Search

পিএমইন্ডিয়াপিএমইন্ডিয়া

সাম্প্রতিক সংবাদ

বিষয়টিকে সরাসরি পিআইবি থেকে নেওয়া হয়েছে

২৬ জুন, ২০১৯ তারিখে রাজ্যসভায় রাষ্ট্রপতি অভিভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর জবাবি ভাষণ


মাননীয় সভাপতি, নতুন জনাদেশ পাবার পর আজ প্রথমবার রাজ্যসভায় সমস্ত মাননীয় সদস্যদের মাঝে এসে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আগে থেকে অনেক বেশি জনসমর্থন ও বিশ্বাস নিয়ে দেশবাসী আমাদের আরেকবার দেশের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন। আমি সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু এই দ্বিতীয় পর্যায়ের গোড়াতেই আমাদের এই সভার সম্মানিত সদস্য মদনলালজী প্রয়াত হয়েছেন। আমি তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানাই।

রাজ্যসভার প্রত্যেক অধিবেশনে মাননীয় অরুণ জেটলির বাক্‌পটুতা শোনার জন্য প্রত্যেক সদস্য আগ্রহী থাকেন। তিনি এখন চিকিৎসাধীন। আশাকরি, তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলে আবার আমরা তাঁর বাগ্মীতার ছোঁয়া পাবো। নেতা হিসাবে শ্রীমান থাবর চন্দ্র গেহলট সভায় আমাদের সকলের পথ-প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবেন। আমি তাঁকেও অভিনন্দন জানাই। বিগত দু’দিন ধরে যে আলোচনা চলছে, তাতে শ্রদ্ধেয় গুলাম নবী আজাদ, শ্রদ্ধেয় দিগ্বিজয় সিং, আমার বন্ধু শ্রী ডি রাজা, শ্রী ডেরেক ও ব্রায়ান, শ্রী রামগোপাল যাদব, শ্রী মাজিদ মেমন, শ্রী রামদাস আঠওয়ালে, শ্রী টিকে রঙ্গরাজন, শ্রী জেপি নাড্ডা, শ্রী স্বপন দাশগুপ্ত’র মতো প্রায় ৫০ জন মাননীয় সদস্য এই আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সবাই নিজের মতো করে বলেছেন। টক-মিষ্টি-ঝাল-আক্রোশ-ব্যঙ্গ-ইতিবাচক পরামর্শের পাশাপাশি, জনগণের শুভেচ্ছাও। অনেকে ভোটের আগে ময়দানে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পাননি, সেখানে যে রাগ প্রকাশ ছিল, তা এখানে প্রকাশ করেছেন! আর আমাদের বসে তা শুনতে হ’ল।

মাননীয় সভাপতি মহোদয়, এই নির্বাচন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক দশক পর লাগাতার দ্বিতীয়বার পূর্ণ-সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতের জনগণ তাঁদের মনে রাজনৈতিক স্থিরতার প্রতি বিশ্বাস প্রকট করেছেন। এই নির্বাচনে ভোটদাতাদের পরিপক্কতার সুরভি আমরা সবাই অনুভব করেছি। বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে আমরা দেখেছি যে, আমাদের দেশের ভোটদাতারা যেখানে যে দলকেই ভোট দিন না কেন, তাঁরা স্থিরতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত শুভসঙ্কেত।

আমি যখন দলের সাংগঠিক কাজ করতাম, তখন অনেক নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেখেছি, দলের হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করেছি। পরবর্তীকালে, প্রত্যক্ষ জনপ্রতিনিধি রূপেও নির্বাচনে লড়ার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু অনেক কম সময়েই দেখেছি যে, জনগণ নিজেরা নির্বাচনে লড়ছেন। ২০১৯ – এর নির্বাচন তেমনই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জনগণের রাজনৈতিক লড়াই ছিল। আমাদের প্রথম পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে জনগণ যেমন নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, এবারের নির্বাচনের দায়িত্ব তেমনই তাঁরা নিজেরা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। যাঁরা সরকারি প্রকল্পগুলির মাধ্যমে উপকৃত হননি, তাঁরাও অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে বলছিলেন যে, অমুক পেয়েছেন – আমিও পাবো! এই বিশ্বাসই এবারের নির্বাচনে এই পরিণাম এনে দিয়েছে। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে আপামর জনগণের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ এবং তাঁদের আশীর্বাদ গ্রহণের সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

মাননীয় সভাপতি মহোদয়, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের গণতন্ত্রের এই পরিপক্কতা গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি আন্তর্জাতিক মূল্য রয়েছে। কিন্তু সেই সময় নিজেদের ভাবনার সীমাবদ্ধতা ও বিকৃতির ফলে এত বড় জনাদেশ পাবার পর যখন কেউ বলেন যে, আপনারা নির্বাচনে জিতেছেন ঠিকই, কিন্তু দেশ নির্বাচনে হেরে গেছে। আমি মনে করি …… এত বড় দেশের গণতন্ত্রে, দেশের জনগণের জন্য এরচেয়ে বড় অপমান আর কিছু হতে পারে না! আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, তাহলে কি ওয়ানাডেও ভারত হেরেছে? রায়বেরিলি, বহরমপুর, তিরুবনন্তপুরম কিংবা আমেথিতেও কি ভারত হেরে গেছে? কংগ্রেস হারলেই কি ভারত হারে? মানে বলতে চাইছেন, কংগ্রেস মানেই দেশ – অহঙ্কারের একটা সীমা থাকে! যাঁরা ১৭টি রাজ্যে ৫৫ থেকে ৬০ বছর সরকারে থাকার পর একটিও আসনে জিততে পারেননি, তাঁদের অহঙ্কারই থাকা উচিৎ নয়। আর বলে দিলেন দেশ হেরে গেছে।

আমি মনে করি, এরকম বক্তব্য রেখে তাঁরা ভোটদাতাদের মনে কষ্ট দিয়েছেন, তাঁদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। গণতন্ত্রে এটা মেনে নেওয়া যায় না। সমালোচনাকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু ভোটদাতাদের এরকম অপমান আমাকে খুব কষ্ট দেয়। ভারতের সংবিধান রচয়িতাদের প্রজ্ঞার কারণে আমি এদেশের পরিপক্ক গণতন্ত্রকে সম্মান করি।

আমরা এবারের নির্বাচনে দেখেছি যে, ৪০-৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জনগণ সারাদিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। ৮০-৯০ বছর বয়সী বয়স্করাও লাঠি হাতে ভোট দিতে এসেছেন। এমন অনেক নির্বাচন কর্মী দায়িত্ব সামলেছেন, যাঁদের কারও মা দু’দিন আগে মারা গেছেন, তাঁদের বাড়িতে অন্য কেউ খুব অসুস্থ, তাঁরা গ্রামে গ্রামে ইভিএম মেশিন নিয়ে পৌঁছে গেছেন, অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও তিতিক্ষার ফল এই নির্বাচন। আর আমরা এই নির্বাচনে ভোটদাতাদের মতামতকে অপমান করবো?

