Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

সংবিধান দিবস উপলক্ষে রাজ্যসভায় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ


রাজ্যসভায় উপস্থিত সকল মাননীয় সদস্যদের সাদর অভিনন্দন জানাই।প্রায় ৫০ জন মাননীয় সদস্য ইতিপূর্বে তাঁদের বিস্তারিত বক্তব্য রেখেছেন।বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এই আলোচনা শুরুর আগে আমি সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলাম।প্রত্যেকেই এই আলোচনাকে সমস্বরে স্বাগত জানিয়ে অনুমোদন করেছেন।এ ধরনের অনুষ্ঠান শুরু করার কৃতিত্ব আমরা দাবি করি না।২০০৮ সালে মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস সরকার এই ২৬ নভেম্বরে সংবিধান দিবস উদযাপন শুরু করেছিল। এটা তারা খুব ভালো কাজ করেছিলেন।সেদিন সকল স্কুলের ছাত্রদের সংবিধানের প্রস্তাবনা পাঠ করিয়েছিলেন।আমি তখন গুজরাটে ছিলাম, মহারাষ্ট্র সরকারের এই উদযাপন আমার খুব ভালো লেগেছিল।এর আগে আমরা ১৫ আগস্ট এবং ২৬ জানুয়ারি উদযাপন করতাম।১৫ আগস্টে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও প্যারেড ছাড়া টিভি চ্যানেল বা ইত্যাদিতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো, খবরের কাগজে তাঁদের অবদান সম্পর্কে নিবন্ধ প্রকাশিত হতো।২৬ জানুয়ারি’তে এত কিছু না হলেও প্যারেড ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন হতো।ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে আমাদের সকলকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায় দেশের সংবিধান।যে কোনও সমস্যা ও সঙ্কটের সম্মুখীন হলে তার মোকাবিলা করার আলোকবর্তিকা-ও আমাদের সংবিধান।ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই সংবিধান সম্পর্কে অবগত করানোর দ্বায়িত্ব আমাদের এর ধারাগুলি কী আর কোন্‌পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলি রচিত হয়েছে, সেগুলির মাধ্যমে কোন্‌কোন্‌সমস্যার সমাধান করতে পারবো, কোন্‌মহাপুরুষেরা এই সংবিধান রচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, পরাধীন দেশে অনেক জটিল সমস্যার আবর্তে থেকেও তাঁদের দূরদৃষ্টি কিভাবে স্বাধীন ভারতের স্বাধীন মানুষের জীবনকে অপেক্ষাকৃত মসৃণ করে তুলেছে তা ওদের সামনে তুলে ধরতে হবে।একে বাদ দিয়ে ভারতাত্মাকে বোঝানো সম্ভব হবে না।আজকের এই অনুষ্ঠান আমরা সেই সংবিধান রচয়িতা মহাপুরুষদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই আয়োজন করেছি।তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে যত ধরণের সমস্যা আসতে পারে সেগুলির কথা ভেবে নিজেদের ক্রান্তদর্শী জ্ঞান একত্রিত করে এই সংবিধান রচনা করেছেন।সেই মহাপুরুষদের মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক দলের কেউ থাকুন বা না থাকুন, রাজনীতি নির্বিশেষে তাঁদের দেখানো পথ অনুসরণ করার দায়িত্ব আমাদের।তা হলেই আমরা দেশকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো, আমাদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন থাকবে।সেজন্য ২৬ নভেম্বরে আমরা নিছকই সংবিধানের ধারায় সীমাবদ্ধ না থেকে তার দর্শনকে অনুভব করবো।সেই মহাপুরুষদের অধিকাংশই ছিলেন কংগ্রেস দলের সদস্য, কিন্তু তাঁদের এই কৃতিত্বের জন্য গর্ব করার হিম্মত আমাদের রয়েছে, আমরা তাঁদের প্রণাম জানাই।

