জন্য সমাজ গর্ব করে। তাঁদের পরিবারকেও গর্বের দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু, কিছু কারণে স্বাধীন ভারতে রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ বদলেছে, আস্থা কমেছে। এটা আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। আমাদের নিজেদের আচরণ ও ব্যবহার পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আস্থাপুনরুদ্ধার করতে হবে। কারণ, এই প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের অনিবার্য অঙ্গ। জনগণের আস্থা না বৃদ্ধি পেলে এই প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হতে পারে না। সব রাজনীতিবিদরাই খারাপ, একথাসমাজে কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু আমি দেশবাসীকে বলতে চাই, এই রাজনীতিবিদরাই এই সদনে বসে নিজেদের ওপর অনুশাসন বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগে আমরা যখন নির্বাচন কমিশনে ফর্ম ভরি, সেখানে নিজের হাতে লিখতে হয় আমার এত সম্পত্তি রয়েছে, আমার বিরুদ্ধে এতগুলি কেস চলছে ইত্যাদি। আগে এরকম কিছু লিখতে হতো না। কিন্তু এই সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসা সাংসদরাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের আত্মসংযম বৃদ্ধির খাতিরে এই পরিবর্তন এনেছেন। নির্বাচনের ব্যয়েরও সীমা বেঁধে দিয়ে তাঁরা কালো টাকার উপর রাশ টেনেছেন। এঁরাই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সর্বসম্মতিক্রমে শপথ গ্রহণ প্রথা চালু করেছেন। আমরা অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম চালু করবো। শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশনকে “ডেইলি অ্যাকাউন্ট” পেশ করার প্রক্রিয়া চালু করবো।

রাজনীতিবিদদের সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্রহিতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা উচিত। কিন্তু, একটা সময় আসে যখন মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, রাজনৈতিক চাপ বাড়তে শুরু করে। এই মাথা ভারি মন্ত্রিসভার হাত থেকে রেহাই পেতে সাংসদরাই আলাপ-আলোচনা করে কোটা সিস্টেম চালু করে। এত শতাংশের বেশি মন্ত্রী হতে পারবে না। সেজন্যই জনগণকে তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর ভরসা রাখতে হবে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টও সিদ্ধান্ত নিয়ে যে, কোনও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। সংসদ এর বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করে এই আদেশ থেকে রাজনীতিবিদদের মুক্ত করতে পারতো। কিন্তু, এই রাজনীতিবিদরাই সুপ্রিম কোর্টের রায়’কে শিরোধার্য করে নিয়েছেন। এজন্য আমাদের গর্ব করা উচিত। এই সংসদে আজও অনেক মহান নেতা রয়েছেন, যাঁরা সংসদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আমি যখন দলের সংগঠনের কাজ করতাম, তখন অনেক টিভি চ্যানেলে বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে হতো। একবার প্রাইম টাইমে আমার সঙ্গে ছিলেন গুলাম নবি আজাদ। দু’জনের মধ্যে ঘোর তর্ক, ঝগড়া ইত্যাদি হয়েছিল। কিন্তু, অনুষ্ঠান শেষ হতেই আমরা একসঙ্গে বসে চা খেয়েছি, অনেক প্রবীন সাংবাদিকও আমাদের সঙ্গে বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন। গুলাম নবিজী তখন তাঁদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, দেখুন ভাই, আমরা যতই পরস্পরের বিরুদ্ধে শত্রুর মতো লড়াই করি না কেন, কোনওদিন সংসদে এসে দেখবেন, আমরা কিরকম এক পরিবারের মানুষের মতো আচরণ করি। আমাদের মধ্যে কত আত্মীয়তা তৈরি হয়। এই পরিবেশ বিগত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সকলের তপস্যায় গড়ে উঠেছে।

একবার রামমনোহর লোহিয়াজী তথ্য দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, পণ্ডিত নেহরুর নীতি ভুল, তা দেশের কোনও কাজে লাগবে না। তখন পণ্ডিত নেহরু উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “সম্মানিত বিরোধী নেতার তথ্যকে আমি অস্বীকার করতে পারি না”! এটাই ছিল সংসদের উচ্চতা। আমরা সত্যনিষ্ঠ হলে দলমত নির্বিশেষে সকল সহ-সাংসদ আমাদের জন্য গর্ব করবেন।

