পিএমইন্ডিয়া
নতুন দিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মহামান্যবৃন্দ,
বিশিষ্ট অতিথিবর্গ,
নমস্কার!
আপনাদের সকলকে ভারতে স্বাগত ও সম্ভাষণ জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
ব্রিকস-এর সভাপতিত্বের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভারত ‘জন-কেন্দ্রিক’ এবং ‘মানবতাকে অগ্রাধিকার’ দেওয়ার নীতি অনুসরণ করেছে। সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব—এগুলিই ছিল আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে, ব্রিকস-এর সহযোগিতামূলক কর্মসূচিকে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার ওপর আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৩৫০টিরও বেশি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতের প্রায় ৩০টি শহরে আপনাদের প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর সুযোগ আমরা পেয়েছি। ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের মেয়াদকে সফল করে তুলতে আপনাদের সক্রিয় অবদান ও সমর্থনের জন্য আমি আপনাদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
বন্ধুগণ,
এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। আমরা ব্রিকস-এর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছি। মানুষের জীবনে বিশ বছর বয়সটি পরিপক্কতা ও দায়িত্ববোধের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। এটি এমন একটি পর্যায় যখন স্বপ্নের পাশাপাশি দায়িত্ববোধও যুক্ত হয় এবং সক্ষমতাকে নতুন নতুন পথে পরিচালিত করা হয়।
আজ ব্রিকসও তার পরিপক্কতা অর্জনের এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। গত বিশ বছরে বিশ্বমঞ্চে ব্রিকস নিজের এক স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে। আমরা একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করি এবং পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যাই। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন এক কর্মপন্থা নিয়ে অগ্রসর হওয়া যা কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার প্রয়াস চালায়।
এখন সময় এসেছে ব্রিকসের মধ্যকার আমাদের ঐক্য ও ঐকমত্যকে বিশ্বমঞ্চে সুনির্দিষ্ট ফলাফলে রূপান্তর করার। আগামী বিশ বছরের জন্য আমাদের একটি নতুন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। এর শুরুটা হতে হবে আমাদের নিজস্ব কার্যপদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে।
ব্রিকসের সভাপতিত্ব প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়, কিন্তু এর ফলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা যেন ব্যাহত না হয়। আমি ‘ব্রিকস ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া’ (ব্রিকস কন্টিনিউটি অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন মেকানিজম) গড়ে তোলার প্রস্তাব করছি। ‘ট্রোইকা’-র মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি সমস্ত উদ্যোগ ও ফলাফলের ওপর সুশৃঙ্খল তদারকি ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।
আমরা একটি নিরাপদ ডিজিটাল ভাণ্ডার বা রিপোজিটরি তৈরি করতে পারি, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্র (নোডাল পয়েন্ট), সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা নথিবদ্ধ থাকবে।
বন্ধুগণ,
ব্রিকসকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিশ্বব্যবস্থায় সংস্কারের পথও আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। বৈশ্বিক শাসনকাঠামোর বর্তমান রূপটি অনেকটা পিরামিডের মতো। এর চূড়ায় ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি কুক্ষিগত থাকে; অন্যদিকে নিচের স্তরে থাকে এমন সব দেশ, যারা এসব সিদ্ধান্তের দ্বারা প্রভাবিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা বা মতামত খুবই নগণ্য।
আজকের বিশ্বে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক সংকটের সম্মুখসারিতে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে একেবারে পেছনের সারিতে। আমাদের এই ‘সুবিধাপ্রাপ্তির পিরামিড’-কে ‘অংশীদারিত্বের মঞ্চে’ রূপান্তর করতে হবে—যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকবে, প্রতিটি সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে এবং প্রতিটি প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানবজাতির অগ্রগতি।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমি প্রস্তাব রাখছি যে, আমরা বিশ্ব শাসনব্যবস্থা(গ্লোবাল গভর্ন্যান্স) সংস্কারের জন্য দশটি প্রস্তাবনা তৈরির লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করি; যা পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলনের আগেই একটি ‘ব্রিকস সংস্কার রোডম্যাপ’-এ রূপ দেওয়া যেতে পারে।