তাঁদের কৃতিকে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে।পাশাপাশি, এই সংবিধান চর্চাকে কিভাবে দেশের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সে সম্পর্কে দলমত নির্বিশেষে আপনাদের সকলের পরামর্শ চাই।সবসময়েই পক্ষ আর বিপক্ষ হয়ে না থেকে কখনও কখনও দেশের স্বার্থে নিরপেক্ষও হওয়া উচিত। সেজন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সংবিধানকে বোধগম্য করে তোলার উত্তরদায়িত্ব যদি আমরা মিলেমিশে পালন করি তাহলে আমাদের দেশের নবীন প্রজন্ম আমাদের ওপর ভরসা হারাবে না।দেশের স্বার্থে সাধারণ নাগরিকের আস্থা অর্জন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমরা যারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দেশের এই সংবিধান মেনেই আমরা আজও যদি তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে দেশের স্বার্থে ইতিবাচক নীতিনির্ধারণ করতে পারি, তা হলেই বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্মজয়ন্তীতে তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা জানান হবে।তাঁকে কারা উপেক্ষা করতেন, উপহাস করতেন এবং পরে বাধ্য হয়ে তাঁকে মেনে নিয়েছেন তা আমরা দেখেছি।লক্ষ্য করবেন, আমি ‘আমরা’ বলছি, ‘আমি’ বলছি না।এটা সময়ের দাবি, বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৫-তম জন্মজয়ন্তীতে আমরা তাঁর মহান কৃতিকে অস্বীকার করতে পারি না।আমরা তাঁকে ও তাঁর সংবিধান রচনায় সাহায্যকারীদের সকলকে শ্রদ্ধা জানাই।

আমরা ছোটবেলা থেকে বাড়িতে শুনেছি, আমাদের সমাজ জীবনে এমনকি লোককথায়-ও বলা হয়, ভালো জিনিস বার বার স্মরণ করা উচিৎ।ভালো সময়েও করা উচিৎ, খারাপ সময়েও করা উচিত। ছেলে গ্রাম থেকে শহরে যাবে, সে যত বড়ই হোক না কেন, তার বাবা-মা এমনকি গ্রামের বয়োঃজ্যেষ্ঠরা তাঁকে নানাভাবে সতর্ক করেন।এটাই আমাদের ঐতিহ্য।এখানে বসে আছেন শ্রদ্ধেয় ডঃ কর্ণ সিং, তাঁর ঝুলিতে এই বিষয়ে হয়তো অনেক সংস্কৃত শ্লোক রয়েছে।কিন্তু, আমাদের এলাকায় বলা হতো –

“করৎ করৎ অভ্যাস কে জরমতি হোত সুজান।

রসরী আবৎ জাত তে সিল পর পড়ৎ নিসান।।“

কুয়ো থেকে দড়ি বাঁধা বালতি দিয়ে জল তোলা হয়, দড়িতে পাথরের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি থাকে না।কিন্তু, সেই দড়ির ঘষায় ঘষায় এক সময় পাথরও ক্ষয়ে যায়।সেজন্য আমাদের সংবিধান উদযাপন করা উচিৎ, উৎসব করা উচিত, তবেই আমরা নাগরিকদের ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে পারবো।শুধুই পরস্পরকে দোষারোপ করে দেশ চলে না।সকলে মিলেমিশে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।সংবিধান আমাদের সেই ঐক্যের শক্তি যোগাতে পারে, দোষারোপের উর্দ্ধে দেশের স্বার্থকে তুলে ধরতে পারে।আমাদের সংবিধান বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রকে যে উচ্চতা প্রদান করেছে, তা আমরা যখন সংবিধান সভা তাদের কাজ করছিল সেই সমইয়ের খবরের কাগজগুলির দিকে তাকালে বুঝতে পারবো।ভারতের সংবিধান প্রণয়নের পরই আমেরিকার প্রসিদ্ধ লেখক গ্র্যানভিল অস্টিন বলেছিলেন, “১৭৮৭ সালের ফিলাডেলফিয়ায় ‘পলিটিক্যাল ভেঞ্চার’জন্ম নিয়েছিল সম্ভবত তারপর সর্বাধিক মহান ‘পলিটিক্যাল ভেঞ্চার’হল ভারতের সংবিধান।