মহাত্মা গান্ধী কখনও সমঝোতা করতেন না। অথচ, আমরা যে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি তাঁদের আস্থা বজায় রাখতে পারি না। আমরা অধিকাংশই শুধু সংবিধানের একটি বিষয়ে সচেতন – আমার কী অধিকার রয়েছে! এই পবিত্র অবসরে আমি লোকসভায় দাঁড়িয়ে দেশবাসীর কাছে প্রার্থনা করছি যে আমরা অধিকার সম্পর্কে যতটা সচেতন, ততটাই যেন নিজেদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হই। নিজেদের দায়িত্ব পালন করি, এটাই সময়ের দাবি। দেশ অধিকার ও কর্তব্যের সমন্বয়ে চলতে পারে। অধিকার এবং সমন্বয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। আমাদের সরকারি আধিকারিকদের যদি কোনও কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা বলেন, আমার কী! এই জবাবের ঋণাত্মক রূপ হল, আমার কিছু না হলে মরুক গিয়ে। দেশের জন্য এই পরিস্থিতি ভালো নয়।মহাত্মাগান্ধীএকটি ভাল কথা বলেছিলেন, “আজ পুঁজিপতি আর জমিদারেরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে শ্রমিকরা নিজেদের হিতের কথা,কৃষক তাঁর অধিকার রক্ষার কথা বলেন। সবাই যদি কেবল নিজের অধিকারের কথা বলেন আর কর্তব্য থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেন, তার পরিণাম হবে অব্যবস্থা আর অরাজকতা। অধিকারের বদলে সবাই যদি নিজের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হন তাহলেই মানবতার ‘রুল অফ অর্ডার’ স্থাপন করা সম্ভব। রাজাদের শাসন করার কোনও ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার থাকে না। কৃষকদেরও কোনও দায় নেই মালিকদের আদেশ পালন করার”। সংবিধান নিয়ে আলোচনার সময়ও গান্ধীজীর এই বাণী আমাদের মনে রাখা উচিত।

এই প্রসঙ্গে ডঃ রাজেন্দ্র বাবু বলেছিলেন, আমরা সবাইকে দারিদ্র্য মুক্ত করা এবং ক্ষুধা ও রোগব্যাধি থেকে মুক্ত করার আশ্বাস দিচ্ছি। তার আগে শোষণ ও সামাজিক ব্যবধানকে সমাপ্ত করতে হবে। আমরা একটি মহান যাত্রাপথে সূচনালগ্নে আশা করি এই যাত্রাপথে সকলের উদার সেবা এবং সহযোগিতা পাবো। পাশাপাশি, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সমর্থন পাবো, সকল ভ্রম থেকে আমাদের রক্ষা করবে এই সংবিধান। এই সংবিধান সহজেই বদলে ফেলা যাবে না। এরকম চিন্তা কারও মাথায় এলে তা হবে আত্মহত্যার সামিল। কারণ, ঐ মহাপুরুষরা যা ভেবেছিলেন, আজকের পরিস্থিতিতে তেমনটি আর কেউ করতে পারবেন না। সেজন্য আমরা যত ভালো করে দেশের গরিব-দলিত-পীড়িত ও শোষিত মানুষদের সেবাকে গ্রহণ করবো তাতেই আমাদের মঙ্গল।

দেশের কোনও অঞ্চল যাতে পিছিয়ে না থাকে, কোনও সমাজ যাতে পিছিয়ে না থাকে সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, শরীরের একটি অঙ্গ অসাড় হয়ে গেলে শরীরকে সুস্থ বলা যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একথা সত্য।

আমাদের সামনে অনেক ভালো সুযোগ রয়েছে, তেমনই অনেক সমস্যাও রয়েছে। যে দেশে ৮০ কোটি মানুষ যুবক – এটা যেমন সৌভাগ্যের বিষয়, তেমনই তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, তাঁদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রতিস্পর্ধাকে অস্বীকার করা যায় না। ভারতের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমাদের বুদ্ধি, সম্পদ, জ্ঞান, ব্যবস্হা এবং সংবিধানকে অস্ত্র করে আমাদের শক্তি যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমাদের সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়ের ব্যবস্থা করা, ন্যায়কে সুলভ ও ত্বরান্বিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গণতন্ত্রের একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হল ‘গ্রিভেন্স রিড্রেসেল সিস্টেম’, তেমনই সামাজিক ন্যায়কে সুনিশ্চিত করার কথা ভাবতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সম্প্রতি লোক আদালতের প্রয়োগ সুফলদায়ক হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের অনেক আরও অনেক কাজ করতে হবে।