আমরা এর থেকেও এগিয়ে গিয়ে এরকম বলার স্পর্ধা দেখাবো যে, দেশের কৃষকরা বিক্রি হয়ে গেছে! সরকারি প্রকল্পে ২ হাজার টাকা করে কৃষককে দিয়ে ভোট কেনা হয়েছে। এভাবে দেশের কৃষকদের অপমান করা উচিৎ নয়। তাঁরা দেশের জন্য অন্ন উৎপাদন করেন। যিনি এরকম বলেছেন, তিনি দেশের ১৫ কোটি কৃষক পরিবারকে অপমান করেছেন।

আমি অবাক হয়ে শুনেছি যে, তিনি সংবাদ মাধ্যমকেও গালি দিয়েছেন। সংবাদ মাধ্যমও নাকি বিক্রি হয়ে গেছে। একথা কি তামিলনাডু কিংবা কেরলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমি মনে করি, লোকসভা কিংবা রাজ্যসভায় যে কোনও বক্তব্যের একটা গুরুত্ব রয়েছে। আমরা যা খুশি বলে খবরের কাগজের শিরোনাম হতে পারি। কিন্তু ভারতের গণতন্ত্র বিশ্বে যে সমাদর পায়, তার জন্য আমাদের মনে গর্ব থাকা উচিৎ। বিশ্বে ভারতে সমাদর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আমাদের সেই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিৎ নয়। নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের সঙ্গে যখন আমার দেখা হয়েছিল, আমি তাঁদের নিরপেক্ষ থাকতে বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম যে, আপনাদের নিরপেক্ষতাই আমাদের সম্পদ। তা হলেই এই নির্বাচন প্রক্রিয়া বিশ্ববাসীর সামনে ভারতের মাথা উঁচু করে রাখবে।

আপনারা কল্পনা করতে পারেন, ১০ লক্ষ ভোটদান কেন্দ্রে ৪০ লক্ষেরও বেশি ইভিএম মেশিন, ৬৫০টি রাজনৈতিক দল, ৮ হাজারেরও বেশি ভোটপ্রার্থী – কত বিশাল এবং ব্যাপক, আমাদের এই বিষয়টি গর্বের সঙ্গে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরলে বিশ্ববাসী অবাক হবেন! আমি মনে করি, নিজস্ব রাজনৈতিক কারণেই এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে দেশের নারী-সমাজের। আমরা দেখেছি যে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলিতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের ভোটদান ৯-১০ শতাংশ কম থাকতো। এই প্রথমবার এই ব্যবধান আর থাকেনি। এটাও ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে একটি উজ্জ্বল সঙ্কেত। ফলস্বরূপ, আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে দেখেছি যে, এবছর সর্বোচ্চ ৭৮ জন মহিলা সাংসদ হিসাবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।

এবারের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং এনডিএ প্রার্থীরা উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সমস্ত প্রান্ত থেকেই জিতে এসেছেন। হেরে গিয়ে যাঁদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, অহঙ্কার আঘাত-প্রাপ্ত হয়েছে, তাঁরা দেশের জনগণকে অভিবাদন জানাতে পারছেন না। কিন্তু আমি মাথা নত করে ভারতের কোটি কোটি ভোটদাতাদের অভিবাদন জানাই। এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছোট-বড় সমস্ত আধিকারিক, নিরাপত্তা কর্মী এবং নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের ধন্যবাদ ও অভিবাদন জানাই।

মাননীয় সভাপতি মহোদয়, এবার দেখছি একটি নতুন রোগ শুরু হয়েছে – ইভিএম মেশিনের কারচুপি। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি ইভিএম নিয়ে এই প্রশ্ন তোলাকে বাহানা বলে মনে করি। এই সভায় আমাদের দলের মাত্র দু’জন প্রতিনিধি ছিলেন। তখন কথায় কথায় আমাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হ’ত ‘দুই-তিন জন প্রতিনিধি’ বলে। কিন্তু আমাদের কর্মকর্তাদের ওপর ভরসা ছিল। আমাদের বিচারধারার প্রতি আস্থা ছিল, দেশের জনগণের প্রতি ভরসা ছিল এবং অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগের পরাকাষ্ঠা নিয়ে আমরা জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নিয়েছি। অত্যন্ত নিরাশজনক আবহে আস্থার জন্ম দিয়ে আমরা দলকে পুনরুজ্জীবিত করেছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কর্মীরা পরিশ্রমের মাধ্যমে দলের জন্য সাফল্য এনেছেন। এই প্রতিস্পর্ধাই তো নেতৃত্বের মূলধন।

সেই সময় আমরা পোলিং বুথ কিংবা ক্যাম্পে কি হয়েছিল, কেন আমরা হেরে গেলাম – এইসব বিষয় নিয়ে কান্নাকাটি করিনি। হেরে গেলে আবার কাজে লেগে পড়েছি – পুনঃশ্চর্যওম বলে বেরিয়ে পড়েছি। ফলে পরিণামও এসেছে। কিন্তু যখন নিজের ওপর ভরসা থাকে না, সামর্থ্য কমে যায়, তখনই বাহানা খোঁজা হয়। কারণ, যাঁদের আত্মচিন্তন ও দোষ স্বীকার করার প্রস্তুতি নেই, তারাই ইভিএম – এর দোষ দিয়ে নিজেদের কর্মীদের উজ্জীবিত করতে চান যে, তোমরা ভালোই কাজ করেছো, ইভিএম – এর কারণে আমরা হেরে গেছি।

আমার মতে, এভাবে আমরা দলের কর্মীদের কোনও উপকার করি না। তাঁদের নিরাশার অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে কোনও লাভ হয় না। সাহস থাকলে এগিয়ে এসে দলের কর্মীদের আবার প্রস্তুত করুন। আগামী দিনেও নির্বাচন আসবে, এত হতাশ হওয়ার কি আছে! মাননীয় সভাপতি মহোদয়, আমরা অনেক রকম নির্বাচন প্রক্রিয়া দেখেছি। সময়ের সঙ্গে এর বিবর্তনও দেখেছি। ১৯৫২ সালের পর প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ নির্বাচনসম্পন্ন করতে মাসের পর মাস লেগে যেত। ভোটকর্মীরা ভোট বাক্স কাঁধে করে গ্রামে গ্রামে যেতেন। আমাদের তখন বয়স খুব কম ছিল, পুরনো লোকের কাছে শুনেছি। সেই পরিস্থিতি থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচন প্রক্রিয়া সংস্কারের মাধ্যমে আমরা আজকের অবস্থায় এসেছি।

এই সংস্কার একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। পুরনো দিনে নির্বাচনের পর খবরের কাগজের শিরোনামে থাকতো – নির্বাচনী হিংসায় এত জনের মৃত্যু হয়েছে, এতগুলি বুথ দখল হয়েছে। এখন ইভিএম আসার পরও একই রকম শিরোনাম হয় কিন্তু আগের তুলনায় ভোটদানের শতাংশ অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সাফল্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আগে বুথ দখল ও লুঠ করার ক্ষেত্রে মস্তানদের ভূমিকা ছিল। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে নানা সংস্কারের মাধ্যমে এই মস্তানদের ভূমিকা যতটা হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে, গণতন্ত্রও ততটা শক্তিশালী হয়েছে। মস্তান-নির্ভর দলগুলির হেরে যাওয়াও তখন থেকেই শুরু হয়েছে। সেজন্য পুরনো প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার দাবি দেশ ও গণতন্ত্রের পক্ষে সহায়ক হবে না।

মাননীয় সভাপতি মহোদয়, আজ এই সভার মাধ্যমে আমি দেশের জনগণের সামনে একটি কথা বলতে চাই, ১৯৭৭ সালের আগেই ইভিএম – এর মাধ্যমে ভোট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তখন তো আমি রাজনীতিতে ছিলাম না। ১৯৮২ সালে প্রথমবার ইভিএম প্রয়োগ করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালে এই সভায় বসে তৎকালীন সম্মানিত সাংসদরা এই ব্যবস্থাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৯২ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইভিএম সংক্রান্ত নিয়ম তৈরি হয়েছে। এই সমস্ত কাজের জন্য আপনারা এতদিন কৃতিত্ব দাবি করতেন – আমরা করেছি, আমরা করেছি। আর এখন হেরে যাওয়ার পর কান্নাকাটি করছেন। এদেশে এখনও পর্যন্ত ১১৩টি বিধানসভা গঠিত হয়েছে ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে। এতে এখানে উপস্থিত প্রায় সমস্ত দলই কোনও না কোনও সময়ে শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। এই ইভিএম – এর মাধ্যমেই ৪টি লোকসভার জন্য সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। এতেও ভিন্ন ভিন্ন দলের মানুষেরা জিতে এসেছেন। আর আজ হেরে গেছেন বলে এ ধরণের কথাবার্তা বলছেন। ২০০১ সালের পর বিভিন্ন হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টেও ইভিএম নিয়ে মামলা হয়েছে। কিন্তু সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিচারকরা বারংবার এই প্রক্রিয়ার সপক্ষে ইতিবাচক রায় দিয়েছেন।