এখানে আমরা যারা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আসি, আমাদের দায়িত্ব জনহিতে নানা আইন প্রণয়ন করা, এই কাজের জন্যেই জনগণ আমাদের নির্বাচিত করে পাঠিয়েছেন।আমরা আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই দূরদৃষ্টি-সম্পন্ন মনীষীদের রচিত সংবিধান আমাদের পথ দেখায়।সেজন্য সবার আগে আমাদের প্রত্যেকের উচিত সংবিধান গড়া এবং তাকে উপলব্ধি করা।তারপর, দলমতের উর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

আমাদের সংবিধান প্রণেতারা ৫০-৬০-৭০ বছর পরেও দেশের মানুষ কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে তা অনুভব করে সেগুলির সম্মুখীন হওয়ার পথ রচনা করে গেছেন।আমরা আজ সর্বসম্মতিক্রমে কোনও আইন প্রণয়ন করলাম কিন্তু দেখা যায় যে, পরের অধিবেশনেই সেই আইনে সংশোধন আনার প্রয়োজন পড়েছে।এখন ভাবুন, কতটা দূরদৃষ্টি থাকলে তাঁদের সৃষ্ট ধারাগুলি আজও প্রাসঙ্গিক।হয়তো আজ থেকে ১০০ বছর পরেও তার মধ্যে অনেকগুলি প্রাসঙ্গিক থাকবে।এই সংবিধান রচনার সময়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরাও নিশ্চই অনেক চাপের সম্মুখীন হয়েছেন।কিন্তু, দেশের কথা ভেবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে সেইসব চাপকে দূরে সরিয়ে ক্রান্তদর্শী সিদ্ধান্তগুলি নিতে পেরেছিলেন।তাঁদের এই দলমতের উর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের স্বার্থে রচনা করা সংবিধান আমাদের সকলের কাছে প্রেরণা-স্বরূপ।আজ যখন আমরা কোনও ধারা রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হই, তখন আমরা কিভাবে নিজেদের ভূমিকা পালন করবো তা আজ এই রাজ্যসভার সকল সদস্য আমি স্মরণ করাতে চাই।আমাদের শাস্ত্রে বলেছে –