বাবাসাহেব আম্বেদকর আরেকটি মহান কাজ করেছেন, তা হল – শ্রমিকদের জন্য দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের সীমা বেঁধে দেওয়া। আমরাও তেমনই শ্রমিকদের ই পি এফ অ্যাকাউন্ট সংশ্লিষ্ট বঞ্চনা দূর করার চেষ্টা করেছি। শ্রমিকরা এক জায়গা থেকে চাকরি ছেড়ে অন্য জায়গায় গেলে তাঁদের ই পি এফ অ্যাকাউন্টে যে টাকা পড়ে থাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ফিরে পায় না। সামান্য টাকার জন্য এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানি কিংবা দূরবর্তী কোনও শহরে ঘুরে সেই টাকা তাঁরা উদ্ধার করতে পারে না। এভাবে সরকারের কোষাগারে ২৭ হাজার কোটি টাকা জমেছে। গরিব মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগারের এই টাকা উদ্ধারের জন্য আমরা প্রত্যেকের জন্য একটি ইউ এন নম্বর চালু করেছি। শ্রমিক এক চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরিতে গেলেও তাঁর এই ইউ এন নম্বর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকবে। সেজন্য আমরা অনলাইন এল আই এন নম্বর চালু করেছি। ফলে, তাঁর টাকা আর মার যাবে না। ই পি এফ ও পেনশনের ক্ষেত্রে আমরা পরিবর্তন এনেছি। কেউ ৭ টাকা কেউ ১০ টাকা কেউ ২৫ টাকা পেনশন পেতেন। আমরাএসে ন্যূনতম পেনশন হাজার টাকা করে দিয়েছি। পাশাপাশি, তাঁদের জন্যও আধার কার্ড-এর মাধ্যমে ‘ডায়রেক্ট বেনিফিট স্কিম’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছি। এই ভবনে একটি আইন প্রণয়ন করা হবে – ‘বোনাস অ্যাক্ট’। এর মাধ্যমে বোনাসের সীমাকে সাড়ে তিন হাজার থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার টাকা করা হবে। এর উর্ধ্বসীমা ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত ক্যাবিনেট অনুমোদন করেছে। এবার সংসদের অনুমোদন পেলে আমাদের শ্রমিকদের জন্য এটি অত্যন্ত লাভদায়ক প্রতিপন্ন হবে। এভাবেই আমরা দেশের দরিদ্র মানুষের স্বার্থে একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছি।

আমার মতে, সরকারের একটাই ধর্ম হয়, তা হল – দেশ সর্বাগ্রে। সরকারের একটাই ধর্মগ্রন্থ হয়, তা হল – দেশের সংবিধান। সংবিধানের শক্তিই দেশকে শক্তিশালী করে। এক্ষেত্রে কোনও দ্বিধা, আশঙ্কাকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতের মূল শক্তি হল ভারতের হাজার হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি এবং জনগণের আত্মিকশক্তি। এই শক্তি দেশকে জঙ্গম করে সমাজকে সক্রিয় রাখে, সংকট থেকে উত্তরণের শক্তি দেয়। অবশেষে, দেশের আদর্শ সম্পর্কে বলবো –

আমার ভারতের আদর্শ – সত্যমেব জয়তে

আমার ভারতের আদর্শ – অহিংসা পরমো ধর্মঃ

আমার ভারতের আদর্শ – একং সদ বিপ্রাঃ বহুধাঃ বদন্তি সত্য

আমার ভারতের আদর্শ – বৃক্ষগুল্মে পরমাত্মা দর্শন

আমার ভারতের আদর্শ – বসুধৈব কুটুম্বকম

আমার ভারতের আদর্শ – সর্ব পন্থ সমভাব

আমার ভারতের আদর্শ – অপ্প দীপো ভবঃ

আমার ভারতের আদর্শ – তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা

আমার ভারতের আদর্শ – সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ
আমার ভারতের আদর্শ –ন ত্বহং কাময়ে রাজ্যং ন স্বর্গং ন পুনর্ভবম্‌ কাময়ে দুঃখতপ্তানাং প্রাণিনামার্তিনাশনম্‌

আমার ভারতের আদর্শ – বৈষ্ণব জন তো তেনে কহিয়ে জে পীডঃ পরায়ী জাণে রে

আমার ভারতের আদর্শ– জনসেবাই প্রভুর সেবা

আমার ভারতের আদর্শ– সহ নাববতু সহ নৌ ভুনক্তু সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বী নাবধীত মস্তু মা বিদ্‌ধিষাবহৈ

আমার ভারতের আদর্শ– মানুষ কর্তব্য করলে ঈশ্বর হয়ে যায়

আমার ভারতের আদর্শ– নারী তুমি নারায়ণী

আমার ভারতের আদর্শ– যত্র নার্যস্তু পুজ্জন্তে রমন্তে তত্র দেবতা

আমার ভারতের আদর্শ– আ নো ভদ্রাঃ ক্রতবো য়ন্তু বিশ্বতঃ

আমার ভারতের আদর্শ– জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী

এই দর্শনকে শিরোধার্য করে আমি আরেকবার সকল সম্মানিত সদস্যদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আপনাদের এই উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই, দেশ আপনাদের কাছে ঋণী থাকবে।

অনেক অনেক ধন্যবাদ।

PG/SB/SB