২০১৭ সালে পরাজিত দলগুলি ইভিএম নিয়ে প্রতিবাদ জানালে নির্বাচন কমিশন তাদের সবাইকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন যে, আপনারা আসুন আর ইভিএম মেশিন-কে ভুল প্রমাণ করে দেখান। যাঁরা আজ ইভিএম – এর সমালোচনা করছেন, কান্নাকাটি করছেন – তাঁরা কেউ সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। শুধুমাত্র দুটি দল গিয়েছিল – এনসিপি এবং সিপিআই। কিন্তু তাঁরা সমালোচনা করেননি, তাঁরা শুধু নির্বাচন কমিশনের কাছে ইভিএম সঞ্চালনার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে চেয়েছিলেন। আর তাঁদের যেসব সন্দেহ ছিল, সেগুলি তাঁরা দূর করেছেন।

আমি মনে করি, এ ধরণের অপপ্রচারের পেছনে নিশ্চিতভাবে কোনও স্বার্থাণ্বেষী গোষ্ঠী রয়েছে। তারা এতই হট্টগোল শুরু করেছিল যে, আমাদের দলের অনেকেও বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। এমনকি আমি নিজেও হয়েছিলাম! আমাদের দল থেকেও আওয়াজ উঠেছিল, কিন্তু আমরা প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি, সততার সঙ্গে সত্যের পথ খোঁজার চেষ্টা করেছি। আজ যাঁরা হল্লা করছেন, তাঁদের কাছেও আমার অনুরোধ, আপনারা প্রযুক্তিকে বোঝার চেষ্টা করুন।

মাননীয় সভাপতি মহোদয়, এরপর ভিভিপ্যাট নিয়েও বারবার মামলা হয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় নির্বচন কমিশনের সামনে হৈ হট্টগোল করে সংবাদ মাধ্যমের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সাধারণ জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে অবিশ্বাসের বাতাবরণ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ভিভিপ্যাট প্রয়োগ করা হয়েছে এবং তা ইভিএম – এর শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমি কংগ্রেস দলটিকে দেখে অবাক হচ্ছি! সেজন্যই বলতে হচ্ছে যে, আপনারা এত বছর ধরে শাসন করেছেন, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আপনাদের এমন কিছু সমস্যা আছে যে, আপনারা নিজেদের জয়কেও হজম করতে পারেন না। স্বাধীনতার পর থেকে এত জয়লাভ করেছেন, কিন্তু সেই জয় হজম করতে পারেননি। আর ২০১৪ সাল থেকে দেখছি আপনারা পরাজয়কেও স্বীকার করতে পারেন না। এটি আপনাদের দলের পক্ষে সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রত্যেক দলের নিজস্ব স্থান ও গুরুত্ব রয়েছে। তাঁদের সমাদর ও সম্মান জানাতে হবে। প্রত্যেক দলকে শুভেচ্ছা জানাতে হবে। তবেই গণতন্ত্র এগোবে। কিছুদিন আগেই মধ্যপ্রদেশে আপনারা জয়লাভ করেছেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এমনসব খবর আসতে শুরু করল যে, আমরা অবাক! তাই দয়া করে দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মতো আপনাদের দলের সংস্কারের কথা ভাবুন।

আমার মনে হয়, আপনাদের দলে খোলা মনে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আপনাদের অনেক বড় বড় নেতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে। তাঁরা প্রায়ই জনান্তিকে বলেন যে, এই রোগ থেকে মুক্তি না পেলে আমাদের হবে না। পাঁচ বছরে একবার নির্বাচন হওয়া উচিৎ, এক – দুই মাস নির্বাচন প্রক্রিয়া চলবে, তারপর সবাই কাজে লেগে পড়বেন। সার্বজনিক রূপে সবাই যদি এই সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে দেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ শুধরাতে পারে। এটাও সময়ের দাবি যে, আমাদের দেশে সর্বত্র একটাই নিয়ম মেনে ভোটদাতাদের তালিকা প্রস্তুত করা উচিৎ।

রাজ্য সরকারগুলি ও কেন্দ্রীয় সরকার মিলেমিশে এমন আইন পাশ করা উচিৎ, যাতে সমস্ত ভোটারই সবকটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। আমার মতে, পঞ্চায়েত নির্বাচনের তালিকা সর্বত্র গ্রাহ্য হওয়া উচিৎ। কারণ, এতে সমস্ত ভোটদাতার নাম থাকে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিটি ভোট মূল্যবান হয়। তেমনই, ভোট কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও প্রত্যেক ভোটদাতার জন্য ভোটদানের ঘর নির্দিষ্ট হওয়া উচিৎ। এ ধরণের সংস্কার ভোট প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সর্বজন গ্রাহ্য করে তুলতে পারে।

শুরুর দিকে আমাদের দেশে লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন একসঙ্গেই হ’ত। সেই প্রক্রিয়ায় ছন্দপতন হওয়ার ফলে আপনারাই সর্বাধিক লাভবান হয়েছেন। সেজন্যই আমরা আবার একসঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তাব রাখায় আপনারা বিরোধিতা করছেন। কিন্তু আপনাদের যুক্তিগুলি অন্তঃসারশূন্য। আপনাদের যুক্তি হ’ল ভোটদাতারা কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষেত্রে একরকম সিদ্ধান্ত কিভাবে নেবেন? মনে করুন, ওডিশায় গ্রামীণ এলাকা বেশি, এখনও ওডিশা দেশের উন্নত রাজ্যগুলির তালিকায় আসেনি। সেই রাজ্যের ভোটাররা কিন্তু লোকসভায় যাঁদের ভোট দিয়েছেন, বিধানসভায় তাঁদের দেননি। এর মানে আমাদের ভোটারদের বিবেক-বুদ্ধি বিবেচনা পুরোমাত্রাতেই রয়েছে। এমন অনেক লোকসভা আসনে বিজেপি জিতেছে, সেই এলাকার সবকটি বিধানসভা আসন বিজেডি জিতেছে। এই পরিপক্কতা আমাদের দেশের ভোটারদের রয়েছে। আমরা তাঁদের অনাদর করছি। কেউ কেউ বলছেন, একসঙ্গে নির্বাচন হলে প্রাদেশিক দলগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তো দেখছি যেখানে যেখানে লোকসভা ও বিধানসভার ভোট একসঙ্গে হয়েছে, সেখানকার বিধানসভায় প্রাদেশিক দলগুলিই জিতেছে। সম্প্রতি অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশার নির্বাচনের ফল দেখুন, দেশের জনগণের বিবেক-বুদ্ধিকে সন্দেহ করবেন না। সেজন্যই সমস্ত সিদ্ধান্ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিৎ। আগে থেকেই হবে না, চলবে না, এরকম হতে দেবো না – এরকম নেতিবাচক আচরণ গণতন্ত্রের অনুকূল নয়। খোলা মনে কথা বলা উচিৎ। প্রত্যেক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাতে হবে। আর সেই প্রচেষ্টায় নিজেদের অবদান রাখতে হবে। কিন্তু আমরা গোড়াতেই দরজা বন্ধ করে দিলে কখনও পরিবর্তন আসবে না। আর আমার মতে, ভারতের ভোটারদের সহজ, সরল বিবেককে কখনও সন্দেহ করা উচিৎ নয়।

আমি ভাবছিলাম, আপনারা কি শুধুই ইভিএম – এর বিরোধিতা করছেন। আমার মনে হয়, তা নয়। আপনারা বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করছেন। আমার মনে পড়ে, এই সভায় আমার গোড়ার দিকের অভিজ্ঞতার কথা। অনেক দিগগজ – জ্ঞানী ব্যক্তির বক্তৃতা শুনেছি। অনেকে তো এমন বক্তব্য রেখেছেন যে, মনে হচ্ছিল – ঈশ্বর বুদ্ধি বিতরণ করার সময়, তাঁরাই প্রথম সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা বলেছেন – ডিজিটাল লেনদেন সম্ভব নয়, গরিব মানুষ কিভাবে ডিজিটাল লেনদেন করবেন, মোবাইল ফোন কিভাবে ব্যবহার করবেন – আমি অবাক হয়ে সেইসব বক্তব্য খন্ডন করেছিলাম।