“ন সা সভা য়ত্র ন সন্তি বৃদ্ধা,

বৃদ্ধা ন তে য়ো ন বদন্তি ধর্মম্‌।

ধর্মঃ স নো য়ত্র ন সত্য মস্তি,

সত্যং ন তদ্‌য়ৎ ছলম ভ্যুপৈতি।

সংবিধান সভায় নিশ্চয়ই এ ধরণের আলোচনা হয়েছে, যেখানে বৃদ্ধ ছিলেন না, বৃদ্ধদের মধ্যে ধর্ম ছিল না, ধর্ম থাকলেও সত্য ছিল না, তেমন কোনও সভা এহেন সংবিধান রচনা করতে পারে না।আর সেজন্যই আমি মনে করি রাজ্যসভার একটি নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে।তার একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, সংবিধান সভায় তর্কোচ্ছলে শ্রদ্ধেয় গোপালস্বামী আয়াঙ্গার যা বলেছিলেন, তার উদ্ধৃতি আমি আপনাদের শোনাচ্ছি – “গোটা বিশ্বে যেখানেই গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাজ্য ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেই দ্বিতীয় সদনের ফলিত প্রয়োজন অনুভব করা গেছে।আমরা এর উপযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছি, সংসদে উচ্চতম কক্ষের প্রয়োজনীয়তা হল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনার গরিমা বৃদ্ধি, আর যখনই কোনও বিষয় নিয়ে ভাবাবেগ তৈরি হয়, সেই ভাবাবেগ প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত আইন প্রণয়নকে প্রলম্বিত করা।আর, আইনের বিতর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আইনের সংশোধন।এই দুই সদনের সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনও বিবাদ সৃষ্টি হলে বিশেষ করে, অর্থ বিষয়ে কোনও বিভেদ সৃষ্টি হলে লোকসভার সিদ্ধান্তকেই মেনে নেওয়া হবে।সেজন্যই নেহাতই সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে যাতে তাড়াহুড়ো করে কোনও আইন প্রণয়ন না হয়, তার সবদিক দেখে রাজনৈতিক বিবাদের উর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রহিতে আইন প্রণীত হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই রাজ্যসভার প্রয়োজন রয়েছে।এর মাধ্যমে আমরা অভিজ্ঞ মানুষদের জ্ঞানের কষ্টিপাথরে সিদ্ধান্তকে যাচাই করে নিতে পারি।সেজন্যই আমার মনে হয়, আমাদের মধ্যে অধিকাংশই এমন রাজ্যসভা নির্মাণের পক্ষে, যা আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনের প্রতিবন্ধক না হয়ে ওঠে”।আমার মতে রাজ্যসভার জন্য এই উদ্ধৃতি থেকে বড় আলোকবর্তিকা আর কিছু হতে পারে না।

এই বিষয়ে আলোচনার সময় পণ্ডিত নেহরু একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন।তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সংবিধানের সফল বাস্তবায়ন যে কোনও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মতো উভয় সদনের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা নির্ভর।আর, সেজন্যই আমরা কিভাবে মিলেমিশে সরকার চালাবো, সেটাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।উভয় কক্ষের অভিজ্ঞ মানুষেরা, বরিষ্ঠ মানুষেরা রয়েছেন।তাঁরা প্রত্যেকেই ন্যায়-ধর্মের কথা বলেন।আর, যেখানে সত্য নেই, সেখানে ন্যায় থাকতে পারে না।ছল, কপট ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না”। আমি মনে করি, তাঁর এই বক্তব্য আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখতে হবে।

দেশবাসী আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।সময় এমন বদলে গেছে, এখন দেশবাসী আমাদেরকে কোন্‌দৃষ্টিতে দেখেন, তা আমরা সকলেই ভালোভাবে জানি।তবুও আমরা যদি নিজেদের দায়িত্ব সঠিকাভাবে পালন করি, সংবিধানকে অনুসরণ করি তা হলে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবো।আমাদের শাস্ত্রে বলেছে –

য়দ য়দ আচরতি শ্রেষ্ঠঃ তত্ত দেবতরো জনাঃ

সঃ য়ৎ প্রমাণম পুরুতে লোকস তৎ অনুবর্ততে।

শ্রেষ্ঠ মানুষেরা যে রকম আচরণ করেন, সেটাই অন্যরা অনুসরণ করেন।তাঁরা যে মাপদণ্ড নিশ্চিত করেন, অন্যরা সেই মানক মেনে চলেন।

১৯৪৬ সালে বাবাসাহেব আম্বেদকর এডমান্ড বার্ক’কে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, “ক্ষমতা প্রদান করা খুবই সহজ, কিন্তু জ্ঞান বিতরণ অত্যন্ত কঠিন।শক্তি হাতে নেওয়া যতটা সহজ বুদ্ধি এবং বিবেককে ঐতিহ্যের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা ততটাই কঠিন।আসুন, আমরা সকলেই নিজেদের আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ করি যে, এই সভা আপনাদের যে সার্বভৌম শক্তি প্রদান করেছে বুদ্ধি ও বিবেকের মাধ্যমে সেগুলির ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ করবো।তবেই আমরা এপথে সকলে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবো।ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ”।