এই রোডম্যাপ তৈরির সময় আমাদের তিনটি মূল বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে: প্রতিনিধিত্ব (রিপ্রেজেন্টেশন), সাড়া প্রদানের সক্ষমতা বা সংবেদনশীলতা (রেস্পন্সিভনেস) এবং নিয়ম-কানুন প্রণয়ন (রুল- মেকিং)।
প্রথমত, প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে আমি বলতে চাই যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আর বিলম্বিত করা যায় না। এ বিষয়ে খসড়া-ভিত্তিক আলোচনাকে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
একইভাবে, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ভোটাধিকার, নেতৃত্বের পদ এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। যেসব দেশ বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা নির্ধারণেও তাদের যথাযথ ভূমিকা থাকা উচিত।
দ্বিতীয়ত, সাড়া প্রদানের সক্ষমতা। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই মানবজাতির আস্থা অর্জন করতে পারবে, যখন তারা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম হবে। আমাদের সম্মিলিত পদক্ষেপের গতি, পরিধি এবং প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত এর প্রভাবের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যে নাবিকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, অথচ কঠিন সময়ে প্রায়শই তাঁরা পর্যাপ্ত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। আমি প্রস্তাব করছি, আমরা কি একটি ‘নাবিক জরুরি সহায়তা নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলতে পারি? এই নেটওয়ার্কটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ এবং কূটনৈতিক মিশনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। এটি বিপদকালীন সংকেত আদান-প্রদান, চিকিৎসা সহায়তা, পরিবারের সাথে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনে নিরাপদে সরিয়ে আনার (এভাক্যুয়েশন) ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করতে পারে।
এবং তৃতীয়ত, আমি নিয়ম-কানুন প্রণয়নের বিষয়ে কথা বলতে চাই। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক নিয়ম-কানুন নির্ধারণে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার স্পেস, মহাকাশ, জৈব-প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সব প্রযুক্তি কেবল ভবিষ্যতের সুযোগ-সুবিধাই তৈরি করছে না, বরং ভবিষ্যৎ পরিচালনার নিয়ম-কানুনও নির্ধারণ করছে।
‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলোকে কেবল নিয়ম মেনে চলার (রুল- টেকার্স) অবস্থান থেকে নিয়ম নির্ধারণের (রুল- শেপার্স) অবস্থানে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। ব্রিকস-এর মাধ্যমে আমরা গ্লোবাল সাউথ-এর দেশগুলোর তরুণ কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার দক্ষতা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং আইনি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান বা দক্ষতা প্রদান করতে পারি।
একটি সুখকর কাকতালীয় বিষয় হলো, আজ ‘রাষ্ট্রসংঘ দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস’(ইউনাইটেড নেশনস ডে ফর সাউথ- সাউথ কোঅপারেশন)। গ্লোবাল সাউথ-এর জন্য নিবেদিত এমন একটি দিনে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত এ বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
বন্ধুগণ,
ভারতের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের বার্তাটি অত্যন্ত জোরালো ও স্পষ্ট হওয়া উচিত: যদি আমাদের ভবিষ্যৎ যৌথ বা অংশীদারিত্বমূলক হয়, তবে সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকারও সবার সমান হওয়া উচিত। কণ্ঠস্বর থেকে প্রভাব বিস্তার—সুবিধাভোগী অবস্থান থেকে অংশীদারিত্ব।
প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তিতে ব্রিকস-এর সংকল্প হওয়া উচিত এটাই।
আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।
বি. দ্র.: এটি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের একটি আনুমানিক অনুবাদ। মূল ভাষণটি তিনি হিন্দিতে বলেছিলেন।
***********
SC/SB/DM
Sharing my opening remarks during the BRICS Session on ‘Inclusive Global Governance and Strengthening Multilateralism.’
— Narendra Modi (@narendramodi) September 12, 2026
https://t.co/g31TharSOc