আমরা গোড়ার দিকে আধার – এর বিরোধিতা করেছি। আপনারা যতদিন শাসন ক্ষমতায় ছিলেন আধার’কে ‘মহান’ বলে গেছেন। আমরা যখন শাসন ক্ষমতায় এসে আধার থেকে দূর্নীতি হ্রাসের চেষ্টা করছি, তখন এই আধার-ই আপনাদের বিপন্ন করে তুলেছে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা গড়িয়েছে। আমরা যদি ভারতকে আধুনিক করে তুলতে চাই, নতুন ভারত গড়তে চাই – তা হলে আমরা কি প্রযুক্তিকে দূরে রাখতে পারি? প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চেষ্টা করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই নিরাপত্তাও আসবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি তা আবিষ্কার করবে। কিন্তু আমাদের প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা উচিৎ নয়।

আপনারা জিএসটি, ইভিএম, ডিজিটাল, ভীম অ্যাপ – সবকিছুরই বিরোধিতা করছেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আপনাদের বিরোধিতার পেছনে রয়েছে নেতিবাচক ভাবনা। আমাকে ক্ষমা করবেন। বিগত পাঁচ বছরে এই সভায় – আমি রাজ্যসভার কথা বলছি, যাঁরা এখানে বিভিন্ন আইন পাশের ক্ষেত্রে বিপত্তির সৃষ্টি করেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে ভালোভাবে কাজ করতে না দিয়ে দেশবাসীকে সাজা দিয়েছেন, তাঁদের এই নেতিবাচক আচরণের জন্যই উভয় সভায় আপনাদের সংখ্যা আরও হ্রাস পেয়েছে। দেশের ভোটদাতারা এখন সব বোঝেন, লক্ষ্য রাখেন। আগামী পাঁচ বছর আপনাদের অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। এটা সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যে, আমরা রাজ্যসভায় দেশের নির্বাচিত সরকারের কাজে কোথায় কোথায় বাধা সৃষ্টি করি, তার জবাব পরবর্তী নির্বাচনে দিতে হয়।

আমি অবাক যে, এখন আপনারা নতুন ভারতেরও বিরোধিতা করছেন। এর কারণ কি? আপনারা যদি বলতেন যে, নতুন ভারত নিয়ে তোমাদের ১০টি উদ্যোগের মধ্যে ৫টি ভুল – তা হলে বুঝতাম। আপনারা তা না করে বলছেন, আমেরিকা এটা করেছে, অমুক দেশ ওটা করেছে – আরে ভাই, আজ কে কি করছে, তা ছাড়ুন। আমাদের দেশ পাঁচ হাজার বছর পুরনো সংস্কৃতির পরম্পরা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বিশ্বে কিভাবে নিজেদের মাথা উঁচু করতে হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

১২৫ কোটি জনগণের দেশ, স্বপ্ন দেখবেই না কেন? আপনারা যদি বলতেন যে, তোমাদের ১০টি উদ্যোগের মধ্যে ৫টি ভুল – তা হলে বুঝতাম। দোহাই আপনাদের দেশকে এভাবে নিরাশার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার পাপ করবেন না। আমরা আপনাদের কাছ থেকে যে কোনও সংস্কারের পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু আপনারা বলবেন, আমাদের নতুন ভারত চাই না – পুরনো ভারত চাই। যে পুরাতন ভারতে একজন নেতা সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে ছিঁড়ে ফেলে দেন, সেরকম পুরাতন ভারত! একজন নেতা বেড়াতে যাবেন বলে গোটা নৌ-বাহিনী তটস্থ হয়ে পড়ে? আমাদের কি সেই পুরাতন ভারত চাই, যেখানে জল, স্থল ও আকাশ দুর্নীতির খবরে সারা দেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। রেলের সংরক্ষণের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, দালালদের সাহায্য নিতে হয়, রান্নার গ্যাস সংযোগের জন্য সাংসদদের বাড়ির বাইরে লম্বা লাইন পড়ে, সাংসদ ২৫টি কুপন নিয়ে পালিয়ে বেড়ান, পাসপোর্টের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, ইন্সপেক্টরদের রমরমা, পিওন-ড্রাইভার-চৌকিদারদেরও ইন্টারভিউ নামক প্রহসনের সম্মুখীন হয়ে দুর্নীতির শিকার হতে হয় – তেমন পুরাতন ভারত চাই?

দেশের জনগণ কিন্তু ভারতকে পুরনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান না। তাঁরা নিজেদের স্বপ্নের দেশ গড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন এবং আমাদের সকলের মিলিত প্রয়াসে সাধারণ মানুষের এই স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করা উচিৎ। আমার পূর্ণ বিশ্বাস যে, আমরা চেষ্টা করলে এই স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।

আমরা চেষ্টা করছি। আগে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, ফিতে কাটা এবং নীতি ঘোষণাকেই সরকারের কাজ বলে মনে করা হ’ত। সমাজের শেষ মানুষটির কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যেন সরকারের দায়িত্ব ছিল না। আমরা এই কর্মসংস্কৃতিকে বদলেছি। নীতি, রণনীতি, বৃত্তি এবং প্রবৃত্তিকে বদলেছি। এর ফলে ….. এখন এখানে দাবি করা হয় – আমরা করেছি, আমরা করেছি। অবশ্যই করেছেন। ইউপিএ জমানায় কি গৃহহীনদের জন্য কি গৃহ নির্মাণ হ’ত না – অবশ্যই হ’ত। তা হলে আমরা নতুন কী করেছি? নতুন হ’ল আমাদের কাজ করার পদ্ধতি। আপনারা পাঁচ বছরে ২৫ লক্ষ বাড়ি বানিয়েছিলেন আর আমরা পাঁচ বছরে দেড় কোটি। আমরা সরকারিকরণ থেকে বেরিয়ে এসে সরলীকরণে জোর দিয়েছি। স্বাধীনতার পর এত বছরে স্বাধীন ভারতের স্বপ্নগুলি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছিল আপনাদের নেতিবাচক আচরণ – অভাব, প্রভাব এবং চাপ। অধিকাংশ মানুষকে অভাবের মধ্যে বেঁচে থাকতে হ’ত, কিছু মানুষ প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের অধিকার হরণ করতেন এবং কিছু লোক চাপের কারণে তাঁদের অনুসরণ করতে বাধ্য হতেন।

দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য সরকারকে অভাবের চিন্তা তো ভাবাবেই। কিন্তু প্রভাব এবং চাপের কারণে দেশের সাধারণ মানুষকে যাতে বঞ্চিত হতে না হয়, তেমন রণনীতি নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমরা সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করছি। পাঁচ বছর আগে কোটি কোটি বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, রান্নার গ্যাসের সংযোগ ছিল না, শৌচালয় ছিল না। তাঁদের ধারণা ছিল, সরকার শুধু বড় বড় কাজ করবে। কিন্তু আমার মতে, ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমেই দেশে পরিবর্তন আসে। ছোট পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিৎ নয়। আমরা ছোটদেরই প্রতিনিধিত্ব করছি। সেই ছোটদের ছোট ছোট সমস্যার সমাধানই বড় পরিণাম আনতে পারে। আমরা এভাবেই কাজ করছি।

আমরা গত পাঁচ বছর ধরে সরকারি ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন-সাধনের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এখন দেশের চাহিদা হ’ল আগামী পাঁচ বছর প্রয়োজন-সাধন থেকে এগিয়ে আকাঙ্খা পূরণ করতে হবে। আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করি। রাজনৈতিক, সার্বজনিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা – সমস্ত ক্ষেত্রে ভারতের সাধারণ মানুষের আকাঙ্খা পূরণের কালখন্ডে রয়েছি। যখন সাধারণ মানুষের মনে আকাঙ্খা থাকে, তখন কাজের গতি ত্বরান্বিত হয়। উন্নয়নের গতি দ্রুত হয়। সেই সৌভাগ্যের সময় এসেছে এবং সেজন্য আমাদের সকলের দায়িত্ব হ’ল, আমরা যে সিদ্ধান্তই নিই না কেন, তা যেন জনগণের সেই আকাঙ্খার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের কাজের গতিকে বৃদ্ধি করার অনুকূল হয়। এটাই সময়ের চাহিদা। আর আমাদের সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে হবে।