শ্রদ্ধেয় সভাপতি, আমাদের সংবিধান রচয়িতারা অনেক বিষয়েই ভেবেছেন, শুধু একটা বিষয় ভাবেননি।কারণ, তাঁরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু, সময়ের দাবি মেনে আমাদের উভয় সদনের জন্য ‘এথিক্স কমিটি’গড়ে তুলতে হয়েছে।আমি কারও সমালোচনা করছি না, আমরা যাঁরা রাজনীতি করি, তাঁদের কিছু দায়িত্বও পালন করতে হয়।আমাদের কোনও সদস্য যদি ছোটখাটো ভুল করেন, তা হলে তাঁকে শুধরানোর স্পর্ধা সংসদের রয়েছে।এটা খুবই জরুরি, সেজন্যই সকল সদস্যদের এই এথিক্স কমিটি প্রণয়নের কারণ এবং তার সিদ্ধান্তগুলি সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত। সংসদে কি ধরণের আচরণ করা উচিত, যাতে আমরা কোনও ভুল না করে বসি, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেককেই সচেতন থাকতে হবে।১৯৪৭-এর ১৪ আগস্টে ডঃ রাধাকৃষ্ণণ বলেছিলেন, “আজ রাতের পর যখন সকাল হবে সেই মূহুর্ত থেকে আমরা আর ইংরেজদের দোষারোপ করতে পারবো না, আমাদের প্রতিটি কৃতকর্মের দায়িত্ব আমাদেরই।খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সঙ্গে যুক্ত পরিষেবা সাধারণ মানুষের অন্যান্য চাহিদা পূরণের স্বার্থে স্বাধীন ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের দুর্নীতিমুক্ত না করতে পারলে, স্বজন পোষণ, ক্ষমতার লোভ, সুদ খোর এবং কালোবাজারিদের শিকড় উপড়ে না ফেলতে পারলে এই মহান দেশের স্বাধীনতা কলঙ্কিত হবে।ততদিন পর্যন্ত আমরা স্বচ্ছ প্রশাসন উৎপাদন এবং জীবনের সঙ্গে যুক্ত সকল সামগ্রীর সুবন্টন সঠিকভাবে করতে পারবো না”।এটা আজকের কথা নয়, সেই ক্রান্তির মূহুর্তে তাঁর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আজকের সংকটগুলিকেও অনুভব করতে পেরেছিলেন।আসুন, আমরা সকলে আবার তাঁকে স্মরণ করি, সংকল্প নিয়ে চলতে শুরু করি।এখনও দেরী হয়নি।১২৫ কোটি মানুষের দেশ, তার ৮০ কোটি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নীচে।সেদেশের হতাশার কোনও কারণ নেই।মহাপুরুষদের ঐতিহ্য আর নবীন প্রজন্মের সামর্থ্যকে একত্রিত করে আমরা এগিয়ে যাবো।

ভারতের সংবিধান যে সামাজিক ন্যায়ের কথা বলে, তা মেনে চললে আমাদের সমাজে সাম্য আসবেই। কিন্তু, সমাজ যদি নিজেকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন করার জন্য প্রস্তুত না থাকে, হাজার বছরের অন্ধকার দিকগুলি থেকে মুক্তি পাওয়ার সংকল্প না করে, পূর্বজদের পাপ মোচনের চেষ্টা না করে, তা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা আধুনিক করে গড়ে তুলতে পারবো না।সেক্ষেত্রে বাবাসাহেব আম্বেদকরের সামাজিক ন্যায় ও সাম্যের শক্তি বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব আমাদেরই পালন করতে হবে।