অনেক বিরোধিতা করেছেন। শৌচালয় নিয়ে বিদ্রুপ করেছেন। স্বচ্ছতা নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছেন। তেমনই জনধন অ্যাকাউন্ট, যোগ দিবস, মেক ইন ইন্ডিয়া – আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে আপনাদের নেতিবাচক মনোভাব দেশবাসী ভালোভাবেই দেখেছেন। আজও আমাদের রাজ্যসভায় সমর্থন ভিক্ষা করতে হয়, বিদেশ সফরের আগে কোনও বক্তব্য রাখতে হলে সময় ভিক্ষা করতে হয়। কত না অহঙ্কারের সম্মুখীন হতে হয়। যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁরা সবাই জানেন। আমি সবাইকে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু গণতন্ত্রে আমাদের সবাইকেই পরস্পরকে সম্মান করতে হবে।

আমরা জানি যে, এই সভায় আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। সেজন্যই আবেদন রাখছি যে, দেশের জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাকে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করবেন না। মাননীয় সভাপতি মহোদয়, আমরা পাঁচ বছর ধরে লাগাতার সহ্য করেছি। দেশের ক্ষতি হয়েছে, আমাদের কষ্ট হয়েছে। সেজন্য সভাপতি মহোদয়, আমরা আপনার কাছ থেকে নিরাপত্তা চাই। কারণ, দেশের জনগণের আকাঙ্খা পূরণের জন্য লোকসভায় আমাদের অনেক দায়িত্ব দিয়েছেন। রাজ্যসভার ‘ফেডারেল সেক্টর’ও বলে যে লোকসভাকে জনগণের আকাঙ্খার অনুকূল সাহায্য করতে হবে। আমি চাই যে, এই বিষয়ে সুবিচার করবেন।

আমরা যে নতুন ভারতের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছি, দেশকে ৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতিতে নিয়ে যেতে চাই। এখানে বলা হয়েছে যে, ২০১৪ পর্যন্ত ২ ট্রিলিয়ন ছিল, এখনই বলা হ’ল ২.৮০ ট্রিলিয়নে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর এত বছরে ২ ট্রিলিয়ন হয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে প্রায় অর্ধেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি পাঁচ বছরে অর্ধেক বাড়তে পারে, তা হলে আগামী পাঁচ বছরে আরও বেশি বাড়তে পারে। সেজন্য মনের মধ্যে এমন নেতিবাচক ভাবনা রাখা উচিৎ নয় যে, ৫ ট্রিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রা কেন রাখা হয়েছে। এমন লক্ষ্য রাখলে তবেই আমরা সবাই মিলে ছুটবো। যেখানে যেখানে আমাদের দলের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার রয়েছে, সেই রাজ্যগুলিতেও আমরা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। আর যেখানে আপনাদের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার রয়েছে, সেখানে আপনারা চেষ্টা করুন। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করে যদি ৫ ট্রিলিয়ন ক্লাবের সদস্য পারি, তা হলে আমার মনে হয় না এখানে উপস্থিত কেউ দুঃখিত হবেন! সেজন্য ইতিবাচক ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসুন। আমরা তা শোনার জন্য এবং গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। কারণ, একথা মনে করি না যে, ঈশ্বর যখন বুদ্ধি বিতরণ করছিলেন, তখন আমি একাই ছিলাম। আমরা আপনাদের কাছ থেকেও শিখতে চাই। কারণ, আমরা দেশের ভালো চাই।

এখানে উল্লিখিত আরও কয়েকটি বিষয় নিয়ে আমি বলতে চাই। এই সভায় বলা হয়েছে যে, ঝাড়খন্ড গণপিটুনি এবং গণহিংসার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মাননীয় সভাপতি মহোদয়, গণপিটুনিতে মৃত যুবকের জন্য আমরা সবাই দুঃখিত! আর তা হওয়াও উচিৎ। অপরাধীরা যেন কঠিন শাস্তি পায়, সেটা দেখা উচিৎ। কিন্তু শুধুই ঝাড়খন্ড কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা উচিৎ নয়। তা হলে তো সেখানেও যাঁরা ভালো কাজ করেন, তাঁরা ভয় পেয়ে যাবেন। যে অন্যায় হয়েছে, আর যারা অন্যায় করেছে, তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিৎ। কিন্তু সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক লাভ হলেও পরিস্থিতি বদলাবে না।

সেজন্য গোটা ঝাড়খন্ডকে দোষারোপ করার অধিকার আমাদের কারও নেই। ঝাড়খন্ডবাসীরাও দেশের নাগরিক, সেখানেও অধিকাংশ মানুষ সজ্জন ব্যক্তি। অপরাধীদের দমন করতে দেশের সংবিধান ও আইন-ব্যবস্থা রয়েছে। সেজন্য পিছিয়ে পড়লে চলবে না।

বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ মানবতার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। ভালো সন্ত্রাসবাদ, খারাপ সন্ত্রাসবাদ, আমার সন্ত্রাসবাদ, তোমার সন্ত্রাসবাদ – এই বিভাজন মানবতার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। তেমনই হিংসার ঘটনা ঝাড়খন্ডে হোক কিংবা পশ্চিমবঙ্গে, কেরলে হোক কিংবা দেশের অন্য কোথাও – হিংসাকে সমানভাবে সবজায়গায় অপরাধ হিসাবে দেখতে হবে – তবেই আমরা হিংসাকে রুখতে পারবো। তবেই হিংসার আশ্রয় নেওয়া অপরাধীরা শাস্তি পাবে। তারা জানবে যে, এক্ষেত্রে সমস্ত দেশবাসী, সমস্ত রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ – এদেশে এসব কাজ চলবে না। আমার মনে হয়, আমাদের সকলের মিলিতভাবে এই দায়িত্ব পালন করা উচিৎ।

রাজনৈতিক লাভের জন্য অনেক জায়গা আছে। আমরা সেখানে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি। কিন্তু দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তার গ্যারান্টি আমাদের সকলের সাংবিধানিক দায়িত্ব। পাশাপাশি, মানবতার প্রতি আমাদের সংবেদনশীল দায়িত্ব রয়েছে, তাঁকে আমরা কখনও অস্বীকার করতে পারি না। আমরা সেই মনোভাব নিয়েই এগিয়ে চলেছি। পাঁচ বছর আগে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ এই মন্ত্র নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই সময়ের অখন্ড ও একনিষ্ঠ কর্মধারা জনগণের মনে একটি অমৃত সঞ্চার করেছে – সেই অমৃত হ’ল ‘সবকা বিসওয়াস’।

‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিসওয়াস’ – এই অমৃত মন্ত্রেও আমাদের আজাদ সাহেব অস্পষ্টতা দেখতে পারছেন। রাজনৈতিক চশমা পরে তাকালে এই রকম অস্পষ্ট লাগাটাই স্বাভাবিক। সেজন্য আমি মনে করি, রাজনৈতিক চশমা খুলে ফেলে তাকালেই আপনারা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাবেন।

এই সভায় আমাদের অনেক উপদেশ দেওয়া হয়েছে। কখনও খবরের কাগজ থেকেও অনেক কিছু জানতে পারি। কিন্তু মঙ্গলবার করে যখন আমাদের সাংসদদের বৈঠক হয়, আমি এরকম সমস্ত বিসঙ্গতি নিয়ে আক্রোশ ব্যক্ত করি এবং সেগুলি শুধরানোর চেষ্টা করি। এখানে আমাদের বোঝানো হয়েছে যে, অমুক এরকম করেছে, তমুক ওরকম করেছে, নির্বাচনে গোঁজপ্রার্থী দাঁড় করিয়ে অমুককে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলি তো আপনাদের মতো কয়েকটি দলের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সত্য। এমনকি, রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থীকেও এভাবে হারিয়ে দিয়েছেন। বাবাসাহেব আম্বেদকরকে হারানোর জন্য আপনাদের দলে আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছিল। সেজন্য এরকম উদাহরণ দেওয়ার আগে একবার নিজেদের অতীতকে স্মরণ করুন!