আমরা যখন সর্দার প্যাটেলের কথা ভাবি, ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করতে তাঁর স্বপ্ন ও স্বপ্ন পূরণের কথাও ভাবি।তাঁর ঐক্যের মন্ত্র আমাদের দেশকে আজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।বিচ্ছিন্নতার অনেক বাহানা খুঁজে পাওয়া যায়।কিন্তু, মিলনের সুযোগ খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদের।১২৫ কোটির দেশে আমাদের এক প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তকে যুক্ত করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে।দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতার মধ্যে আমাদের পূর্বজরা বলে গেছেন, ‘রাষ্ট্রীয়ম জাগরীয়ম বয়ম” স্বাধীনতার মূল্য বোঝা যায় আন্তরিক সতর্কতায়।এই আদর্শ আমাদের শিরা ও ধমনীতে প্রবাহিত।এই মন্ত্র নিয়েই আমরা রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও অখণ্ডতাকে সুনিশ্চিত করবো।

আমার মনে একটা পরিকল্পনা রয়েছে।আশাকরি, আপনারা সবাই এই বিষইয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনা দিয়ে সাহায্য করবেন।আমি ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’গড়ে তোলার কথা ভাবছি।এ বিষইয়ে এখনও আমি কোনও নক্‌শা তৈরি করিনি।দেশের মধ্যে আমরা যথেষ্ট লড়াই করে নিয়েছি।দক্ষিণ ভারতের মানুষ ভাবেন, তাঁদের ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু, দেশকে অনুধাবন করে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি পথও রয়েছে।আমি গত ৩১ অক্টোবর সর্দার সাহেবের জন্মজয়ন্তীতে দেশের এক প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অন্য প্রান্তের মানুষের সংযোগ স্থাপনের একটি পরিকল্পনার কথা বলেছিলাম।মনে করুন, ২০১৬ সালে ছত্তিশগড়ের স্কুল-কলেজগুলিতে মালয়ালম ভাষার বর্ণ পরিচয়ের উদ্যোগ নেওয়া আর নিদেনপক্ষে ১০০টি বাক্য লেখার মতো মালয়ালম শেখানোর ব্যবস্থা করা, কেরলের সাহিত্য, ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্য, লোকনৃত্য, লোকগান, হস্তশিল্পের প্রদর্শনী।একইভাবে, কেরলে হিন্দি বর্ণ পরিচয়, ১০০টি বাক্য শেখানোর পাশাপাশি ছত্তিশগড়ের লোকনৃত্য, লোকগান, হস্তশিল্পের প্রদর্শনী ও সাহিত্যপাঠ এক বছর ধরে চলতে থাকলে দুটি রাজ্যের মানুষের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবে বলে আমার মনে হয়।তেমনই উভয় রাজ্যের মানুষ পরস্পরের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরতে গেলে সেই নিবিড়তা একটি সারা জীবনের সম্পর্কে পরিণত হবে।আমাদের বৈষ্ণব গায়করা যখন গান ‘বৈষ্ণবজন তো তেনে রে কহিয়ে’–এই গান কোন্‌ভাষায় লেখা সেটা আমরা ভেবে দেখি না।সেজন্যই আমাদের দেশের প্রত্যেক ভাষার ৪-৫টি ভালো গান গোটা দেশের নবীন প্রজন্মকে গাইতে অভ্যাস করালে দেখবেন সংবিধানের যে ভাবনা সেই ঐক্যের ভাবনাকে আমরা নবীন প্রজন্মে সঞ্চারিত করতে পারবো।

বাবাসাহেব আম্বেদকরের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হল, তিনি শিল্পায়নের পক্ষে ছিলেন।তিনি বলতেন, “দলিত মানুষদের জমি নেই, তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি নয়, শিল্প চাই।শিল্পই একমাত্র সমাজের দলিত, পীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে”।তিনি আরও বলেছিলেন, “দলিত মানুষদের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নির্মাণ রাজ্যের দায়িত্ব।কিন্তু, দেখতে হবে, এতে তাঁরা অন্যান্য সুযোগ থেকে যেন বঞ্চিত না হয়।সকল সরকারি পরিষেবা যেন তাঁদের কাছে পৌঁছায়”।