যখন দিল্লির পথে গলায় বিদ্যুতের তার ঝুলে শিখদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, আর এই কুকর্মের পেছনে যে মহারথিরা ছিল, তারা আজও আপনাদের অমুক দলে কিংবা তমুক দলের সম্মানিত পদে আসীন, সাংবিধানিক-পদে বিরাজমান। তাই বলছি যে, এরকম উদাহরণ দেওয়ার আগে একবার নিজেদের অতীতকে স্মরণ করুন। রাজনৈতিক জয়পরাজয়ের সঙ্কটের ক্ষেত্রে কাউকে দু-দশ দিনের জন্য দল থেকে বহিস্কার করা আর নির্বাচনের পরই আবার তাদেরকে দলে ফিরিয়ে আনার অনেক উদাহরণ আমি দিতে পারি। এক্ষেত্রে অনেক বড় বড় নাম উঠে আসবে। আর সেজন্য এরকম উদাহরণ দেওয়ার আগে একবার নিজেদের অতীতকে স্মরণ করুন।

আমি মনে করি, সর্বজনিক ক্ষেত্রে আমরা কেউই তেমন কেউকেটা নই যে আমাদের যা খুশি তাই বলবো। আমার দলের সদস্যদেরও বলছি, এ ধরণের কথাবার্তা বলার কোনও অধিকারই আমাদের নেই। আমাদের সার্বজনিক জীবনের নিয়ম মেনে সবাইকে মর্যাদা দিয়ে চলতে হবে। প্রত্যেক দলের সদস্যদেরই বলছি, আর যাঁদের ওপর আমার সবচেয়ে বেশি অধিকার – আমার দলের জনপ্রতিনিধিদের বিশেষভাবে বলছি। আমরা চেষ্টা করলে নিজেদের আরও পরিশীলিত করে তুলতে পারি।

এখানে অনেকের চিন্তা থাকে কৃতিত্ব নেওয়ার। আমরা সমস্ত কৃতিত্ব আপনাদেরই দিতে চাই। আপনাদের কৃতিত্ব ও পরাক্রমের বলেই আমরা আজ এখানে এসেছি, না হলে আমাদের কে জানতেন? কিন্তু আমি জানতে চাই, এখানে যে এনআরসি নিয়ে আলোচনা হ’ল তার কৃতিত্ব কি আপনারা নেবেন না? পালাচ্ছেন কেন ভাই? এটারও আপনারা কৃতিত্ব নিন।

রাজীব গান্ধীর সঙ্গে আসাম চুক্তির ফলেই তো এনআরসি বিষয়টির জন্ম হয়েছে। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এরপর সুপ্রিম কোর্ট যা আদেশ দিয়েছে, আমরা শুধু সেটা বাস্তবায়িত করছি। আপনারা চুক্তি করেছেন আর কৃতিত্ব নেবেন না? ভোট চাই, কৃতিত্বও চাই – সেজন্য অর্ধেক বলবো আর অর্ধেক বলবো না – এসব আর চলবে না। একটু স্পষ্ট করে কথা বলুন। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, সেই সময়ে দেশের স্বার্থে এনআরসি বিষয়ক যে সিদ্ধান্ত সে সময়ে নেওয়া হয়েছিল, তাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে আমরা দায়বদ্ধ। আর আমরা এর জন্য সম্পূর্ণ পরিশ্রম করবো। আমাদের জন্য এটা ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি নয়। দেশের ঐক্য, অখন্ডতা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আমরা এটা করবো।

আমার ভালো লেগেছে যে, এখানে সর্দার সাহেবের উল্লেখ করা হয়েছে। আর যা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে আমি সহমত। আমার কংগ্রেসী বন্ধুরা নাও মানতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি, সর্দার সাহেব যদি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতেন, তা হলে আজ আমাদের জম্মু-কাশ্মীরের সমস্যা ভোগ করতে হ’ত না। আমি এটাও মনে করি, সর্দার সাহেব যদি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতেন, তা হলে ভারতের গ্রামগুলির আজ অন্যরকম ছবি হ’ত। আমার এই ভাবনা ভুল হতে পারে। কিন্তু আমি এটাই মনে করি। কিন্তু সর্দার সাহেব যে ৫০০টিরও বেশি রাজন্য-শাসিত রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন – এটি ঐতিহাসিক সত্য। এক্ষেত্রে কারও কোনও মতভেদ থাকতে পারে না। সর্দার সাহেবকে কংগ্রেস দল দেশের প্রথম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ দিয়েছিল। তিনি সারা জীবন কংগ্রেসের জন্য বেঁচে ছিলেন, লড়াই করেছেন, কংগ্রেসের জন্যই তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

গুজরাটের নির্বাচনের সময় কংগ্রেসের পোস্টারে সর্দার সাহেবের ছবি ছাপা হয়। কিন্তু দেশের অন্য কোথাও তাঁর মতো একজন বিশুদ্ধ কংগ্রেসীর ছবি ছাপা হয় না দেখে আমি অবাক হই। আপনাদের দলেরই ক্ত বড় নেতা ছিলেন, তাঁর ছবি ছাপতে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু আজ আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যে, আমরা তাঁর মূর্তি স্থাপন করেছি, সেটি ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’ বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তি। আমি কংগ্রেসের বরিষ্ঠ নেতাদের অনুরোধ করবো যে, কমপক্ষে একবার গিয়ে সেখানে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসুন। আপনারা বুক ফুলিয়ে সর্দার সাহেবের গুণকীর্তন করুন। আমি চাইবো যে গুলাম নবী মহোদয় কিছুদিন গুজরাটে কাটিয়ে আসুন।

আপনাদের একটা মজার কথা শোনাচ্ছি। আমাদের দেশে পুরনো নিয়ম অনুযায়ী, বড় বড় বাঁধ কিংবা বিমানবন্দরের ছবি তোলা নিষেধ ছিল। এখন মহাকাশ প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে যে কোনও গলিতে দাঁড় করানো স্কুটারের নাম্বার প্লেটের ছবি তোলা যায়। কিন্তু পুরনো আইনগুলি এখনও রয়েছে। বাঁধের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে যখন বাঁধ উপচে জল পড়তো তখন অনেকেই তা দেখতে যেতেন, কিন্তু তাঁদের ছবি তোলার অনুমতি ছিল না। তখন ওখানে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন দিগ্বিজয় সিং। আমি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হলাম, এই নিয়ম বদলানোর অনুরোধ করলাম। এরপর টিকিট চালু হ’ল, পার্কিং – এর ব্যবস্থা হ’ল। ঘোষণা করা হ’ল যে ওখানে ৫ লক্ষতম পর্যটককে সম্মানিত করা হবে। আমি আজ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলছি, সেই ভাগ্যবান ৫ লক্ষতম পর্যটক ছিলেন বারামূলার এক দম্পতি। বিয়ের পর তাঁরা সেখানে গিয়ে ছবি তুলেছিলেন। দেখুন, পরিস্থিতি কিভাবে বদলানো যায়। সেজন্য আমি আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যে, কংগ্রেসের বরিষ্ঠ নেতাদের অনুরোধ করবো যে, কমপক্ষে একবার গিয়ে সেখানে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসুন। একবার সর্দার সাহেবের মূর্তি পদতলে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের আয়োজন করুন। ভালো লাগবে, তিনি তো কংগ্রেসেরই ছিলেন। দেশের মহাপুরুষ হিসাবে তাঁকে যে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো উচিৎ, তা তো আমরা জানাবোই।

আমি অবাক হচ্ছি, আজাদ সাহেব আপনি তো দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। বিজ্ঞাপন এবং সচেতনতা অভিযানের মধ্যে পার্থক্যটা আপনি ভালোভাবেই বোঝেন। বাচ্চাদের হাত ধুঁয়ে খাবার খাওয়ার যে বিজ্ঞাপন তার টাকা সরকারকে দিতে হলেও সেটাকে বিজ্ঞাপন বলা যায় না। আপনি স্বাস্থ্য মন্ত্রী থাকার সময় যখন মহামারি হয়েছিল, তখনও গরম জল ফুটিয়ে পান করা – এরকম নানা উপদেশ দেওয়া সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি ছাপতে হয়েছিল। ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ অভিযানের বিজ্ঞপ্তিকে যদি আপনারা বিজ্ঞাপন বলেন, তা আমি মেনে নিতে পারছি না। এত বছর শাসন ক্ষমতায় ছিলেন, আপনাদের কাছ থেকে এটা আশা করিনি।

আপনাদের সময় মনরেগা নামে এখান থেকে মাটি কেটে ওখানে ফেলার প্রকল্পের পেছনে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হ’ত, তা কিন্তু কোনও সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ছিল না। তবুও সরকারি কোষাগার থেকে টাকা খরচ করা হয়েছে – দেশ এটা কখনও ভুলতে পারে না। কিন্তু বাচ্চাদের হাত ধুঁয়ে খাবার খাওয়ার যে বিজ্ঞাপন তার টাকা সরকারকে দিতে হলেও সেটাকে বিজ্ঞাপন বলা যায় না। এটা না করলে দেশে পরিবর্তন কিভাবে আসবে?

এখানে আয়ুষ্মান ভারত যোজনা নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে লোকসভা ও রাজ্যসভায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাংসদরা কিন্তু এই প্রকল্পকে প্রশংসা করেছেন। তাঁদের এলাকার অসুস্থ ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে তাঁরা চিঠি লিখেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে তাঁরা সাহায্য পেয়েছেন। আমি নিয়ম বানিয়েছিলাম ১০০ শতাংশ। গরিবদের জন্য কোনও কাটছাট করা উচিৎ নয়। আর প্রায় সমস্ত দলের সাংসদরা তখন আমার কাছে এসেছিলেন।

যে সাংসদরা নিজের এলাকার গরিবদের সহায়তার জন্য আমাকে চিঠি লিখেছিলেন, তাঁরা জানেন যে, আয়ুষ্মান ভারত যোজনার শক্তি কি? কিন্তু আজ কাউকে আর চিঠি লিখতে হয় না। সাধারণ মানুষ জেনে গেছেন যে, সরকারি এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হতে আর সাংসদের চিঠির প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যেই ৩০ লক্ষ মানুষ এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন।

হ্যাঁ। আমরা প্রত্যেকেই জনপ্রতিনিধি, এলাকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সেজন্য আমরা যেন কোনও নেতির আশ্রয় না নিই। আসুন, সবাই মিলে চেষ্টা করে পরিস্থিতি বদলাই। কোথাও কোনও ত্রুটি দেখতে পেলে দলমত নির্বিশেষে আপনারা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করুন। আয়ুষ্মান ভারত যোজনাকে আমরা যত সফল করে তুলবো, প্রকৃত অর্থে এদেশের গরিবদের ততটাই আমরা দারিদ্র্য থেকে বাঁচাতে পারবো। এখন যে গরিবরা নব্য মধ্যবিত্তে পরিণত হচ্ছেন, তাঁদের বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে তাঁদের ২০ বছরের পরিশ্রম জলে চলে যাবে। আমরা যদি এই প্রকল্পকে সফল করতে পারি, তা হলে আমরা প্রত্যেকেই একটি অত্যন্ত মানবিক কাজ করবো। সেজন্য সমালোচনা না করে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করুন। কৃতিত্ব আপনারাই নিন। ২০২৪ সালের আগে আমাদের সমালোচনা করার জন্য অনেক কিছুই পাবেন। ততদিন কাজ করুন না!

এই সভায় বিহারে শুরু হওয়া নতুন জ্বর নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এটা অত্যন্ত দুঃখের কথা। স্বাধীনতার পর বিগত ৭০ বছরে সবচেয়ে বড় অসাফল্য এটাই। এই অসাফল্যকে আমাদের প্রত্যেকের গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। আমার মনে হয়, পূর্ব উত্তর প্রদেশের পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। আমি কোনও কৃতিত্ব নিচ্ছি না। কিন্ত পরিস্থিতি অনেক ভালো হয়েছে।

আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে একযোগে টিকাকরণ ও সুরক্ষিত মাতৃত্বের জন্য কাজ করছি। বিহারের ক্ষেত্রেও আমরা ওয়াকিবহাল খবর পেতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রী দ্রুত ছুটে গেছেন এবং আমরা মিলেমিশে পরিস্থিতি শুধরানোর চেষ্টা করছি। পুষ্টি, টিকাকরণ, সুরক্ষিত মাতৃত্ব এবং আয়ুষ্মান ভারত যোজনা সম্পর্কে আমরা যত সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারবো, ততই সাধারণ মানুষকে এ ধরণের সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে পারবো। আজ একটি রাজ্যে যে সঙ্কট এসেছে, কাল অন্য রাজ্যেও তা আসতে পারে, সেজন্য আমাদের আগে থেকে এ ধরণের সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমি যখন ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বলি, এটাকে নিছকই রাজনৈতিক শ্লোগান করে তুলতে চাই না। আমাদের দেশের ১১২টি উচ্চাকাঙ্খী জেলা আমরা চিহ্নিত করেছি। সেগুলিতে উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নির্ধারণ করে কাজ করে চলেছি। রাজনৈতিক চাপে কয়েকটি রাজ্য এক্ষেত্রেও বাধা দিচ্ছে। তাঁদের এই আচরণ আমাকে অবাক করেছে। আমি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলাম, তখন কোনও আধিকারিককে কচ্ছ জেলায় বদলি করলে তিনি নির্বাসনে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ে যেতেন। কিন্তু, আমরা সেখানে এমন উন্নয়ন করলাম যে, আজ কচ্ছ ভারতের দ্রুত উন্নয়নশীল জেলাগুলির অন্যতম। ভারতের প্রতিটি রাজ্যেই এরকম দু-একটি জেলা আছে। আমরা দেশের যে ১১২টি উচ্চাকাঙ্খী জেলা চিহ্নিত করেছি, সেগুলির উন্নয়নের কাজ এখন প্রতিদিন তদারকি করা হয়। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বলতে আমি এটাই বুঝি। যাঁরা পিছিয়ে রয়েছেন, তাঁদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে একটি গড় উন্নয়নের ব্যবস্থা করা। এরপর দেখবেন যে, তাঁরা নিজে থেকেই এগিয়ে যাচ্ছেন।

উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চল। বিগত পাঁচ বছরে আমরা সম্পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে উন্নয়নের পরিকাঠামো গড়ে তুলেছি। এখন আমাদের আরও জোর দিতে হবে। ঐ রাজ্যগুলি থেকে সংসদে বেশি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসেন না। সেজন্য রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে আমাদের ঐ রাজ্যগুলির প্রতি এতো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমার জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিটি রাজ্য দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য বিগত পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত মন্ত্রীদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে নিয়মিত যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম। তাঁরা নিয়মিত ঐ রাজ্যগুলিতে গিয়েছেন। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ – এর মানে আমার জন্য ভৌগোলিক রূপে দেশের প্রত্যেক ক্ষেত্রের উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা।

সম্প্রতি আমরা জল নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছি। দেখা গেছে যে, দেশের ২২৬টি জেলায় জলকষ্ট রয়েছে। কোন্‌ রাজ্যের কটি জেলা এটা আমি দেখছি না। সমীক্ষা অনুযায়ী যে জেলাগুলিতে এই সমস্যা রয়েছে, সেগুলির জলকষ্ট দূর করতে আমি আপনাদের সকলের সাহায্য চাইছি। আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি যে, সাংসদ তহবিলের টাকা খরচের ক্ষেত্রে জলকে অগ্রাধিকার দিন। আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে দেশের এই সমস্যা দূর করতে পারবো। সেজন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তবেই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জলসঙ্কট থেকে বাঁচাতে পারবো। এই চিন্তা মাথায় রেখেই আমরা একটি স্বতন্ত্র জলশক্তি মন্ত্রক গড়ে তুলেছি।