বাবাসাহেব বলেছিলেন, “কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পুঁজি বিনিয়োগের পাশাপাশি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রের প্রয়োগ, সাফল্য আনতে পারে।অতিরিক্ত শ্রমিকদের অনুর্বর কৃষিক্ষেত্রে কাজে লাগালে উৎপাদন বাড়বে।পাশাপাশি, তাঁদেরকে শিল্প ক্ষেত্রে কাজে লাগালে দেশের শিল্প উন্নত হবে।শিল্প উন্নত হলে বিনিয়োগও বাড়বে।সংক্ষেপে বলা যায়, শিল্পের উন্নয়নই ভারতের কৃষি সমস্যার সর্বাধিক কার্যকরি সমাধান”।তিনি আরও বলেছিলেন, “ভারত একটি চিমটার দুই ফলার মাঝে আটকে পড়েছে।একটি ফলা হল জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর দ্বিতীয়টি কৃষিযোগ্য ভূমি কমে যাওয়া।ফলস্বরূপ, প্রত্যেক দশকে জনসংখ্যার তুলনায় উৎপাদনের ভারসাম্য ঋণাত্মক হয়ে পড়ে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়।শিল্পায়নই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান করতে পারে”।আজ থেকে ৬০ বছর আগে বাবাসাহেব আম্বেদকর যে কথাগুলি বলে গেছেন সেগুলি আজও কত প্রাসঙ্গিক।

শ্রদ্ধেয় সভাপতি মহাশয়, এখন আমি ম্যাক্সমুলার’কে উদ্ধৃত করে বলতে চাই, “গোটা পৃথিবীতে এমন একটি দেশ যদি আমাকে খুঁজে নিতে বলা হয়, যেখানে প্রকৃতি, ধন, শক্তি এবং সৌন্দর্যের মহামিলন ঘটিয়ে সত্যিকরের স্বর্গ রচনা করেছে, তা হলে আমি ভারতের নাম বলবো।যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আকাশের নীচে মানব মস্তিষ্ক কোন্‌দেশে সর্বাধিক সভ্যতার অনুকূল দর্শন রচনা করেছে, যা সভ্যতাকে সকল প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে পথ দেখায়, তা হলেও আমি ভারতের নাম নেব।আমি যদি নিজের মনকে জিজ্ঞেস করি, সেই গ্রীক এবং রোমান, ইহুদি কিংবা জিউস দর্শন কোন্‌সংস্কৃতি থেকে তাদের আদর্শ ও শিক্ষা গড়ে তুলেছে, যা বিশ্ববাসীকে এক সৎ মানুষ হতে সাহায্য করে এবং অবিনশ্বর জীবনের পথে সঞ্চালিত করে তা হলেও আমার মন ভারতের কথাই ভাবে”।

আমরা এই মহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী।আসুন, আমরা এই ঐতিহ্যের জয়গান করি আর সংকল্প গ্রহণ করি, দেশের সংবিধানের আলোয় আমাদের মহাপুরুষদের ত্যাগ ও তপস্যার আলোয় আমাদের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাব, পুনর্নবীকৃত করবো এবং আধুনিক দেশ গড়ে তোলার জন্য সকল সদস্য সমানভাবে অংশগ্রহণ করবো।

আমি আরেকবার সকল সম্মানীত সদস্যদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।সভাপতি মহোদয়’কে ধন্যবাদ জানাই।আর এই সংবিধান চর্চা থেকে যে উত্তম আলোক বিন্দুগুলি প্রকাশিত হয়েছে, সেই আলোয় আমরা আইন প্রণয়ন করবো, সংসদে নিজেদের আচরণকে সংযতভাবে পালন করবো, সমাজকে সত্য ও ন্যায়ের পথে নেতৃত্ব দেব, যাতে আমাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়, সংসদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।আমি আরেকবার বাবাসাহেব আম্বেদকর ও তাঁর সহযোগী মহাপুরুষদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

ধন্যবাদ।

PG/SB/SB