আমি আগেই বলেছি যে, দেশকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশ করে তুলবো। এই সভায় দেউলিয়া আইন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। ‘ফিউজিটিভস্‌ ইকনোমিক অফেন্ডার্স অ্যাক্ট’ সম্পর্কে ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্টসি আইনের প্রভাবে ইতিমধ্যেই ৩ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কে ফেরাতে পেরেছি। এদিকে আগে কেউ লক্ষ্য করেননি। আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে পর্যালোচনা করে এর সমাধান বের করার চেষ্টা করেছি। সকলে মিলে চেষ্টা করলে এ থেকে আরও ভালো ফল পাবো। এখানে কো-অপারেটিভ ফেডারিলিজম নিয়ে কথা হয়েছে। আমি মনে করি, ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতাদের অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। এই সংবিধান মেনে চললেই আমরা দেশকে ঐক্যবদ্ধ রেখে চলতে পারবো।

সহযোগিতামূলক, প্রতিযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজ্যগুলির উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমি মনে করি, নারা বা ন্যাশনাল অ্যাম্বিশন অ্যান্ড রিজিওন্যাল অ্যাসপিরেশনস্‌ – এর মন্ত্র নিয়ে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু প্রশ্ন হ’ল দেশের স্বার্থে এমন কিছু কি আমরা করতে পারি, যাতে আমাদের সকলের সম্মতি আছে। অথবা আমরা কি যেসব ক্ষেত্রে সকলের সম্মতি আছে, সেগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ইতিবাচক আবহ গড়ে তুলতে পারি।

আমাদের সামনেই গান্ধী ১৫০ এবং স্বাধীনতা ৭৫ উৎসবের সুযোগ রয়েছে। রাজ্যসভা কি দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ? এই সভা কি স্বতন্ত্র কিছু নাকি এই ব্যবস্থারই একটি অঙ্গ? লোকসভার সদস্যদের দেশের জনগণ সরাসরি নির্বাচন করে পাঠান। কিন্তু রাজ্যসভায় শাসক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বলে সব কাজ আটকে দিয়ে সরকারকে ছোট করে দেখিয়ে যদি আপনারা আনন্দ পান, কিন্তু দেশ ……. আমি কারও সমালোচনা করছি না, আমি শুধুই বিশ্লেষণ করছি।

বিগত পাঁচ বছরে এই সভা অনেক অবধারিত কাজকে থামিয়ে রেখেছে। আপনারাই বলুন, যে বিল রাজ্যসভা অনুমোদন করেনি বলে লোকসভায় বাতিল হয়ে গেছে, লোকসভা যখন আবার সেই বিল পেশ করবে, এতে খরচ হবে না? দেশের করদাতাদের পরিশ্রমের পয়সা নষ্ট হবে না? রাজ্যসভা চাইলে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অর্থ সাশ্রয় করতে পারে। তবেই স্বাস্থ্যকর যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হবেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সদর্থক ইচ্ছাশক্তি বাস্তবায়নে রাজ্যসভারও দায়িত্ব রয়েছে।

আমার কথা মানবেন কিনা, সেটা আপনাদের ইচ্ছা। কিন্তু আমি করি, আমাদের প্রত্যেকেরই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উপদেশ মানা উচিৎ। আমারও মানা উচিৎ, আপনাদেরও। প্রণবদা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘শাসকদলকে জনগণ শাসন করার জন্য নির্বাচিত করেছেন আর বিরোধী দলকে সমালোচনার জন্য নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু কেউই কোনও কাজে বাধা দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়ে আসেননি’। আমি মনে করি, প্রণবদার প্রদর্শিত এই পথে এগিয়ে গেলে সত্যিকারের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো মেনে আপনারা এখানে রাজ্যগুলির জীবন্ত বিবেক হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। রাজ্যগুলির আকাঙ্খা আপনাদের অভিব্যক্তি রূপে প্রকাশিত হবে। দলের ঊর্ধ্বে উঠে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের কথা দেশের স্বার্থে আপনাদের সক্রিয় থাকা উচিৎ।

একথা সত্যিই যে, ভারতের মতো দেশে সমস্ত ক্ষেত্রে সব রাজ্যে সব কাজ একসঙ্গে হয়ে যাবে – এটা অবাস্তব। কেউ আগে পাবেন আর কেউ পরে। আবার কেউ হয়তো পাবেনই না। এটাই হয়, আগেও এমনই হয়েছে। কিন্তু সেজন্য আমরা সংখ্যার জোরে দেশের সব কাজ আটকে দেব – এটা ঠিক নয়। বিগত অধিবেশনের পর আনন্দজী এবং গুলাম নবীজী আমাকে বলছিলেন যে, সাহেব কিছু করতে হবে। কোনও রাজ্যের একটি বিষয় আর একজন সাংসদ দাঁড়িয়ে সবকিছু আটকে দিলেন, তা হলে কেমন করে চলবে! আমি তাঁদের এই ভাবনাকে সঠিক বলে মনে করি।

আমি মনে করি, আমরা সবাই মিলেমিশে এই সভাকে এগিয়ে নিয়ে গেলে দেশের জন্য দ্রুত কাজ করতে পারবো। আমাদের সামনে আমাদের সামনেই গান্ধী ১৫০ এবং স্বাধীনতা ৭৫ উৎসবের সুযোগ রয়েছে। এই প্রেরণাকে সম্বল করে আমরা দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মিলেমিশে কাজ করতে পারি। মনের মধ্যে কর্তব্যভাব জাগিয়ে তুললে আর প্রত্যেকেই কিছু না কিছু ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকলেই এটা সম্ভব। যদি স্কুলগুলিতে আমরা এটা শেখাতে পারি যে, সবাইকে হাত ধুয়ে খেতে হবে আর কেউ খাবার নষ্ট করবে না – তা হলেই সেটা গান্ধী ১৫০ – এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

আমাদের কৃষকদের মনে যদি এই ভাব জাগিয়ে তুলতে পারি যে, ভারতমাতার সুস্বাস্থ্যের স্বার্থে ১০ শতাংশ কম ইউরিয়া ব্যবহার করবো – তা হলেই সেটা স্বাধীনতা – এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। এরকম ছোট ছোট বিষয় …. ১৯৪২ – ১৯৪৭ – এর সময়টা লক্ষ্য করুন, গান্ধীজী এরকমই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে প্রত্যেকের দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে তুলেছিলেন। আমাদের নতুন কিছু করার প্রয়োজন নেই। গান্ধীজীর মডেলকে আদর্শ করে বর্তমান সময়ের নিরিখে আমরা কিভাবে এগিয়ে যাব। কর্তব্য বোধকে জাগ্রত করলেই আমরা দেশের জন্য নিজেদের পক্ষ থেকে যা কিছু ত্যাগ করা সম্ভব, তা করতে পারি। যদি আমরা সবাই মিলে নেতৃত্ব দিই, তা হলে যে স্বপ্নের ভারত গড়ে উঠবে –তা আমাদের নিজেদের ভারত হয়ে উঠবে। দেশকে পুরনো অবস্থায় রেখে দেওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের অনুকূল দেশ গড়ে তুলতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, এই সভায় যে আলোচনা হয়েছে, দলমত নির্বিশেষে তার মধ্যে যা কিছু শ্রেষ্ঠ সেই অমৃতকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। দেশের কল্যাণে কিছু না কিছু করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারি।

আরেকবার যাঁরা এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককেই ধন্যবাদ জানাই। রাষ্ট্রপতির অভিভাষণের জাবাবি ভাষণে ধন্যবাদ জানিয়ে আপনাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য এখানেই সম্পূর্ণ করছি।

অনেক অনেক ধন্যবাদ।

SSS/SB/SB